বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬  

শিরোনাম

সকল আন্দোলনের মূর্তপ্রতীক: নোবিপ্রবির কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার

আমাদের বাংলা ডেস্ক :    |    ০৪:২২ পিএম, ২০২৫-১১-১০

সকল আন্দোলনের মূর্তপ্রতীক: নোবিপ্রবির কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার

মো সামিউল হাসান স্বাধীন :
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) — এক সময়ের নির্জন মেঠোপথে গড়ে ওঠা এক আলোকিত শিক্ষাঙ্গন। ২০০৬ সালে পথচলা শুরু করা এই বিশ্ববিদ্যালয় আজ কেবল জ্ঞানের কেন্দ্র নয়, এটি ত্যাগ, প্রতিবাদ, ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতীকও বটে। আর এই সব আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে এক নীরব সাক্ষী— কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, যা নোবিপ্রবির ইতিহাসে আন্দোলন, প্রতিবাদ ও ঐক্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
একটি প্রতীকের সূচনা
নোবিপ্রবির কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি কেবল একটি স্থাপনা নয়— এটি এক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা একটি সাংস্কৃতিক ও মুক্তচিন্তার কেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নের অংশ হিসেবেই নির্মিত হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।
ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত হলেও, সময়ের পরিক্রমায় এটি হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায়বিচার, অধিকার ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক। দিন শেষে এই মিনারই যেন সাক্ষী থাকে সব আনন্দ, বেদনা, রক্ত ও ঘাম মিশে থাকা সংগ্রামের।
আন্দোলনের সূতিকাগার
নোবিপ্রবির ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়— প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের সূচনা হয়েছে এই শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক বছরগুলোতে অবকাঠামোগত দুরবস্থা, আবাসন সংকট, ও একাডেমিক জটিলতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা যখন ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল, তখন শহীদ মিনারই ছিল তাদের প্রথম সমাবেশের স্থান।
২০০৮ সালের দিকে শিক্ষার্থীরা “বাস্তবসম্মত ক্লাস ও পরীক্ষা সূচি” দাবি করে যে আন্দোলন শুরু করেছিল, তার প্রথম সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় এই মিনারের সামনেই। তখন থেকেই এটি হয়ে ওঠে ন্যায় ও সত্যের মঞ্চ।
শিক্ষকদের অধিকার আন্দোলন
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, শিক্ষক সমাজও এই প্রাঙ্গণকে ব্যবহার করেছে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর স্থান হিসেবে।
২০১৩ সালে শিক্ষকদের পদোন্নতি নীতিমালা ও বেতন কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিলে তাঁরা শহীদ মিনারে একত্রিত হয়ে মানববন্ধন ও প্রতীকী অনশন কর্মসূচি পালন করেন।
শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে তারা বলেছিলেন— “এই মিনার আমাদের শেখায়, নত নয়, দৃপ্ত হয়ে দাঁড়াতে।”
পরবর্তী বছরগুলোতেও শিক্ষক সমাজের দাবিদাওয়া, প্রশাসনিক সংস্কার, একাডেমিক স্বচ্ছতা— সব কিছু নিয়েই এই স্থানটি হয়ে ওঠে এক মুক্ত মঞ্চ।
কর্মচারীদের সংগ্রাম
নোবিপ্রবির কর্মচারীরাও ছিলেন আন্দোলনের ধারাবাহিক অংশ।
২০১৫ সালে বেতন বৈষম্য ও চাকরির স্থায়িত্ব নিয়ে কর্মচারীরা যখন প্রতিবাদে নামেন, তখন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণই তাদের আশ্রয় হয়ে ওঠে।
দিনের পর দিন কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তখন অনেকেই বলেছিলেন— “এই মিনার শুধু স্মৃতির নয়, এটি আমাদের জীবনের প্রতিরোধের প্রতীক।”
শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনগুলো
নোবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই সময় সময় বিভিন্ন ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনে অংশ নিয়েছে।
২০১৮ সালের “নিরাপদ সড়ক আন্দোলন”, “কোটা সংস্কার আন্দোলন”, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সমস্যা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই শহীদ মিনার ছিল শিক্ষার্থীদের সমাবেশস্থল।
২০২০ সালের দিকে কোভিড-১৯ মহামারির সময়েও শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতীকী প্রতিবাদ জানায় অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য ও বিশ্ববিদ্যালয় খোলার দাবিতে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন এই শহীদ মিনার থেকেই শুরু করে। এই জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সাথে একাত্মতা পোষণ করে তিনজন মহান শিক্ষক ব্যানার হাতে শহীদ মিনারের সামনে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। 
আরও সাম্প্রতিক সময়ে, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে প্রশাসনিক জটিলতা, আবাসন সংকট ও খাদ্য মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদেও শিক্ষার্থীরা মিনার প্রাঙ্গণকে করেছে তাদের প্রতিবাদের মঞ্চ।
শহীদ মিনারের চারপাশে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীদের মুখে তখন একটাই স্লোগান ধ্বনিত হয়েছিল—
“এই মিনার আমাদের শক্তি, এই মিনার আমাদের চেতনা!”
ঐক্যের প্রতীক হিসেবে শহীদ মিনার
নোবিপ্রবির ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো— যতই ভিন্ন ভিন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলন হোক না কেন, শহীদ মিনার সব সময় ঐক্যের কেন্দ্র হয়ে থেকেছে।
শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারী— তিন পক্ষেরই যখন উদ্দেশ্য হয় ন্যায্যতার দাবি, তখন এই মিনার তাদের একসূত্রে বেঁধে রাখে।
এখানেই তাঁরা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে জাতীয় শোক দিবস, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি কিংবা স্বাধীনতা দিবসে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এমনকি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক, কবিতা পাঠ— সব কিছুতেই শহীদ মিনার যেন প্রাণকেন্দ্র হয়ে আছে।

সাংস্কৃতিক চেতনার কেন্দ্রবিন্দু
নোবিপ্রবির শহীদ মিনার কেবল আন্দোলনের স্থান নয়, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক জাগরণেরও কেন্দ্র।
প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভাতফেরি, কবিতা আবৃত্তি, নাটক ও সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
রাতভর আলপনা, মোমবাতির আলো আর প্রভাতের ফুলে ঢেকে যায় মিনার প্রাঙ্গণ।
এই আয়োজন শুধু শোক নয়, এটি হয়ে ওঠে এক সাংস্কৃতিক নবজাগরণের প্রতীক।
সময়ের সাক্ষী শহীদ মিনার
নোবিপ্রবির কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার যেন এক জীবন্ত ইতিহাস।
এটি দেখেছে উত্তাল স্লোগান, বিক্ষুব্ধ মিছিল, আবার কখনো দেখেছে নীরব প্রার্থনা ও চোখের জল।
এখানে কখনো জেগেছে প্রতিবাদের অগ্নিশিখা, আবার কখনো শান্তির প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছে নিস্তব্ধ হয়ে।
প্রতিটি ইট, প্রতিটি ধাপ যেন বলে— “আমি দেখেছি, তোমাদের ত্যাগ, তোমাদের প্রতিবাদ।”
আজকের প্রজন্ম ও শহীদ মিনারের প্রেরণা
আজকের নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা শহীদ মিনারকে দেখে শুধু ভাষা শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে নয়, বরং ন্যায় ও সাহসের প্রতীক হিসেবে।
নতুন প্রজন্ম জানে, এই মিনারই তাদের শেখায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে।
এই প্রাঙ্গণই তৈরি করে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব, যারা দেশের উন্নয়ন, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে কাজ করবে।
নোবিপ্রবির কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সময়ের পর সময় ধরে সকল আন্দোলনের মূর্তপ্রতীক হয়ে আছে।
এটি কেবল পাথরের স্তম্ভ নয়, এটি নোবিপ্রবির আত্মা— যা শিক্ষা, সংস্কৃতি, ন্যায় ও প্রতিবাদের এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন তৈরি করেছে।
এই মিনারের ছায়াতেই গড়ে উঠেছে এক প্রজন্মের পর প্রজন্ম, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার, মানবিকতায় বিশ্বাসী, আর নোবিপ্রবির গৌরবময় ইতিহাসের ধারক।
যত দিন এই বিশ্ববিদ্যালয় টিকে থাকবে, তত দিন শহীদ মিনার থাকবে তার হৃদয়ে—
ত্যাগ, প্রতিবাদ ও প্রেরণার চিরন্তন প্রতীক হয়ে।

রিটেলেড নিউজ

ফেসবুক থেকে সংবাদ: কেন যাচাই জরুরি 

ফেসবুক থেকে সংবাদ: কেন যাচাই জরুরি 

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার : ডিজিটাল সময়ের এক বহুল উচ্চারিত প্রশ্ন—Facebook-এ কেউ কিছু লিখলেই গণমাধ্যম কেন তা ...বিস্তারিত


বইমেলা শেষ আজ: কবিতা-ছড়া ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে প্রাণবন্ত ১৯ দিন

বইমেলা শেষ আজ: কবিতা-ছড়া ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে প্রাণবন্ত ১৯ দিন

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার :  চট্টগ্রামে সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে ৩১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ১৯ দিনব্যাপী স্...বিস্তারিত


চট্টগ্রামের চব্বিশের ক্যানভাস, আন্দোলনে এক প্রজন্মের জাগরণ ও আত্মত্যাগ, “দাবির স্ফুলিঙ্গ থেকে গণঅভ্যুত্থানের দাবানল:

চট্টগ্রামের চব্বিশের ক্যানভাস, আন্দোলনে এক প্রজন্মের জাগরণ ও আত্মত্যাগ, “দাবির স্ফুলিঙ্গ থেকে গণঅভ্যুত্থানের দাবানল:

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার  ফেব্রুয়ারি মানেই বই-এর মৌ মৌ ঘ্রাণ, গল্প-কবিতার সমাহারে মেলার ক্যানভাস। নয়ত...বিস্তারিত


আন্দোলন সংগ্রামের মূর্ত প্রতীক নোবিপ্রবির ফাউন্টেনপেন

আন্দোলন সংগ্রামের মূর্ত প্রতীক নোবিপ্রবির ফাউন্টেনপেন

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : সামিয়া হোসেন মুনিয়া : নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) প্রধান ফটক দিয়ে প্...বিস্তারিত


স্মার্টফোন: সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টির নতুন অস্ত্র

স্মার্টফোন: সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টির নতুন অস্ত্র

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : লেখক: মাহাবুব রহমান দুর্জয় : এক ক্লিকেই ভাঙছে সম্পর্কের নীরব বন্ধন : একটা সময় ছিল, সন্ধ্যা নামলেই ...বিস্তারিত


শীতে রূপ-লাবণ্যে ভরে উঠে নোবিপ্রবি ক্যাম্পাস

শীতে রূপ-লাবণ্যে ভরে উঠে নোবিপ্রবি ক্যাম্পাস

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মেহেদী হাসান : ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ— এখানে প্রতিটি ঋতু আসে নিজস্ব রূপ, রস ও গন্ধ নিয়ে। ঠিক তেমনি নো...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

নোয়াখালী প্রতিনিধি : : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্তার অ...বিস্তারিত


সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : সৌদি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, স্পীড লিমিট এর চাইতে অধিক গতিতে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের উপ...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর