শিরোনাম
আমাদের বাংলা ডেস্ক : | ০৪:৩৮ পিএম, ২০২৬-০৩-২৫
- মাহাবুব রহমান দুর্জয়
১৯৭১ সালের মার্চের শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের আকাশ ছিল উত্তপ্ত। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অনিচ্ছা বাঙালির মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু যখন ঘোষণা করেন যে এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম তখনই পাকিস্তান সামরিক জান্তা আলোচনার আড়ালে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ১৭ই মার্চ জেনারেল টিক্কা খান এবং রাও ফরমান আলী অপারেশন সার্চলাইট এর চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করেন। এই অভিযানের মূল দর্শন ছিল মানুষ নয় বরং মাটি চাই। অর্থাৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে প্রয়োজনে কয়েক লক্ষ মানুষকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ২২শে মার্চ ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর গোপন বৈঠক শেষে পঁচিশের সেই কালরাত্রির ঘড়ির কাঁটা নির্ধারণ করা হয়।
২৫শে মার্চ রাত ১১টা ৩০ মিনিটে ঢাকা সেনানিবাস থেকে ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান বের হয়ে আসে। এই সামরিক অভিযানের প্রধান লক্ষ্য ছিল ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো দখল করা। অপারেশনাল কোড অনুযায়ী প্রধান লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পিলখানা ইপিআর সদর দপ্তর, রেডিও স্টেশন এবং বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি। আক্রমণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে পাকিস্তানি সৈন্যরা সাধারণ মানুষের জানমালের কোনো তোয়াক্কা করেনি। তারা মর্টার শেল দিয়ে আবাসিক ভবনগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং মানুষ ঘর থেকে বের হওয়া মাত্রই ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। সেই রাতের বিভীষিকা কেবল ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতেও সমান্তরালভাবে হত্যাকাণ্ড শুরু হয়।
বাঙালির মেধা ও জাতীয়তাবাদের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাই পাকিস্তানি হায়েনাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল এই বিদ্যাপীঠ। জগন্নাথ হল, জহুরুল হক হল এবং রোকেয়া হলে তারা পৈশাচিক তান্ডব চালায়। ডক্টর গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ডক্টর জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা এবং অধ্যাপক ফজলুর রহমান খানের মতো বরেণ্য শিক্ষকদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এমনকি হলের কর্মচারীদের সন্তানদেরও তারা রেহাই দেয়নি। জগন্নাথ হলের মাঠটি হয়ে উঠেছিল এক বিশাল গণকবর যেখানে ছাত্রদের দিয়ে গর্ত খুঁড়িয়ে সেখানেই তাদের মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। বুদ্ধিজীবী হত্যার এই প্রাথমিক মহড়া ছিল একটি জাতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ।
অপারেশন সার্চলাইটের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীকে নিরস্ত্র করা। কিন্তু রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে বাঙালি পুলিশ সদস্যরা অসীম সাহসে রুখে দাঁড়ান। থ্রি নট থ্রি রাইফেলের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আধুনিক এলএমজি ও ট্যাংকের লড়াই ছিল অসম কিন্তু সেই প্রতিরোধই ছিল স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা। ওয়ারলেসের মাধ্যমে রাজারবাগ থেকে সারা দেশে বার্তা পাঠানো হয় যে শত্রু আমাদের আক্রমণ করেছে এবং আপনারা প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। পিলখানায় ইপিআর জওয়ানরা একইভাবে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেন। যদিও তারা সেই রাতে টিকতে পারেননি কিন্তু তাদের আত্মত্যাগ বাংলার প্রতিটি ঘরে স্বাধীনতার মন্ত্র পৌঁছে দিয়েছিল।
রাত দেড়টার দিকে পাকিস্তানি কমান্ডো বাহিনী ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে হানা দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জানতেন তাকে গ্রেপ্তার করা হবে তাই গ্রেপ্তারের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন। ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে তিনি বলেন যে আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। এই ঘোষণাটি ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। পাকিস্তানিরা ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করলে আন্দোলন থেমে যাবে কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি যে বঙ্গবন্ধু তখন কেবল একজন ব্যক্তি নন বরং তিনি ছিলেন সাত কোটি বাঙালির আস্থার প্রতীক।
তৎকালীন পাকিস্তানি সরকার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করেছিল। সকল বিদেশি সাংবাদিককে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। তবে সাইমন ড্রিং এবং আলোকচিত্রী মিশেল লরেন্ট জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লুকিয়ে থাকেন এবং ২৭শে মার্চ সকালে ধ্বংসস্তূপের ছবি ও সংবাদ বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেন। লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় সাইমন ড্রিংয়ের রিপোর্টটি ছিল অপারেশন সার্চলাইটের ভয়াবহতার প্রথম প্রামাণিক দলিল। পরবর্তীতে অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের সান্ডে টাইমস এর প্রতিবেদন এবং আর্চার কে ব্লাডের ব্লাড টেলিগ্রাম আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখ খুলে দিয়েছিল। তারা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে একে জেনোসাইড বা পরিকল্পিত গণহত্যা বলে অভিহিত করেন।
২৫শে মার্চের সেই বিভীষিকা থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছিল বাঙালি জাতি। অপারেশন সার্চলাইটের আগুন বাঙালির হৃদয়ে যে বিদ্রোহের জন্ম দিয়েছিল তা ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয়ের মাধ্যমে পূর্ণতা পায়। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত আর ২ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন। আজ যখন আমরা সেই কালরাত্রিকে স্মরণ করি তখন আমাদের শপথ নিতে হবে যে ইতিহাসের এই নির্মমতাকে ভুলতে দেওয়া যাবে না। শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:
১. সিদ্দিক সালিক রচিত উইটনেস টু সারেন্ডার।
২. অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের দ্য রেপ অব বাংলাদেশ।
৩. আর্চার কে ব্লাডের দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম।
৪. মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধ কোষ।
৫. রবার্ট পেইন রচিত ম্যাসাকার।
৬. সাইমন ড্রিংয়ের ডেইলি টেলিগ্রাফ প্রতিবেদন।
লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা, সমাজকর্মী এবং কলামিস্ট।
ইমেইল : mahabaubrahmandurjoy@gmail.com
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র ব...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে একটি নীরব যন্ত্...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মেজর (অব.) মনজুর কাদের সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘চীনকে ঘুমাতে দাও; যখন সে জেগে উঠবে, সে বিশ্বকে কা...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কাজী আব্দুল্লাহ আল বোরহান রিজভী বাংলাদেশ গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং সামাজ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্ত...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার : শহরের ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়ানো ক্ষুদ্র দোকানি, গ্রামের হতাশ তরুণ কিংবা চাকরির আশায়...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited