বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬  

শিরোনাম

শহীদ জিয়াউর রহমান : বাংলাদেশের ইতিহাসে যিনি অনিবার্য অধ্যায়

আমাদের বাংলা ডেস্ক :    |    ১২:২১ পিএম, ২০২৬-০১-১৯

শহীদ জিয়াউর রহমান : বাংলাদেশের ইতিহাসে যিনি অনিবার্য অধ্যায়

অধ্যাপক ড. মোহা. হাছানাত আলী :
রাষ্ট্রের জন্ম কেবল বিজয়ের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না; প্রকৃত রাষ্ট্র জন্ম নেয় বিজয়ের পরের অনিশ্চয়তা, ভাঙন ও পুনর্গঠনের সংগ্রামে। বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতা অর্জনের মুহূর্ত যতটা গৌরবোজ্জ্বল, স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্র নির্মাণের পথ ততটাই কণ্টকাকীর্ণ, দ্বিধাগ্রস্ত ও রক্তাক্ত। এই সংকটময় ইতিহাসের মধ্যেই জিয়াউর রহমান আবির্ভূত হন—একজন ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি সময়ের প্রতিনিধি হয়ে। জিয়াউর রহমানকে বোঝা মানে কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তা বা রাষ্ট্রপতির জীবনী পাঠ করা নয়; বরং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার এক ভিন্ন প্রবাহ, এক বিকল্প ভাষা ও এক অনিশ্চিত অভিযাত্রাকে অনুধাবন করা।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই কালরাত্রির পর বাংলাদেশ ছিল নেতৃত্বহীন এক বিস্তীর্ণ অন্ধকার। রাষ্ট্র তখনো জন্ম নেয়নি, কিন্তু মানুষের মনে রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা ছিল তীব্র। ঠিক সেই শূন্য মুহূর্তে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে আসে একটি কণ্ঠ—মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠ।
এই ঘোষণা নিছক একটি সামরিক বার্তা ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের প্রথম উচ্চারণ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি ছিল বাংলাদেশের প্রাথমিক বৈধতার ঘোষণাপত্র। ইতিহাসে বহু রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছে এমন উচ্চারণের মধ্য দিয়েই—যেখানে অস্ত্রের চেয়ে কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে অধিক শক্তিশালী।
পরবর্তী সময়ে সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসমরে তার উপস্থিতি তাকে রাষ্ট্রের যোদ্ধা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। যুদ্ধের মাঠে অর্জিত এই নৈতিক পুঁজি পরবর্তীকালে তার রাষ্ট্র গঠনের দাবিকে শক্ত ভিত দেয়।
১৯৭১ সালের বিজয়ের পর বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও রাষ্ট্রের আত্মা তখনো স্থির হয়নি। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, ভেঙে পড়া প্রশাসন, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক অপরিপক্বতা—সব মিলিয়ে রাষ্ট্র যেন দাঁড়িয়ে ছিল কাঁচের ওপর।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ সেই ভঙ্গুরতাকে নগ্ন করে দেয়। বাকশালের একদলীয় ব্যবস্থা রাষ্ট্রের বহুত্ববাদী সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে। আর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রকে ছিন্নভিন্ন করে দেয় এক ভয়াবহ রাজনৈতিক ট্র্যাজেডিতে।
এরপর একের পর এক অভ্যুত্থান রাষ্ট্রের কাঠামোকে এমনভাবে নড়বড়ে করে তোলে, যেখানে বাংলাদেশ কার্যত একটি দিশাহীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এই রাজনৈতিক নৈরাজ্যের মধ্যেই ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন।
এখান থেকেই শুরু হয় তার প্রকৃত রাষ্ট্র নির্মাণের সংগ্রাম।
জিয়া জানতেন—শক্তি দিয়ে ক্ষমতা দখল করা যায়, কিন্তু রাষ্ট্র চালানো যায় না। তার সামনে তাই প্রধান প্রশ্ন ছিল ক্ষমতার স্থায়িত্ব নয়, রাষ্ট্রের বৈধতা।
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি রাষ্ট্র টিকে থাকে তিনটি ভিত্তির ওপর—
১. আদর্শ
২. জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক
৩. কার্যকর শাসন কাঠামো
এই তিন স্তম্ভ পুনর্গঠন করাই হয়ে ওঠে তার রাষ্ট্রচিন্তার মূল লক্ষ্য।
রাষ্ট্র গঠনে জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী অবদান হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ধারণার প্রবর্তন। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রচিন্তা যেখানে ভাষাভিত্তিক বাঙালি পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, জিয়া সেখানে ভূখণ্ড, ইতিহাস, ধর্মীয় অনুভূতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সমন্বয়ে একটি বৃহত্তর জাতীয় পরিচয়ের কথা বলেন।
এই জাতীয়তাবাদ—পাহাড় থেকে সমতল, সংখ্যালঘু থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ—সবার জন্য রাষ্ট্রকে উন্মুক্ত করে, ধর্মকে রাষ্ট্রের সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু ধর্মতন্ত্রে রূপ দেয় না।
“আমরা বাঙালি” পরিচয়ের পাশাপাশি “আমরা বাংলাদেশি” চেতনার জন্ম দেয়।
এটি ছিল এক ধরনের নাগরিক ও ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের সংমিশ্রণ—যা রাষ্ট্রকে কেবল আবেগ নয়, বাস্তবতার ওপর দাঁড় করাতে চেয়েছিল।
জিয়াউর রহমান সংবিধানকে কেবল আইনি দলিল হিসেবে দেখেননি; দেখেছিলেন রাষ্ট্রের দর্শন হিসেবে।
তিনি সংবিধানে পরিবর্তন এনে রাষ্ট্রের আদর্শিক ভাষাকে সময় ও সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করেন।
বাকশালের পর বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল স্তব্ধ। জিয়া সেই স্তব্ধতায় প্রাণ সঞ্চার করেন বহুদলীয় রাজনীতির মাধ্যমে। রাজনৈতিক দল গঠনের স্বাধীনতা, নির্বাচন আয়োজন এবং বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি রাজনীতিকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনেন।
গ্রাম, মফস্বল ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি রাজনীতিতে যুক্ত হয়। রাষ্ট্র আবার রাজপথ ও সংসদের মধ্যে সেতুবন্ধন খুঁজে পায়।
জিয়ার রাষ্ট্রচিন্তা ছিল রাজধানীমুখী নয়, গ্রামমুখী। গ্রাম সরকার, স্বনির্ভরতা কর্মসূচি, কৃষিভিত্তিক উন্নয়ন—এসবের মধ্য দিয়ে তিনি রাষ্ট্রের শক্তিকে নিচ থেকে ওপরে তুলে আনতে চেয়েছিলেন।
এটি ছিল রাষ্ট্র নির্মাণের এক মানবিক দর্শন—যেখানে রাষ্ট্র মানুষের কাছে যায়, মানুষ রাষ্ট্রের কাছে নয়।
অর্থনীতি ও স্বনির্ভরতার দর্শন
জিয়ার অর্থনৈতিক দর্শন ছিল বাস্তববাদী। সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি এমন একটি পথ বেছে নেন, যেখানে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরতা মুখ্য। প্রবাসী শ্রমিক, কৃষক ও উদ্যোক্তা—এই তিন শ্রেণিকে তিনি রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে দেখেছিলেন।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পররাষ্ট্রনীতিতে জিয়া বাংলাদেশকে একঘরে না রেখে বহুমাত্রিক পথে হাঁটান। মুসলিম বিশ্ব, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও তৃতীয় বিশ্বের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সার্কের ধারণা দিয়ে তিনি আঞ্চলিক রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশের উপস্থিতি জানান দেন।
জিয়াউর রহমান সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। সামরিক শাসন, সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ—এসব প্রশ্ন ইতিহাসে রয়ে গেছে। তবে সংকটকালে রাষ্ট্র নির্মাতারা সবসময়ই আলোচিত ও সমালোচিত  হন—কারণ তারা নিখুঁত পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।
রাষ্ট্র নির্মাতার ছায়া
জিয়াউর রহমান কোনো পূর্ণাঙ্গ উত্তর নন; তিনি একটি প্রশ্ন। তিনি দেখিয়ে গেছেন—সংকটের মধ্যেও রাষ্ট্রকে নিয়ে ভাবা যায়, ভাঙনের মধ্যেও পুনর্গঠনের স্বপ্ন দেখা যায়। 
বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি এক অনিবার্য অধ্যায়—যাকে অস্বীকার নয়, বরং গভীরভাবে পাঠ করা প্রয়োজন।
অধ্যাপক ড. মোহা. হাছানাত আলী : উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়

রিটেলেড নিউজ

মাতৃভাষার মর্যাদা ও বাঙালির দায়

মাতৃভাষার মর্যাদা ও বাঙালির দায়

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মাতৃভাষা একটি জাতির আত্মার প্রতিচ্ছবি। ভাষার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে ইতিহাস, সংস্কৃতি, চেতনা ও স্বপ্...বিস্তারিত


মন্ত্রী পাড়ার নতুন ভবন

মন্ত্রী পাড়ার নতুন ভবন

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : চিররঞ্জন সরকার : বাঙালি কী পারে? এই কালজয়ী প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কোনো সমাজবিজ্ঞানীর দরকার নে...বিস্তারিত


অর্থনীতি এখনো মুমূর্ষু

অর্থনীতি এখনো মুমূর্ষু

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : দেশের রাজনীতি এখন গরম। দেশজুড়ে নির্বাচনী আবহ। সবাই অপেক্ষা করছে একটি রাজনৈতিক সরকারের। সবারই আশা...বিস্তারিত


নির্মাণ কাজে অবহেলাজনিত মৃত্যুর দায় কার?

নির্মাণ কাজে অবহেলাজনিত মৃত্যুর দায় কার?

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : ইকবাল হাবিব : ঢাকার আকাশরেখা বদলাচ্ছে দ্রুতগতিতে, উঠছে বহুতল ভবন, চলছে মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ...বিস্তারিত


নির্বাচন অর্থবহ করতে সশস্ত্র বাহিনীই আস্থার প্রতীক

নির্বাচন অর্থবহ করতে সশস্ত্র বাহিনীই আস্থার প্রতীক

আমাদের বাংলা ডেস্ক : :  এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান : ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কখনও কখনও এই ভোট নিয়ে শঙ...বিস্তারিত


মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন কি নির্বাচনকে প্রভাবিত করে?

মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন কি নির্বাচনকে প্রভাবিত করে?

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : রাজীব নন্দী : গণমাধ্যম যখন ক্রমশ ‘গণ’ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষমতার প্রতিধ্বনিতে পর্যবসিত হচ্ছে, ...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

নোয়াখালী প্রতিনিধি : : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্তার অ...বিস্তারিত


সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : সৌদি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, স্পীড লিমিট এর চাইতে অধিক গতিতে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের উপ...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর


A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: fwrite(): write of 34 bytes failed with errno=122 Disk quota exceeded

Filename: drivers/Session_files_driver.php

Line Number: 265

Backtrace:

A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: session_write_close(): Failed to write session data using user defined save handler. (session.save_path: /var/cpanel/php/sessions/ea-php74)

Filename: Unknown

Line Number: 0

Backtrace: