শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৬:৩৩ পিএম, ২০২৬-০৫-০২
চট্টগ্রাম মহানগরের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা আবারও জাতীয় আলোচনায় উঠে এসেছে। সংসদে এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুর্ভোগটি তার নজরে আসায় এর সমাধান নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে এক ধরনের আশা তৈরি হয়েছে। তবে সমস্যাটি ‘সাময়িক জলজট’ বলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম যে মন্তব্য করেছেন তা নিয়ে নগরের বাসিন্দাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, প্রতিদিনের ভোগান্তি হয়ে দাঁড়ানো এই জলাবদ্ধতা কোনো সাময়িক সমস্যা নয়, বরং বছরের পর বছর জমে থাকা এক স্থায়ী সংকট।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আশার আলো
গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, বিষয়টি তার নজরে এসেছে এবং দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিন চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান সংসদে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমস্যা সমাধানে সরকার গুরুত্বসহকারে কাজ করছে এবং চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করতে বলা হয়েছে। তিনি এ দুর্ভোগের জন্য দুঃখপ্রকাশও করেন।
নগরের বাসিন্দারা বলছেন, দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ায় তারা এখন কিছুটা আশাবাদী। পাঁচলাইশের বাসিন্দা মাসুদ আলম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নিজে বিষয়টি স্বীকার করেছেন, এটা আমাদের জন্য ইতিবাচক। অন্তত সমস্যাটা এখন অস্বীকার করা হচ্ছে না।’
অপপ্রচার দাবি প্রতিমন্ত্রীর
কিন্তু পরদিনই সংসদে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিয়ে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, চট্টগ্রামে ২২০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল, ফলে প্রবর্তনা মোড়সহ পাঁচটি জায়গায় জলজট তৈরি হয়েছিল, জলাবদ্ধতা নয়। তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে যৌথ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে সেই পানি নিষ্কাশন হয়েছে।
পুরোনো ছবি ব্যবহার করে অপপ্রচার চালানো হয়েছে দাবি করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জলাবদ্ধতার খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও কাল্পনিক। ২০২৪ সালের ছবি প্রচার করে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টির জন্য নগরবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করায় তারা খুবই খুশি হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী এর মাধ্যমে অত্যন্ত বড় মনের পরিচয় দিয়েছেন।
সাময়িক জলজট মন্তব্যে ক্ষোভ
একই দিন জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে যেভাবে পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে, বাস্তবে তেমন ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা যায়নি। হঠাৎ ৮০ থেকে ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে পানি নামতে কিছুটা সময় লাগাই স্বাভাবিক। এটিকে জলাবদ্ধতা না বলে সাময়িক জলজট বলা উচিত। প্রকৃত জলাবদ্ধতা তখনই বলা যায়, যখন তিন থেকে চারদিনেও পানি নেমে যায় না।
সফরে প্রতিমন্ত্রীর আরেকটি আলোচিত বক্তব্য ছিল, তিনি গাড়িতে পানি নিষ্কাশনের পাম্প নিয়ে ঘুরেছেন, কিন্তু কোথাও ব্যবহার করতে হয়নি। এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। প্রধানমন্ত্রী নিজে বিষয়টি স্বীকার করেছেন, এটা আমাদের জন্য ইতিবাচক। অন্তত সমস্যাটা এখন অস্বীকার করা হচ্ছে না।- পাঁচলাইশের বাসিন্দা মাসুদ আলম
প্রতিমন্ত্রীর এসব কথায় নগরবাসীর মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়েছে। প্রবর্তক এলাকার ব্যবসায়ী তানভির আহমেদ বলেন, ‘দোকান ডুবে লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হলো, মানুষ চিকিৎসা নিতে পারছে না। এটা যদি সাময়িক হয়, তাহলে স্থায়ী সমস্যাটা কেমন?’
একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরও অনেকেই। তাদের মতে, সমস্যাকে ছোট করে দেখলে সমাধানও দীর্ঘায়িত হবে। যে সমস্যা বছরজুড়ে থাকে, সেটিকে সাময়িক বলা মানে বাস্তবতা অস্বীকার করা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নগর পরিকল্পনাবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সমস্যাটা মৌসুমি, কিন্তু কারণগুলো স্থায়ী। তাই এটাকে সাময়িক বলে দায় এড়ানো যায় না। এখানে স্থায়ীভাবে খাল ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ন, নালাগুলোর অকার্যকারিতা ও অসমাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।
প্রকল্প বনাম বাস্তবতা: কোথায় ফাঁরাক
জলাবদ্ধতা নিরসনে নগরীর ৩৬টি খাল খননে মেগা প্রকল্প চলছে। তারপরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টরা কয়েকটি কারণ তুলে ধরছেন। যার মধ্যে আছে- খাল খনন হলেও অনেক জায়গায় এর সঙ্গে নালার সংযোগ নেই। খালগুলো দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ সবাই আলাদাভাবে কাজ করছে। কর্ণফুলী নদীতে জোয়ারের সময় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়। প্রকল্পের সময়সীমা বারবার বাড়ানো হচ্ছে।
নগরের বাসিন্দারা বলছেন, উন্নয়নকাজের প্রভাব তারা চোখে দেখছেন না। বরং অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। প্রবর্তকের ব্যবসায়ী তানভির আহমেদ বলেন, ‘প্রকল্পের কথা অনেক শুনেছি। কিন্তু বৃষ্টি হলেই দোকান ডুবে যায়। এতে বোঝা যায়, কাজের ফল এখনো মাঠে আসেনি।’
একই এলাকার বাসিন্দা সনজিত দে বলেন, ‘রাস্তা আর ড্রেন আলাদা করা যায় না। পানি এত বেশি থাকে যে হাঁটতে গিয়ে পড়ে যেতে হয়।’
মেয়রের অবস্থান: সমস্যা সমাধানে সমন্বয় দরকার
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এই জলাবদ্ধতাকে দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছেন, একদিনে এর সমাধান সম্ভব নয়। এটি নিয়ে একে অপরকে দোষারোপ করলে হবে না। সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘নগরের নালাব্যবস্থা অনেক পুরোনো এবং অপ্রতুল। আমরা নিয়মিত নালা-নর্দমা পরিষ্কার করছি, খাল খনন করছি। কিন্তু চলমান বড় প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ না হলে পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাবে না।’
সিডিএ জানাচ্ছে: খাল উন্নয়ন হলেই পরিবর্তন
সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতায় নগরবাসীর ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম। তিনি জানিয়েছেন, খালের উন্নয়নকাজ চলমান থাকায় কিছুটা দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে। তবে কাজ শেষ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তিনি বলেন, ‘অপারেশনের সময় যেমন কিছু রক্তপাত হয়, তেমনি উন্নয়নকাজ করতে গিয়ে মানুষের অনেক কষ্ট পোহাতে হয়েছে। এই ভোগান্তির জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি এবং মানুষের সমালোচনা গ্রহণ করছি।’ সিডিএ জানিয়েছে, খালে পানি প্রবাহের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। এতে জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যেসব এলাকায় খাল খনন চলছে, সেখানে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। কারণ, খননকাজ চলাকালে মাটি ফেলে রাখা, অস্থায়ী বাঁধ ও অসম্পূর্ণ নালার সংযোগ পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে।
সেনাবাহিনীর পর্যবেক্ষণ: সমন্বয়হীনতাই বড় বাধা
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড। খালের সব অস্থায়ী বাঁধ অপসারণ করে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের পরিচালক লেফটেন্যান্ট মো. মহসিনুল হক চৌধুরী। নগরের নালাব্যবস্থা অনেক পুরোনো এবং অপ্রতুল। আমরা নিয়মিত নালা-নর্দমা পরিষ্কার করছি, খাল খনন করছি। কিন্তু চলমান বড় প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ না হলে পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাবে না।- সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। লেফটেন্যান্ট মহসিন জানান, খালের দুপাশে রিটেইনিং ওয়াল (ঠেস দেয়াল) নির্মাণের জন্য অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে পানি শুকিয়ে কাজ করতে হয়েছে। এই বাঁধ এবং গত কয়েকদিনের অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে প্রবর্তক মোড়সহ কয়েকটি পয়েন্টে পানি জমে গিয়েছিল। তিনি বলেন, নগরীর মোট ৫৭টি খালের মধ্যে ৩৬টি খাল সংশ্লিষ্ট মেগা প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। ড্রেনেজ মডেলিং অনুযায়ী ৩৬টি খালের কাজ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো পুরোপুরি জলাবদ্ধতামুক্ত হবে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে কমিটি গঠন
চট্টগ্রাম মহানগরের খাল ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সারা বছর সচল রাখতে এবং বিভিন্ন উন্নয়ন ও সেবামূলক কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে ১৯ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন। সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। এ বিষয়ে জারি করা এক অফিস আদেশে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মহানগরের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করতেই এ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : চট্টগ্রামের কিশোরী সুপর্বা সুধা বিশ্বাস। ১৩ বছর বয়সী অষ্টম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর ঝুলিতে ইতোমধ্...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : বাংলাদেশ এডিটরস্ ফোরাম গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে যে, সম্প্রতি চট্টগ্রামের একটি দৈনিক পত্রি...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : নোবিপ্রবি প্রতিনিধি : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি ও শহীদদের স্মরণে বাংলাদেশ ইসলাম...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু পুরুষের শাস্তির বিধান কেন অবৈধ নয়, তা জানতে ...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর বিচার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এগোচ্...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষা প্রতি...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited