চট্টগ্রাম   শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০  

শিরোনাম

নাগরিকত্ব সংশোধন আইন : একটি বিষ-বৃক্ষ!

   মুজিব স্বদেশি, অাসাম ::    |    ০৯:০৭ পিএম, ২০২০-০৯-১৯

নাগরিকত্ব সংশোধন আইন : একটি বিষ-বৃক্ষ!


           

বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপলক্ষ্যে 'বাঙালি ঐক্য'-এর কথা বলা হলেও দাবিটি যে অন্তঃসারশূন্য, তা বলার অপেক্ষা রাখে না! বাঙালি হিন্দু শিক্ষিত সম্প্রদায় বিভিন্ন সময় মুখে যা বলেন, কাজে তা রূপায়ণ করেন না! করেন তার ঠিক বিপরীত! ব্যক্তিগতভাবে অনেক প্রাগ্রসর হিন্দু বাঙালিকে জানি, যাঁরা সভা-সমাবেশে যে-সকল 'চমৎকার' 'চটকদার' কথা বলেন, নিজের চেয়ারে সমাসীন হওয়ার পর তা বেমালুম ভুলে যান! নিজেরা যে 'ঐক্য'র কথা বলেন, চব্বিশ ঘণ্টা যেতে-না-যেতে তাঁরা একশত আশি ডিগ্রি বিপ্রতীপে চলে যান! যাঁরা মাথায় 'আশীর্বাদের হাত' রাখেন, কোনও এক সময় সেই 'হাত'টি অতর্কিতে গলায় নেমে আসে! সে চাকরি, বাণিজ্য, রাজনীতি যে-কোনও ব্যাপারই হোক না কেন! ফলে, অনেক ক্ষেত্রে যোগ্য মুসলিম প্রার্থীরা 'জলে থেকে কুমীরের সঙ্গে লড়াই' করার দুঃসাহস দেখাতে পারেন না! যাঁরা পারবেন বলে মনে হয়, তাঁদের উত্তরণের সকল পথ-ই রুদ্ধ করে দেয়া হয়, কৌশলে! এমন প্রমাণ ভুরি ভুরি পাওয়া যাবে!

'হিন্দু বাঙালি'রা মুসলমানকে কোথাও 'নেতা' মেনে নেননি কোনও দিন। ভবিষ্যতেও মেনে নেবেন কি না বলা মুশকিল! মেনে নিলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হিন্দু বাঙালিরা  স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ ছেড়ে অসমের মতো দুর্গম অঞ্চলে আসতেন না। পশ্চিমবঙ্গেও আসতেন না। হিন্দু বাঙালিদের ভোটাধিকার সাধারণত মুসলিম প্রার্থীদের অনুকূলে প্রয়োগ হয় না! এ-ও এক ধরনের উন্নাসিকতা! মুসলিম ভোট প্রায় সময় হিন্দু বাঙালি প্রার্থীদের অনুকূলেই যায়। এতদ্দেশে, প্রকৃত কোনও 'হিন্দু বাঙালি' নেতা সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে ওঠে মুসলিমদের ভরসার স্থল হতে পারেননি! সন্তোষমোহনও না। গৌতম তো না-ই! সুস্মিতাও না। আজমল তো প্রশ্নই ওঠে না! কারণ, আগে উল্লেখ করেছি। অতএব, তথাকথিত "বাঙালি ঐক্য" প্রকল্প আকাশকুসুম! একে হাইপোথিসিস বলা যায় বড়োজোর; থিসিস নয়।

একসময় ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাসহ উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে ব্যাপক হারে বাংলাভাষী মুসলিমদের "বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী" আখ্যা দিয়ে নির্যাতন করা হত! হত্যা করা হত! নেলি, বরপেটা, চালখোয়া, মুকালমুয়া, কোকরাঝারের হত্যাকাণ্ড তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ! সরকারের ইস্যু করা পরিচয়পত্র, দরকারি নথিপত্র ছিঁড়ে ফেলা হত! গুয়াহাটি যাতায়াতের সময় মেঘালয়ে মুসলিম নামধারীদের অকথ্যভাবে নির্যাতন করা হত! তখন বরাক উপত্যকার কোনও রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক সংগঠন, অমুসলিম বাঙালি নেতা টুঁ-শব্দটি করতেন না! প্রতিবাদ যা হত, তা মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেই হত!অসমে, ভাটার তালিকায় মুসলিম নাম দেখে দেখে 'ডি-ভোটার' অর্থাৎ ডাউটফুল বা 'সন্দেহযুক্ত' বলে চিহ্নিত করা হত! নিজেদের 'ভারতীয় নাগরিক' বলে প্রমাণ করতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হত! কত কাঠখড় পুড়াতে হত! কত ঘাটের জল খেতে হত! ১৯৮৩ সালে কুখ্যাত নেলি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর যে আইএমডিটি আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল রাজ্যে, এক পর্যায়ে ২০০৫ সালে সুপ্রিম কোর্টে  'ইল্লিগ্যাল মাইগ্রেশন ডিটেরমিনেশন বাই ট্রাইবিউনাল অ্যাক্ট' টি সংক্ষেপে আইএমডিটি বাতিল হল! আইনটি সমগ্র ভারতবর্ষে প্রযোজ্য নয়, এই অজুহাতে! ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সারা অসম ছাত্র সংস্থা সংক্ষেপে আসু'র প্রাক্তন সভাপতি ও তৎকালীন উপদেষ্টা, বর্তমান বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়ালের দায়ের করা একটি মামলার প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট আইএমডিটি আইনটি বাতিল করে! সেদিন, সমগ্র রাজ্যব্যাপী কী উল্লাস! উন্মাদনা! মিষ্টি ও লাড্ডু বিতরণ! অসমিয়া-বাঙালি নির্বিশেষে হিন্দুরা সেদিন আহ্লাদে আটখানা হয়েছিলেন! বাঙালি মুসলমানদের বাংলাদেশে 'পুশ-ব্যাক' করা যাবে, এই আনন্দে! কারণ, আইএমডিটি আইনটি এ-ক্ষেত্রে অনেকটা রক্ষাকবচের কাজ করছিল! পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০০০ সালের ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত চোদ্দো বছরে তিন লক্ষ উনিশ হাজার এক শত নয় জন ভারতীয় নাগরিককে 'বিদেশি' নোটিশ ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল। তন্মধ্যে, আটত্রিশ হাজার ছয় শত একত্রিশ জনকে স্ক্যানিং কমিটি ট্রাইবিউনালে পাঠায়। এর মধ্যে ষোলো হাজার পাঁচ শত নিরানব্বইটি কেস বাতিল বলে গণ্য হয় ট্রাইবিউনালে এবং নোটিশপ্রাপ্ত দশ হাজার পনেরো জনকে 'বিদেশি' বলে ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে অনেকেই আবার পরে আপিল করে জয়ী হন। ফলে, উগ্র অসমিয়া ও হিন্দুত্ববাদী বাঙালিরা আইএমডিটি আইনটি যেন-তেন-প্রকারেণ বাতিল করার লক্ষ্যে সভা-সমাবেশের আয়োজন করে আইএমডিটির 'কুফল' সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে শুরু করেন। পাশাপাশি, অসমের মুসলিমদের "বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী" বলে চিহ্নিত করার লক্ষ্যে এনআরসি'র দাবি তোলেন। আসু তো এক কদম এগিয়ে মুসলিমদের ডিএনএ টেস্ট করার দাবি উত্থাপন করেছিল!

২০১৩ সালে ন্যাশনাল রেজিস্টার ফর সিটিজেনশিপ সংক্ষেপে এনআরসি'র কাজ শুরু হল। মূলত, বাঙালি মুসলমানদের "বিদেশি" অর্থাৎ বাংলাদেশি বলে প্রমাণ করার লক্ষ্যে! দীর্ঘ সাত বছর ধরে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, প্রায় সতেরো শত কোটি টাকা খরচ করে ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই এনআরসি'র খসড়া তালিকা প্রকাশ পেতেই অনেক হিন্দু বাঙালির মাথায় যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হল! লক্ষ লক্ষ হিন্দু বাঙালির নাম বাদ পড়ল খসড়া তালিকা থেকে! বাদ পড়ল মুসলমানের নামও।  শুরু হল প্রতিবাদ! প্রতিরোধ! আরেক দল শুরু করলেন এনআরসি-বিরোধী আন্দোলন! এনআরসি হিন্দু বাঙালি ও হিন্দু অসমিয়ার মধ্যে রোপন করল বিষবৃক্ষ! অসমিয়া হিন্দুরা ধীরে ধীরে বুঝতে সক্ষম হলেন, প্রকৃতপক্ষে "বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী" কারা! ২০১৯-এর ৩১ আগস্ট এনআরসি'র  দ্বিতীয় তথা চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা গেল, উনিশ লক্ষ ছয় হাজার, ছয় শত ছয় জন চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন! তন্মধ্যে সিংহভাগ-ই হিন্দু বাঙালি! শুরু হল তৎপরতা। রেজিস্টার জেনারেল অব ইন্ডিয়া অবস্থা প্রতিকূল দেখে এনআরসি'র চূড়ান্ত তালিকায় সই না-দিয়ে দীর্ঘ দিনের পরিশ্রম ও হাজার কোটি টাকার বিনিময়ে তৈরি এনআরসি'র চূড়ান্ত তালিকা স্থগিত করে দিলেন! বলা যায়, শীতল জলে নিক্ষেপ করলেন! আইএমডিটি অ্যাক্ট বা এনআরসি কোনওটি-ই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হল না! এদিকে, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিজেপি এনআরসিছুট হিন্দু বাঙালিদের নাগরিকত্ব প্রদানের লক্ষ্যে পুরনো নাগরিকত্ব আইন (২০০৩) সংশোধন করল বটে। তবে এখনও বিধি তৈরি করতে পারেনি। আসুসহ উগ্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদীরা CAB যাতে আইনে পরিণত হতে না-পারে, সেজন্য রাজ্যব্যাপী আন্দোলনের ডাক দিলেও শেষ রক্ষা করতে পারেনি! বিলটি আইনে পরিণত হয় ; ডিসেম্বর, ২০১৯-এ।  

Citizenship Amendment Bill-এর পক্ষে ও বিপক্ষে অসমসহ সমগ্র দেশ জুড়ে প্রতিবাদ সাব্যস্থ হল। বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের ডেকে এনে ভারতবর্ষে, বিশেষত, অসমে সংস্থাপন করা হবে, এই আশঙ্কা থেকে বিভিন্ন অবাঙালি হিন্দু সংগঠনও পথে নামে! ভাষা-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-বয়স নির্বিশেষে দেশের বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদী কার্যসচি পালিত হয়। দিল্লির শাহিনবাগে ঐতিহাসিক প্রতিবাদী কার্যসূচি পালিত হয় কয়েক মাসব্যাপী! করোনা অতিমারির দরুন এক পর্যায়ে ক্যা-বিরোধী মহান আন্দোলনটি  স্থগিত বলে ঘোষণা করা হয়। যেখানে নেতৃত্ব দেন বিশেষত মুসলিম মহিলারা-ই! এদিকে, নাগরিকত্ব সংশোধন বিল 'ক্যাব'-এর সমর্থনে বরাক উপত্যকার হিন্দু বাঙালিরা 'ঐক্যবদ্ধভাবে' কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক নিয়োজিত জয়েন্ট পার্লামেন্টারি কমিটির নিকট দলে দলে স্মারকপত্র প্রদান করে, মুসলিমদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে! সর্বভারতীয় মহিলা কংগ্রেস সভানেত্রী সুস্মিতা দেবসহ হিন্দু নেতৃবর্গ ও শিক্ষিত বাবু সমাজ CAA -এর পক্ষে সওয়াল করলেন! মাতৃভাষা বাংলাকে জলাঞ্জলি দিয়ে CAB সমর্থন করতে হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা সভা করলেন, বিবৃতি দিলেন। আন্দোলন সংগঠিত করলেন! নাগরিকত্ব সংশোধন বিল(২০১৯) আইনে পরিণত হওয়ার পর আবার অসম চুক্তির ছয় দফায় যখন ১৯৫১ সালকে 'খিলঞ্জিয়া'র ভিত্তিবর্ষ করার কথা ঘোষিত হল, তখন বাঙালি "হিন্দু-মুসলিম ঐক্য"র কথা বলা হল ইনিয়ে-বিনিয়ে! ১৯৭১ সালকে খিলঞ্জিয়ার ভিত্তিবর্ষ করার লক্ষ্যে হিন্দু-মুসলিম যৌথভাবে 'ঐক্যবদ্ধ' আন্দোলনে জোর দেয়া হল!

বাঙালি মুসলমানের সামান্য স্বার্থ যে যে ক্ষেত্রে জড়িয়ে আছে, বাঙালি হিন্দু নেতৃত্ব প্রায় সে-সব ক্ষেত্রে বৈরী ভূমিকা নিয়েছেন, সব দিনই! সুস্মিতা দেবের বাবা সন্তোষমোহন দেব কেন্দ্রীয় ভারীশিল্প মন্ত্রী থাকাকালীন Bharat Heavy Industry Ltd (BHEL) -এর মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানে অসমের যে বায়ান্ন জন ইঞ্জিনিয়ারকে নিযুক্তি দিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে আরও নিযুক্তি হয়েছিল, তাতে একজন মুসলমানের নামও অন্তর্ভুক্ত করেননি! তৎকালীন সময়ে বরাকের রূপকার জননেতা ময়নুল হক চৌধুরি এশিয়ার বৃহত্তম কাগজকল "হিন্দুস্তান পেপার মিল"টি বরাক উপত্যকার মধ্যবর্তী স্থান পাঁচগ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কেন্দ্রীয় শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন। সেই প্রতিষ্ঠানে প্রচুর মুসলিম যুবক কর্মসংস্থান পেয়েছিলেন! কেউ চাকরি করছিলেন। কেউ ঠিকাদারি করছিলেন। কেউ শ্রমিকের কাজ করে আর্থিকভাবে ব্যাপক স্বাবলম্বী হতে পেরেছিলেন! কিন্তু সন্তোষ মোহন দেব কেন্দ্রীয় ভারী শিল্পমন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও অজ্ঞাত কারণে পেপার মিলটি পুনরুজ্জীবিত করেননি! ময়নুল হক চৌধুরির হাতে-গড়া আনিপুরের "কাছাড় সুগার মিল" কিংবা বদরপুরের আলাকুলিপুরের টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিটিও পুনরুজ্জীবিত করার কোনও চেষ্টা করেননি! নিন্দুকরা বলে থাকেন, সন্তোষমোহন দেব এসব সরকারি প্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করেননি; তার কারণ দুটি: ১. সন্তোষমোহন নিজে কোনও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা উদ্যোগ স্থাপন করেননি। ফলে, এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করলে পক্ষান্তরে বরাকের রূপকার ময়নুল হক চৌধুরির নামকেই উজ্জ্বল করা হবে! ২. এসব প্রতিষ্ঠানে মুসলিমদের ছিল উজ্জ্বল উপস্থিতি! তাই, তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস নেননি! 

সার্বিকভাবে বাঙালিরা, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আগে পরে আর কোনও হিন্দু বাঙালি নেতা পায়নি, যিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দাবি তোলার মতো, নেতৃত্ব দেয়ার মতো উপযুক্ত! 
চিত্তরঞ্জন দাশ কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব নিয়ে দেখলেন, অবিভক্ত বঙ্গদেশের শতকরা পঞ্চান্ন জন মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও উক্ত সরকারি কার্যালয়ে একজনও মুসলিম কর্মচারী নেই! তিনি উদ্যোগ নিয়ে এক দিনে পঁচিশ জন মুসলিম যুবককে চাকরি দিয়েছিলেন! পরবর্তীকালে, তিনি নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির সভাপতি হলে  "হিন্দু-মুসলিম প্যাক্ট" ঘোষণা করেছিলেন এবং বঙ্গদেশে জনসংখ্যার অনুপাতে মুসলিমদের জন্য ৫৫% সরকারি চাকরি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন! যদিও পঞ্চান্ন বছর বয়সে তাঁর অকাল মৃত্যুতে ৫৫% শতাংশ সংরক্ষণের বিষয়টিও রদ হয়ে যায়! 

অসমে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পেছনে যতটুকু না রাজনীতি, তার চেয়ে ঢের বেশি অর্থনীতি জড়িত! অসমিয়া জনগোষ্ঠীর মনে 'বিষ' ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল এই বলে যে, বাংলাদেশ থেকে মুসলিমরা দলে দলে 'অনুপ্রবেশ' করে অসমের অর্থনীতিকে ধ্বংস করছেন! তাই, আশির দশক জুড়ে প্রথমে শুরু হল, "বহিরাগত খেদা" আন্দোলন! পরবর্তীকালে তা রূপান্তরিত হল "মুসলিম খেদা" আন্দোলনে! আর নাগরিকপঞ্জি অর্থাৎ এনআরসি রূপায়ণের পর অসমিয়াদের 'ভুল' ভাঙলে সেই আন্দোলন এখন "বাংলাদেশি হিন্দু খেদা" আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছে! বিশেষত নাগরিকত্ব সংশোধন বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার পর। 

অসমিয়া জনগোষ্ঠী ধর্মীয় ব্যাপারে তুলনামূলকভাবে উদার ও সহনশীল! কিন্তু বিজেপির প্ররোচনায় তাঁদের অর্থনৈতিক আন্দোলন কীভাবে "মুসলিম খেদা" আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছিল, তা সচেতন নাগরিক মাত্র-ই জানেন! আলফা যখন সৃষ্টি হয়, তখন আলফা সদস্যরা ধর্মিনির্বিশেষে বহিরাগত ব্যবসায়ীদের মূলত টার্গেট করেছিল! তাদের কাছে মুখ্য ছিল অর্থনৈতিক স্বাধীনতা! আর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে চাই রাজনৈতিক স্বাধীনতা! যে-পথ ধরে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের সৃষ্টি! পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাত থেকে অর্থনৈতিক মুক্তি-ই ছিল অন্যতম প্রধান কারণ! তাই, "স্বাধীন অসম" দাবি ছিল তাদের! তারা ধর্মের নামে হিংসা বা খুন করেনি! কিন্তু তাদের আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারেননি বিভিন্ন কারণে।

গত শতকের গোড়ার দিকে বিখ্যাত "স্বদেশি আন্দোলন" -এর মতো একটি অর্থনৈতিক আন্দোলনকে যেভাবে বিপথে পরিচালিত করা হয়েছিল, অনেকটা সেরকমই, অসমের অর্থনৈতিক আন্দোলনকে কীভাবে "মুসলিম-বিরোধী" আন্দোলনে রূপান্তরের মাধ্যমে অসমিয়া জনগোষ্ঠীর বড়ো একটি অংশকে ধর্মীয় সংকীর্ণতার দিকে, অসহিষ্ণুতার দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "স্বাদেশিকতা" আর অন্যান্যদের "স্বাদেশিকতা" য় যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য, তা খোদ রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিখ্যাত "ঘরে-বাইরে" উপন্যাসসহ বিভিন্ন রচনায় দ্ব্যর্থহীনভাবে বলে গিয়েছেন।

বরাক উপত্যকার শিক্ষিত হিন্দু বাঙালিরা অভিযোগ করে থাকেন, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাংলাভাষী মুসলিমরা নিজেদের বাংলাভাষী বলতে কুণ্ঠাবোধ করেন! ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাংলাভাষী মুসলিমরা যে-কারণে বা যে-ভয়ে নিজেদের 'বাঙালি' বলতে কুণ্ঠাবোধ করে থাকেন, সেই  এক-ই  'ভয়'কে জয় করার কথা বরাকের অন্যতম প্রধান কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারী তাঁর "উদ্বাস্তুর ডায়েরি" শীর্ষক কবিতায় ঘোষণা করে গেছেন অনেক আগে-ই! 
"যে কেড়েছে বাস্তুভিটে, সে-ই কেড়েছে ভয়,/ আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়। / হিংসাজয়ী যুদ্ধে যাব, আর হবে না ভুল।/ মেখলা-পরা বোন দিয়েছে একখানা তাম্বুল।/ 
এবার আমি পাঠ নিয়েছি---আর কিছুতে নয়,/
ভাষাবিহীন ভালোবাসার বিশ্ববিদ্যালয়।/
বাংলা আমার আই-ভাষা গো, বিশ্ব আমার ঠাঁই,/
প্রফুল্ল ও ভৃগু আমার খুল্লতুত ভাই!"

একসময় এআইইউডিএফ প্রধান বদরুদ্দীন আজমল ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা ব্যানার্জির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে থাকলেও মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হতে পেরেছেন মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক পাশে থাকায়। অসমে কিন্তু তার বিপরীত ঘটেছে! যা স্বাভাবিক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বদরুদ্দীন আজমল দু'জনই যথাক্রমে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার ও অসমের কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। ভোট চেয়েছিলেন। মমতা সফল হয়েছেন। বদরুদ্দীন আজমল আংশিক সফল!বরাক উপত্যকার হিন্দু বাঙালি ও অসমিয়া জনগোষ্ঠীর বড়ো অংশ নিজেদের সম্ভাব্য আর্থিক বিপর্যয়কে হিসেবে রেখেই ধর্মীয় পুনরুত্থানবাদের শরিক হয়েছেন! এমতাবস্থায় রুটি, রোজি, রাস্তাঘাট এসব তাঁদের নিকট গৌণ! নিজেরা যেদিন নিজেদের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বিষয়ে সম্যক অবগত হবেন, তখন নিজেরা নিজস্ব 'নেতা' তৈরি করবেন! আর বরাক উপত্যকার মুসলিমরা "উপযুক্ত" প্রার্থীদের 'সবক' শেখাতে গিয়ে নিজেদের পায়ে কুড়োল মারতে থাকবেন! সেই অর্থে বদরুদ্দীন আজমল মুসলিমদেরও প্রকৃত 'নেতা' হয়ে উঠতে পারেননি! বরাক উপত্যকায় এআইইউডিএফ-এর প্রার্থী নির্বাচনে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টির অভাব প্রকট হয়েছে! প্রার্থী নির্বাচনে প্রার্থী কতটুকু সম্পদশালী তা বিবেচনায় না-এনে অন্যান্য যোগ্যতাকে প্রার্থী নির্বাচনের মাপকাঠি করা যুক্তিযুক্ত বলে শিক্ষিতদের পাশাপাশি আমজনতাও মনে করেন। ধর্মের জিগির তুলে যাঁরা এতোদিন বিজেপির হিন্দুত্ববাদকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন, এই লকডাউন দেখিয়ে দিয়েছে, তা কতটুকু অসাড়! বিধানসভা নির্বাচনের আর মাস ছয়েক বাকি। তখন বোঝা যাবে, জনগণ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি চান, না ধর্মীয় বাগাড়ম্বর চান! কেন্দ্র সরকার যেভাবে বড়ো বড়ো সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্প প্রতিষ্ঠান, ব্যাঙ্ক, বিমানবন্দর, দূরপাল্লার ট্রেন, রেল স্টেশন ইত্যাদি বেসরকারি হাতে তুলে দিয়েছে, কর্মসংকোচনের পথ অবলম্বন করেছে, তাতে দেশের আশি শতাংশ জনগণ-ই যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, হবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না! ভুক্তভোগীদের মধ্য থেকেই হয়তো উঠে আসবেন সম্ভাব্য নেতা! অসমও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না। তবে, ২০১১ সালে অসমে বিধানসভা নির্বাচনের প্রাককালে বিজেপি'র সর্বভারতীয় নেতারা যেভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, জয়ী হলে বাঙালি কাউকে অসমের মুখ্যমন্ত্রী করা হবে, সেই আশার গুড়ে বালি পড়েছে! ২০১৬ সালে বিজেপি অসমে ক্ষমতায় এলেও কোনও বাঙালি হিন্দুকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়নি! বাঙালি মুসলিম বদরুদ্দীন আজমলের যেমন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হওয়া সুদূর পরাহত! তেমন-ই কোনও বাঙালি হিন্দুর পক্ষেও অসমের মুখ্যমন্ত্রী হওয়া কষ্টকল্পিত বটে! 

রিটেলেড নিউজ

“ হিন্দুরা বাংলার দেশপ্রেমি নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে আখ্যায়িত করে অশুর আর বাংলার দুশমন ক্লাইভকে আখ্যায়িত করে মা দূর্গা! ”

“ হিন্দুরা বাংলার দেশপ্রেমি নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে আখ্যায়িত করে অশুর আর বাংলার দুশমন ক্লাইভকে আখ্যায়িত করে মা দূর্গা! ”

নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা :- :   নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা :- পলাশী একটি বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস। এই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিল...বিস্তারিত


কারো পোশাক অশ্লীল নয়,  অশ্লীলতা আমাদের বিবেকে

কারো পোশাক অশ্লীল নয়,  অশ্লীলতা আমাদের বিবেকে

মো: আলাউদ্দিন : আমরা রাষ্ট্রের স্বাধীনতা পেয়েছি ঠিক কিন্তু  আমরা ব্যক্তি ক্ষেত্রে কতটুকই বা স্বাধীন!  যখন রাত...বিস্তারিত


আমরা কি ভাবতে পারছি কোন দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ?

আমরা কি ভাবতে পারছি কোন দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ?

মো: আলাউদ্দিন :   রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি, ঐতিহাসিকভাবে আরাকানী ভারতীয়ও বলা হয়ে থাকে এই জনগোষ্ঠিকে। রোহিঙ্গা হ...বিস্তারিত


ক্যান্সার নিরাময়ে হোমিও প্রতিকার

ক্যান্সার নিরাময়ে হোমিও প্রতিকার

 ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ   :     ক্যান্সার একটি কালান্তর ব্যাধি।বা কর্কটরোগ অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন সংক্রান্ত রোগসমূহে...বিস্তারিত


আমাদের মন মানসিকতার পরিবর্তন দরকার

আমাদের মন মানসিকতার পরিবর্তন দরকার

আমাদের বাংলা : :   মোহাম্মদ অালাউদ্দিন :: আমাদের এই স্বাধীন  দেশ বাংলাদেশ ।  এই দেশের নাম বাংলাদেশ রাখার পেছন...বিস্তারিত


করোনা যত বৃদ্ধি পাচ্ছে   হৃদরোগ রোগীরা  চিকিৎসা আতষ্কে   

করোনা যত বৃদ্ধি পাচ্ছে   হৃদরোগ রোগীরা  চিকিৎসা আতষ্কে   

আমাদের বাংলা : : ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ :: বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি একটি অন্যতম আতঙ্কের নাম   করোন...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

পার্বত্য ভিক্ষসংঘু ও পার্বত্য ত্রাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বই বিতরণ 

পার্বত্য ভিক্ষসংঘু ও পার্বত্য ত্রাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বই বিতরণ 

বিহারী চাকমা, রাঙামাটি : :   রাঙ্গামাটির লংগদু কলেজে পার্বত্য ভিক্ষুসংঘ ও পার্বত্য ত্রাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দরিদ্র ও ম...বিস্তারিত


আমরা কি ভাবতে পারছি কোন দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ?

আমরা কি ভাবতে পারছি কোন দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ?

মো: আলাউদ্দিন :   রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি, ঐতিহাসিকভাবে আরাকানী ভারতীয়ও বলা হয়ে থাকে এই জনগোষ্ঠিকে। রোহিঙ্গা হ...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর