বাংলাদেশ   শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬  

শিরোনাম

নগর ব্যবস্থার ভাঙন: ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার ও রাষ্ট্রীয় অচলাবস্থা

আমাদের বাংলা ডেস্ক :    |    ০৩:৪৪ পিএম, ২০২৬-০৫-১৪

নগর ব্যবস্থার ভাঙন: ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার ও রাষ্ট্রীয় অচলাবস্থা

আবদুল্লাহ মজুমদার :
বাংলাদেশের শহর ও উপশহরের রাস্তায় এখন এক নতুন বাস্তবতার দৃশ্য স্পষ্ট—ব্যাটারিচালিত রিকশার নীরব গুঞ্জন আর অটোরিকশার অবিরাম চলাচল। একসময় যেগুলো ছিল বিকল্প পরিবহন, আজ সেগুলোই হয়ে উঠেছে দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই বিস্তারের আড়ালে লুকিয়ে আছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নগর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর এক জটিল সমীকরণ। সহজ চলাচলের এই বাহনগুলো একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলছে—আমাদের শহর কি প্রস্তুত ছিল এই পরিবর্তনের জন্য?
 ব্যাটারিচালিত রিকশা কেন দ্রুত বাড়ছে : 
ব্যাটারিচালিত রিকশা দ্রুত বিস্তার লাভ করার পেছনে রয়েছে গভীর কিছু অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা। স্বল্প পুঁজিতে এটি চালু করা যায় এবং দৈনিক নগদ আয় নিশ্চিত হওয়ায় নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য এটি দ্রুত আয়ের একটি সহজ পথ হয়ে উঠেছে।
এর পাশাপাশি জ্বালানি খরচ প্রায় নেই বললেই চলে—বিদ্যুৎ-নির্ভর এই যানবাহন পরিচালনায় ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে আয় ও ব্যয়ের অনুপাত একে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
নগর কাঠামোর ঘাটতিও এর বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে। গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা এবং “শেষ গন্তব্যে পৌঁছানোর” কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এই যানগুলো স্বাভাবিকভাবেই সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে। সহজ চালনা ব্যবস্থা এবং কম দক্ষতার প্রয়োজনীয়তাও এর জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে।
 সরকার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না কেন: 
এই খাতটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার বাইরে থেকে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করেছে। ফলে এটি এখন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির মাঝখানে অবস্থান করছে।
লাখো মানুষের জীবিকা এই খাতের সঙ্গে যুক্ত থাকায় হঠাৎ কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে অসংখ্য ছোট ও বিচ্ছিন্ন উৎপাদন ও পরিচালনা কাঠামো একক নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে।
আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো বিকল্প গণপরিবহন ব্যবস্থা এখনো পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে এই খাতকে হঠাৎ সরিয়ে দিলে পরিবহন সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
 ব্যাটারি রিকশা ও অটোরিকশার পার্থক্য: 
ব্যাটারিচালিত রিকশা মূলত বিদ্যুৎচালিত, স্বল্পগতির এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অননুমোদিতভাবে পরিচালিত একটি অনানুষ্ঠানিক পরিবহন ব্যবস্থা। এটি শহরের অলিগলি ও স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে, অটোরিকশা (CNG চালিত) তুলনামূলকভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন। এটি নির্দিষ্ট রুট, লাইসেন্স এবং জ্বালানি ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হওয়ায় পরিবহন ব্যবস্থার একটি কাঠামোবদ্ধ অংশ হিসেবে বিবেচিত।
এই দুইয়ের মৌলিক পার্থক্য তাই প্রযুক্তিগত নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ও নীতিগত কাঠামোর মধ্যে নিহিত।
 রাষ্ট্র ও জনগণের ওপর প্রভাব: 
রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রাজস্ব ক্ষতি। বিপুল সংখ্যক ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিবন্ধনবিহীন হওয়ায় সরকার কর ও ফি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা অপ্রতুল হয়ে পড়ছে এবং নগর পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে, জনগণের ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো আরও সরাসরি। যানজট বৃদ্ধি, দুর্ঘটনার ঝুঁকি, যাত্রী নিরাপত্তার ঘাটতি এবং পরিবেশ দূষণ নগর জীবনের মানকে প্রভাবিত করছে। অনিয়ন্ত্রিত চালনা ব্যবস্থা এই সমস্যাকে আরও গভীর করছে।
 নীতিগত সমাধান: নিষেধ নয়, নিয়ন্ত্রণ: 
এই খাতকে হঠাৎ নিষিদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং প্রয়োজন ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রিত রূপান্তর।
প্রথমত, সব যানবাহনকে বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের আওতায় এনে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য নির্দিষ্ট চলাচল জোন নির্ধারণ করে প্রধান সড়কে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, চালকদের জন্য লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
চতুর্থত, ব্যাটারি ও যানবাহনের প্রযুক্তিগত মান ও নিরাপত্তা কাঠামো নির্ধারণ জরুরি।
পঞ্চমত, অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
সবশেষে, গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত না করলে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা এখন আর কেবল পরিবহন মাধ্যম নয়; এটি বাংলাদেশের নগর জীবনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে এটি সাধারণ মানুষের জীবিকার সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে নগর ব্যবস্থাপনায় সৃষ্টি করেছে নতুন চাপ ও চ্যালেঞ্জ। তাই সমাধান কোনো আকস্মিক নিষেধাজ্ঞায় নয়, বরং সুপরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ, ধাপে ধাপে বৈধকরণ এবং বিকল্প গণপরিবহন শক্তিশালী করার মধ্যেই নিহিত। শহরের গতিশীলতা রক্ষা করতে হলে এই অনিয়ন্ত্রিত বাস্তবতাকে অস্বীকার নয়, বরং কাঠামোর ভেতরে এনে পরিচালিত করাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
লেখক: নন্দিত সংগঠক ও সাহিত্যিক।

রিটেলেড নিউজ

ম্যান্ডেলার শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক অনিবার্য পাঠ

ম্যান্ডেলার শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক অনিবার্য পাঠ

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র ব...বিস্তারিত


সশস্ত্র বাহিনীতে দুই দশকের নীরব অবিচার

সশস্ত্র বাহিনীতে দুই দশকের নীরব অবিচার

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে একটি নীরব যন্ত্...বিস্তারিত


বাংলাদেশের জন্য সুবর্ণ সুযোগ

বাংলাদেশের জন্য সুবর্ণ সুযোগ

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মেজর (অব.) মনজুর কাদের সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘চীনকে ঘুমাতে দাও; যখন সে জেগে উঠবে, সে বিশ্বকে কা...বিস্তারিত


বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন কৌশল

বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন কৌশল

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কাজী আব্দুল্লাহ আল বোরহান রিজভী বাংলাদেশ গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং সামাজ...বিস্তারিত


মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ! বিবেকের মৃত্যু হলে সভ্যতা শুধু নামেই টিকে থাকে

মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ! বিবেকের মৃত্যু হলে সভ্যতা শুধু নামেই টিকে থাকে

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্ত...বিস্তারিত


চাঁদাবাজি ও বেকারত্বের ছায়ায় রাষ্ট্রের নীতিগত চ্যালেঞ্জ

চাঁদাবাজি ও বেকারত্বের ছায়ায় রাষ্ট্রের নীতিগত চ্যালেঞ্জ

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার : শহরের ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়ানো ক্ষুদ্র দোকানি, গ্রামের হতাশ তরুণ কিংবা চাকরির আশায়...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

নোয়াখালী প্রতিনিধি : : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্তার অ...বিস্তারিত


সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : সৌদি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, স্পীড লিমিট এর চাইতে অধিক গতিতে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের উপ...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর