শিরোনাম
আমাদের বাংলা ডেস্ক : | ০৫:৩৮ পিএম, ২০২৬-০২-১১
মাতৃভাষা একটি জাতির আত্মার প্রতিচ্ছবি। ভাষার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে ইতিহাস, সংস্কৃতি, চেতনা ও স্বপ্ন। বাঙালির জাতিসত্তা গড়ে উঠেছে বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করেই। তাই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করা শুধু আবেগের বিষয় নয়—এটি বাঙালির ঐতিহাসিক ও নৈতিক দায়িত্ব। বিশ্বায়নের এই যুগে তরুণ প্রজন্মই সবচেয়ে বেশি সংযুক্ত—ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বৈশ্বিক সংস্কৃতির সঙ্গে। তারা যেমন দ্রুত নতুন ভাষা ও ধারণা আয়ত্ত করছে, তেমনি অজান্তেই দূরে সরে যাচ্ছে নিজের মাতৃভাষা থেকে। এই বাস্তবতায় গ্লোবাল যুগে মাতৃভাষার লড়াইয়ের প্রধান সৈনিকও আবার এই যুগের তরুণরাই।ভাষা শুধু পরীক্ষার বিষয় বা পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় নয়। ভাষা মানুষের চিন্তার কাঠামো তৈরি করে, তার আত্মপরিচয় গড়ে তোলে। তরুণরা যদি শুদ্ধ ও সাবলীল বাংলায় কথা বলতে, লিখতে ও ভাবতে অভ্যস্ত না হয়, তবে ভবিষ্যতে বাংলা ভাষার গভীরতা ও সৃজনশীলতা হ্রাস পাবে। আধুনিক হওয়ার নামে মাতৃভাষাকে অবহেলা করা আসলে নিজের শেকড়কেই দুর্বল করা।
আজ অনেক তরুণ মনে করে—ইংরেজি বা অন্য বিদেশি ভাষায় দক্ষ হলেই সফলতা নিশ্চিত। বাস্তবে বিশ্বে সবচেয়ে প্রভাবশালী জাতিগুলো নিজের ভাষাকে শক্ত ভিত্তি করেই বহুভাষিক দক্ষতা অর্জন করেছে। মাতৃভাষায় চিন্তার ভিত মজবুত না হলে জ্ঞান ও সৃজনশীলতার বিকাশও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।তরুণ প্রজন্মের দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ভাষার ব্যবহার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিকৃত বানান, অপ্রয়োজনীয় বিদেশি শব্দ ও বাংলা-ইংরেজির অযথা মিশ্রণ ভাষার স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট করছে। প্রযুক্তিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই; বরং প্রযুক্তিকেই মাতৃভাষার শক্তিতে রূপান্তর করার দায়িত্ব তরুণদেরই নিতে হবে।আজ প্রয়োজন ডিজিটাল বাংলার নেতৃত্ব। ব্লগ, ইউটিউব, পডকাস্ট, অ্যাপ, গবেষণা ও কনটেন্ট—সবখানেই শুদ্ধ ও আধুনিক বাংলার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।তরুণরাই পারে বাংলাকে শুধু আবেগের ভাষা নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে।
অমর একুশে ফেব্রুয়ারি—বাঙালির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। এ দিনটি শুধু শোকের নয়, গৌরবেরও।
অমর একুশ ও প্রভাতফেরীর গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি/ ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু, গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি/ আমার সোনার দেশের, রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ আমাদের ইতিহাসের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রভাতফেরীর সময় বাজতে থাকে সাংবাদিক ও লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরীর রচিত এই গানটি।একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সহ বিশ্বের সকল বাংলা ভাষা ব্যবহারকারী জনগণের গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন। এটি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও সুপরিচিত। বাঙালির ভাষা আন্দোলনের মর্মন্তুদ ও গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিবিজড়িত একটি দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ১৯৫২ সালের এ দিনে (৮ ফাল্গুন, ১৩৫৮, বৃহস্পতিবার) বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। এতে অনেক তরুণ শহীদ হন।কারণ পৃথিবীর বুকে একমাত্র জাতি হিসেবে বাঙালিরাই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে। ১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে যারা রাজপথে নেমে এসেছিলেন, তারা জানতেন না—তাদের এই আত্মত্যাগ একদিন বিশ্বমানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।পাকিস্তান সৃষ্টির পর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা হওয়া সত্ত্বেও বাংলাকে উপেক্ষা করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত ছিল রাজনৈতিক বৈষম্যের স্পষ্ট উদাহরণ। এই অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজই প্রথম প্রতিবাদের ঝাণ্ডা তুলে ধরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ভাষার অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান নেন। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে। তাঁদের রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ, আর সেই রক্ত থেকেই জন্ম নেয় বাঙালির আত্মপরিচয়ের দৃঢ় ভিত্তি।ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার স্বীকৃতির আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল সাংস্কৃতিক মুক্তির সূচনা। এই আন্দোলনের পথ ধরেই বাঙালি জাতি ধীরে ধীরে স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয়। ভাষা আন্দোলনের চেতনাই পরবর্তীতে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের বীজ রোপণ করে। তাই ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গভীর বাঁকবদলের দিন।মাতৃভাষা মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও সৃষ্টিশীলতার প্রধান অবলম্বন। মানুষ তার মাতৃভাষায় সবচেয়ে স্বচ্ছভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে। একটি জাতির সাহিত্য, সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য ও জীবনদর্শন মাতৃভাষার মধ্য দিয়েই বহমান থাকে। মাতৃভাষাকে অবহেলা করা মানে নিজের শেকড়কেই অস্বীকার করা। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এর ফলে বাংলা ভাষা আন্দোলন বৈশ্বিক স্বীকৃতি লাভ করে এবং ভাষার অধিকার রক্ষার সংগ্রাম বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। আজ পৃথিবীর বহু দেশে বিলুপ্তপ্রায় ভাষা রক্ষায় এই দিনটি নতুন করে প্রেরণা জোগাচ্ছে। তবে বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো—আমরাই অনেক সময় নিজেদের মাতৃভাষার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ছি। শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্পোরেট জগৎ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুদ্ধ বাংলা ব্যবহারের পরিবর্তে অযথা বিদেশি শব্দ ও ভাষার প্রাধান্য বাড়ছে। এতে বাংলা ভাষার সৌন্দর্য ও স্বকীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহন করতে হলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ভাষার যথাযথ চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।মাতৃভাষা দিবস তাই শুধু অতীত স্মরণের দিন নয়; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়বদ্ধতার দিন। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্র—সব স্তরে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরা এবং তাদের মধ্যে ভাষাপ্রীতি জাগ্রত করাই হবে এই দিনের প্রকৃত শ্রদ্ধা।
একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভাষা মানেই পরিচয়, ভাষা মানেই স্বাধীনতা। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় যে রক্তদান হয়েছে, তা যেন কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। ভাষা শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা তখনই আদায় হবে, যখন আমরা বাংলাকে হৃদয়ে ধারণ করে, চিন্তায় ও কাজে এর মর্যাদা অটুট রাখব।একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের শেখায়—ভাষার জন্য দাঁড়াতে হলে সাহস লাগে। এক সময় এই সাহস দেখিয়েছিল ছাত্রসমাজ। আজ সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকারী তরুণদের সামনে লড়াইয়ের ধরন বদলেছে, কিন্তু দায়িত্ব বদলায়নি। এখন রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন সচেতন চর্চা, সৃজনশীল ব্যবহার ও ভাষার মর্যাদা রক্ষার দৃঢ় অবস্থান।গ্লোবাল যুগে টিকে থাকতে হলে তরুণদের বিশ্বমুখী হতে হবে, কিন্তু মাতৃভাষাকে পেছনে ফেলে নয়। বরং বাংলাকে হৃদয়ে ধারণ করেই বিশ্বকে জানানো—এই হোক নতুন প্রজন্মের অঙ্গীকার। মাতৃভাষার ভবিষ্যৎ আজ তরুণদের হাতেই; তারা চাইলে বাংলা শুধু টিকে থাকবে না, বিশ্বে নতুন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখক: চন্দন দেব নাথ
কলামিস্ট, চট্টগ্রাম।
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : চিররঞ্জন সরকার : বাঙালি কী পারে? এই কালজয়ী প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কোনো সমাজবিজ্ঞানীর দরকার নে...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : দেশের রাজনীতি এখন গরম। দেশজুড়ে নির্বাচনী আবহ। সবাই অপেক্ষা করছে একটি রাজনৈতিক সরকারের। সবারই আশা...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : ইকবাল হাবিব : ঢাকার আকাশরেখা বদলাচ্ছে দ্রুতগতিতে, উঠছে বহুতল ভবন, চলছে মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান : ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কখনও কখনও এই ভোট নিয়ে শঙ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : রাজীব নন্দী : গণমাধ্যম যখন ক্রমশ ‘গণ’ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষমতার প্রতিধ্বনিতে পর্যবসিত হচ্ছে, ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : অধ্যাপক ড. মোহা. হাছানাত আলী : রাষ্ট্রের জন্ম কেবল বিজয়ের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না; প্রকৃত রাষ্ট্র জ...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited