বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬  

শিরোনাম

মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ! বিবেকের মৃত্যু হলে সভ্যতা শুধু নামেই টিকে থাকে

আমাদের বাংলা ডেস্ক :    |    ০৪:৩২ পিএম, ২০২৬-০৭-০৭

মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ! বিবেকের মৃত্যু হলে সভ্যতা শুধু নামেই টিকে থাকে

জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু মানুষ হওয়ার গুণ যেন ক্রমেই কমে যাচ্ছে। চারদিকে অসংখ্য মুখ, অসংখ্য পরিচয়, অসংখ্য সম্পর্ক—তবুও কোথাও যেন মানবিকতার গভীর সংকট। তাই আজ অনেকের কণ্ঠে একটি দীর্ঘশ্বাস—"মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ!"

তবে প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি সব মানুষ অমানুষ হয়ে গেছে? নাকি কিছু অমানবিক ঘটনা আমাদের সমাজ সম্পর্কে এমন হতাশার জন্ম দিচ্ছে?

প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে একের পর এক নির্মমতার চিত্র। কোথাও গণপিটুনিতে সন্দেহভাজন একজন মানুষ বিচার পাওয়ার আগেই প্রাণ হারাচ্ছেন। কোথাও কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতায় ঝরে যাচ্ছে তরুণ প্রাণ। কোথাও নারী ও শিশুর ওপর পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। কোথাও বৃদ্ধ বাবা-মাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা হচ্ছে, আবার কোথাও সামান্য লাভের আশায় প্রতারণা ও দুর্নীতির মাধ্যমে মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে মানুষকে হেয় করা, চরিত্রহনন করা কিংবা দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার আগে ভিডিও ধারণের প্রতিযোগিতা—এসব দৃশ্য আমাদের বিবেককে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে হৃদয়কে কঠিনও করে তুলেছে। মানুষের কষ্ট আজ অনেকের কাছে সহমর্মিতার বিষয় নয়; বরং তা পরিণত হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের উপকরণে। একজন অসহায় মানুষ সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে থাকেন, অথচ অনেকেই সেই মুহূর্তটি মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করতে বেশি আগ্রহী। এই প্রবণতা শুধু অনৈতিক নয়, এটি আমাদের মানবিক অবক্ষয়েরও স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।

দুর্নীতিও অমানবিকতার এক নীরব রূপ। জনগণের অর্থ আত্মসাৎ মানে শুধু রাষ্ট্রের ক্ষতি নয়; এটি একজন রোগীর চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়া, একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার সুযোগ হারানো কিংবা একজন দরিদ্র মানুষের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেওয়া। ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, অনিয়ম ও বৈষম্য সমাজে অবিশ্বাসের সংস্কৃতি তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত মানবিক সম্পর্ককেও দুর্বল করে দেয়।

তবে অন্ধকারই শেষ কথা নয়। এখনও এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যের জীবন বাঁচান। বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা কিংবা যেকোনো দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং সাধারণ মানুষ নীরবে মানবতার সেবায় এগিয়ে আসেন। তারা প্রচারের আলোয় না থাকলেও তাদের মানবিকতা সমাজকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে।

সাংবাদিক হিসেবে মাঠে কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, একটি সমাজকে ধ্বংস করে শুধু বড় বড় অপরাধ নয়; ছোট ছোট অমানবিক আচরণও। লাইনে দাঁড়িয়ে অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া, দুর্বল মানুষকে অপমান করা, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, অসহায় মানুষের আর্তনাদ উপেক্ষা করা কিংবা নিজের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো—এসবও অমানুষ হওয়ার লক্ষণ।

মানুষ হওয়া শুধু জন্মগত পরিচয় নয়; এটি বিবেক, সততা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা এবং ন্যায়বোধের সমন্বয়। অর্থ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক অবস্থান কাউকে বড় মানুষ বানায় না। একজন রিকশাচালকও মানবিকতায় মহৎ হতে পারেন, আবার কোটি টাকার মালিকও বিবেকহীন হতে পারেন।

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। আমরা কি অন্যের কষ্ট অনুভব করতে শিখছি? আমরা কি সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পারছি? আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু ডাক্তার, প্রকৌশলী বা কর্মকর্তা হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছি, নাকি একজন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিচ্ছি?

আইন অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু একজন মানুষকে মানবিক করে তুলতে পারে না। সেই কাজটি করতে পারে পরিবার, শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন এবং সামাজিক সংস্কৃতি। তাই মানবিক সমাজ গঠনে রাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে।

অন্যায়ের প্রতিবাদ, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সত্যকে সমর্থন করা এবং নিজের বিবেককে জাগ্রত রাখা—এসবই একজন প্রকৃত মানুষের পরিচয়। সমাজ পরিবর্তনের সূচনা অন্য কারও মাধ্যমে নয়; শুরু হতে হবে নিজের ভেতর থেকেই।

তাই "মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ"—এই বাক্যটি যেন চূড়ান্ত রায় না হয়ে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার আয়না হয়ে ওঠে। কারণ একটি সভ্যতার পতন শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ অন্যের কান্নায় আর কাঁদে না, অন্যের কষ্টে আর ব্যথিত হয় না।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে মানুষ পরিচয়ে নয়, মানবিকতায় বড় হবে; যেখানে ক্ষমতার চেয়ে বিবেকের মূল্য বেশি হবে; যেখানে একজন বিপদগ্রস্ত মানুষ ক্যামেরার সামনে নয়, মানুষের হাতেই আশ্রয় খুঁজে পাবে। কারণ পৃথিবী আজও টিকে আছে সেইসব মানুষের জন্য, যারা নিঃস্বার্থভাবে অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে জানেন। আর সেই মানুষগুলোর কারণেই এখনও বিশ্বাস করা যায়—মানবতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

রিটেলেড নিউজ

ম্যান্ডেলার শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক অনিবার্য পাঠ

ম্যান্ডেলার শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক অনিবার্য পাঠ

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র ব...বিস্তারিত


সশস্ত্র বাহিনীতে দুই দশকের নীরব অবিচার

সশস্ত্র বাহিনীতে দুই দশকের নীরব অবিচার

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে একটি নীরব যন্ত্...বিস্তারিত


বাংলাদেশের জন্য সুবর্ণ সুযোগ

বাংলাদেশের জন্য সুবর্ণ সুযোগ

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মেজর (অব.) মনজুর কাদের সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘চীনকে ঘুমাতে দাও; যখন সে জেগে উঠবে, সে বিশ্বকে কা...বিস্তারিত


বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন কৌশল

বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন কৌশল

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কাজী আব্দুল্লাহ আল বোরহান রিজভী বাংলাদেশ গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং সামাজ...বিস্তারিত


চাঁদাবাজি ও বেকারত্বের ছায়ায় রাষ্ট্রের নীতিগত চ্যালেঞ্জ

চাঁদাবাজি ও বেকারত্বের ছায়ায় রাষ্ট্রের নীতিগত চ্যালেঞ্জ

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার : শহরের ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়ানো ক্ষুদ্র দোকানি, গ্রামের হতাশ তরুণ কিংবা চাকরির আশায়...বিস্তারিত


ইটভাটা, পরিবেশ ও জীবিকার দ্বন্দ্ব

ইটভাটা, পরিবেশ ও জীবিকার দ্বন্দ্ব

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : ড. রাধেশ্যাম সরকার     বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারায় নির্মাণখাত একটি অপরিহার্য বাস্তবতা। শহর থ...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

নোয়াখালী প্রতিনিধি : : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্তার অ...বিস্তারিত


সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : সৌদি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, স্পীড লিমিট এর চাইতে অধিক গতিতে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের উপ...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর