শিরোনাম
আমাদের বাংলা ডেস্ক : | ০২:৪৪ পিএম, ২০২৬-০৬-১১
আবদুল্লাহ মজুমদার
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ এখন আর কেবল একটি আর্থিক সূচক নয়; এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকট। ব্যাংকের তারল্য, বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাব স্পষ্ট। এই বাস্তবতার মধ্যে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া যেমন কঠোর হওয়া প্রয়োজন, তেমনি তা যেন ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতার সীমারেখা অতিক্রম না করে—এটিও জরুরি।
সমাজে এখনো একটি গভীর ভুল ধারণা রয়েছে যে, ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলেই বুঝি গ্রেপ্তার, জেল বা সর্বস্ব হারানোর ঝুঁকি অনিবার্য। এই ধারণা যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনি আইনের সঠিক ব্যাখ্যার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। বাংলাদেশে ঋণ আদায় মূলত দেওয়ানি আইনের আওতায় পরিচালিত হয়। অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ অনুযায়ী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের পাওনা আদায়ের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে। কিন্তু কেবল ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়।
তবে বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপ বহু সৎ ঋণগ্রহীতাকেও সংকটে ফেলেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসায়িক মন্দা, আয় সংকোচন, চিকিৎসা ব্যয় ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা অনেককে বাধ্য করেছে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হতে। ফলে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও অনিচ্ছাকৃত সংকটে পড়া ঋণগ্রহীতার মধ্যে পার্থক্য করা এখন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
ঋণ সমস্যায় সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো আতঙ্ক ও ভুল তথ্য। অনেক ঋণগ্রহীতা ব্যাংকের নোটিশ পাওয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর আশ্রয় নেন, যা সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। অথচ আইন ঋণগ্রহীতাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দিয়েছে—আদালতে হিসাব চ্যালেঞ্জ করা, সুদের অসংগতি তুলে ধরা এবং সমঝোতার আবেদন করা এর মধ্যে অন্যতম।
ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বচ্ছতা। সুদের হিসাব, অতিরিক্ত চার্জ কিংবা বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রির প্রক্রিয়া—সবই আইন ও নীতিমালার মধ্যে থাকতে হবে। কোনো অনিয়ম বা অস্বাভাবিক মূল্যায়ন হলে তা আদালতের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা যায়। অর্থাৎ ব্যাংকের দাবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চূড়ান্ত নয়; সেটি বিচারিক পর্যালোচনার আওতাধীন।
একই সঙ্গে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—ঋণ মামলা এবং চেক ডিজঅনার মামলা এক নয়। অনেক সময় ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে দেওয়া চেক প্রত্যাখ্যাত হলে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় পৃথক ফৌজদারি মামলা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে জামিন, সমন কিংবা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মতো বিষয়ও আসতে পারে। ফলে ঋণসংক্রান্ত সব জটিলতাকে এক দৃষ্টিতে দেখা ঠিক নয়।
অন্যদিকে, দেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির চাপে দুর্বল হয়েছে। বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে বছরের পর বছর তা পরিশোধ না করা, পুনঃতফসিলের অপব্যবহার এবং প্রভাব খাটিয়ে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি আর্থিক শৃঙ্খলাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এ ধরনের খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। কারণ শেষ পর্যন্ত এই অনিয়মের বোঝা বহন করে সাধারণ আমানতকারী ও রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি।
তবে কঠোরতার পাশাপাশি ভারসাম্যও অপরিহার্য। প্রকৃত আর্থিক সংকটে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং সমঝোতার কার্যকর সুযোগ থাকতে হবে। উন্নত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ আদায়ের পাশাপাশি ব্যবসা টিকিয়ে রাখার নীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায়, ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া কখনোই আতঙ্কের উৎস হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত আইনের শাসন, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের একটি স্বচ্ছ কাঠামো। রাষ্ট্র, ব্যাংক এবং বিচারব্যবস্থা—এই তিন পক্ষের দায়িত্ব হলো এমন একটি ভারসাম্য নিশ্চিত করা, যেখানে ব্যাংকের পাওনা যেমন সুরক্ষিত থাকবে, তেমনি ঋণগ্রহীতার অধিকারও রক্ষিত হবে।
লেখক: গবেষক, সাংবাদিক ও সংগঠক।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : মাসের শেষ দিকে সংসারের খরচ মেলাতে গিয়ে অনেক সরকারি কর্মচারীকেই হিমশিম খেতে হয়। বাড়িভাড়া, সন্তানদà§...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তায় প্রতিদিনের যানজট, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, বর্জ্যের স্তূপ আà...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : সকালে সংবাদ সংগ্রহে বের হন একজন সাংবাদিক। মানুষের কথা, সমাজের সংকট আর অনিয়ম-অসংগতি তুলে ধরাই তাঁর à¦...বিস্তারিত
মো. আরফান উদ্দীন : পৃথিবীর আর কোন দেশে বাংলাদেশের মতো প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় এত মানুষের প্রাণহানি ঘটে কি না, তা আমার...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : একটি গিটার কখনো কখনো শুধু বাদ্যযন্ত্র থাকে না—হয়ে ওঠে একটি সময়ের কণ্ঠস্বর। বাংলাদেশের ব্যান্ডস...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : রাতের নীরবতায় একটি মুঠোফোনের পর্দায় ভেসে উঠেছিল বাবার কাছে পাঠানো মেয়ের শেষ আকুতি। নিজের অবস্থান...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited