বাংলাদেশ   শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬  

শিরোনাম

ম্যান্ডেলার শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক অনিবার্য পাঠ

আবদুল্লাহ মজুমদার :    |    ০৪:৪৭ পিএম, ২০২৬-০৭-১৮

ম্যান্ডেলার শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক অনিবার্য পাঠ

ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে শেখান। নেলসন ম্যান্ডেলা সেই বিরল রাষ্ট্রনায়কদের একজন। তাঁর নাম উচ্চারিত হয় শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা হিসেবে নয়, বরং ন্যায়বিচার, মানবমর্যাদা, সহিষ্ণুতা ও ক্ষমাশীলতার বিশ্বজনীন প্রতীক হিসেবে। দীর্ঘ ২৭ বছরের কারাবাস, সীমাহীন নির্যাতন এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের পরও তিনি প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি; বেছে নিয়েছিলেন পুনর্মিলন, সংলাপ ও জাতীয় ঐক্যের পথ। আজ যখন বিশ্বজুড়ে সংঘাত, বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার রাজনীতি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তখন ১৮ জুলাই পালিত আন্তর্জাতিক নেলসন ম্যান্ডেলা দিবস আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে—ক্ষমতার রাজনীতি কি বিভেদের জন্য, নাকি মানুষের জন্য?

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বা অ্যাপারথাইড ছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম নিষ্ঠুর বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। গায়ের রঙের ভিত্তিতে মানুষের অধিকার নির্ধারণ করা হতো, সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে নিজ দেশেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়েই ম্যান্ডেলাকে ২৭ বছর কারাগারে বন্দি থাকতে হয়। কিন্তু কারামুক্তির পর তিনি প্রতিহিংসাকে রাষ্ট্রনীতিতে পরিণত করেননি। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, প্রতিশোধ সাময়িক তৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না। রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন ন্যায়বিচার, আস্থা ও পুনর্মিলনের রাজনীতি।

এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞাই ম্যান্ডেলাকে সাধারণ নেতাদের কাতার থেকে আলাদা করেছে। ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেননি; বরং বিভক্ত জাতিকে এক সুতোয় গাঁথার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। 'ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন'-এর মাধ্যমে অতীতের অপরাধকে আড়াল না করে সত্য উদ্‌ঘাটন এবং প্রতিহিংসার পরিবর্তে পুনর্মিলনের যে পথ তিনি অনুসরণ করেছিলেন, তা আজও সংঘাত-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক অনন্য মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০০৯ সালে জাতিসংঘ ১৮ জুলাইকে আন্তর্জাতিক নেলসন ম্যান্ডেলা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এই দিবসের মূল তাৎপর্য কোনো ব্যক্তিকে মহিমান্বিত করা নয়; বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি প্রত্যেক নাগরিকের দায়বদ্ধতার চেতনাকে জাগিয়ে তোলা। সে কারণেই বিশ্ববাসীকে অন্তত ৬৭ মিনিট জনকল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়, যা জনসেবায় ম্যান্ডেলার ৬৭ বছরের অবদানের প্রতীক।

আজকের বিশ্বে যুদ্ধ, বর্ণবাদ, ধর্মীয় উগ্রবাদ, রাজনৈতিক মেরুকরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, শরণার্থী সংকট এবং অসহিষ্ণুতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু সমাজকে সব সময় সহনশীল করতে পারেনি। বরং বিভ্রান্তিকর তথ্য, ঘৃণার ভাষা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণা বহু দেশে বিভাজনকে আরও তীব্র করছে। এমন বাস্তবতায় ম্যান্ডেলার দর্শন নতুন করে গুরুত্ব পায়। তিনি দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি সামরিক ক্ষমতায় নয়; শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, নৈতিক নেতৃত্ব এবং জনগণের আস্থায় নিহিত।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাও এই আলোচনার বাইরে নয়। স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়েও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পারস্পরিক অবিশ্বাস, তীব্র মেরুকরণ এবং সংলাপের ঘাটতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ভিন্নমতকে প্রতিপক্ষ নয়, শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা গণতান্ত্রিক চর্চাকে দুর্বল করে। অথচ গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো মতের ভিন্নতা; সেই ভিন্নতাকে সাংবিধানিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে ধারণ করার সক্ষমতাই একটি পরিণত রাষ্ট্রের পরিচয়। ম্যান্ডেলা দেখিয়েছেন, নেতৃত্বের সার্থকতা প্রতিপক্ষকে দমন করার মধ্যে নয়; বরং মতভেদকে সংলাপে রূপ দেওয়া এবং জাতীয় স্বার্থে সবাইকে একই টেবিলে বসানোর মধ্যেই প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কত্ব নিহিত।

অবশ্য ম্যান্ডেলার শিক্ষা কেবল রাজনীতিবিদদের জন্য নয়। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ—সব ক্ষেত্রেই ন্যায়, জবাবদিহি, সহিষ্ণুতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা সমানভাবে জরুরি। কারণ গণতন্ত্র কেবল ভোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি সংস্কৃতি, যেখানে আইনের শাসন, মানবাধিকার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং জবাবদিহি একে অপরের পরিপূরক।

ম্যান্ডেলার বহুল উদ্ধৃত একটি উক্তি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক—"কেউ জন্মগতভাবে অন্য মানুষকে ঘৃণা করতে শেখে না; মানুষকে যেমন ঘৃণা শেখানো যায়, তেমনি ভালোবাসাও শেখানো যায়।" এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি সভ্য সমাজ নির্মাণের দর্শন। ঘৃণা শেখানো যায়, আবার সহমর্মিতাও শেখানো যায়। কোন পথটি বেছে নেওয়া হবে, সেটিই শেষ পর্যন্ত একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।

নেলসন ম্যান্ডেলাকে স্মরণ করার অর্থ তাঁর প্রতিকৃতিতে ফুল দেওয়া নয়; তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা ও মানবিক দর্শনকে জনজীবনে প্রতিষ্ঠা করা। আজ যখন ক্ষমতার প্রতিযোগিতা প্রায়ই নীতি ও মূল্যবোধকে আড়াল করে ফেলে, তখন ম্যান্ডেলার জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—টেকসই বিজয় প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার মধ্যে নয়, মানুষের আস্থা অর্জনের মধ্যে; শক্তিশালী রাষ্ট্র ভয় দিয়ে নয়, বিশ্বাস দিয়ে গড়ে ওঠে; আর ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাবানদের নয়, মানবতাবানদেরই মনে রাখে। আন্তর্জাতিক নেলসন ম্যান্ডেলা দিবস তাই কেবল একটি স্মারক দিবস নয়; এটি আত্মসমালোচনার, রাজনৈতিক সংস্কৃতি পুনর্বিবেচনার এবং মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণের এক গভীর আহ্বান। বাংলাদেশের রাজনীতি যদি সহিষ্ণুতা, সংলাপ, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও পুনর্মিলনের এই দর্শন থেকে শিক্ষা নিতে পারে, তবে সেটিই হবে নেলসন ম্যান্ডেলার প্রতি সবচেয়ে অর্থবহ শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক: সভাপতি, সেভ দ্য রিভার্স বাংলাদেশ সোসাইটি  চট্টগ্রাম।

রিটেলেড নিউজ

সশস্ত্র বাহিনীতে দুই দশকের নীরব অবিচার

সশস্ত্র বাহিনীতে দুই দশকের নীরব অবিচার

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে একটি নীরব যন্ত্...বিস্তারিত


বাংলাদেশের জন্য সুবর্ণ সুযোগ

বাংলাদেশের জন্য সুবর্ণ সুযোগ

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মেজর (অব.) মনজুর কাদের সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘চীনকে ঘুমাতে দাও; যখন সে জেগে উঠবে, সে বিশ্বকে কা...বিস্তারিত


বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন কৌশল

বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন কৌশল

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কাজী আব্দুল্লাহ আল বোরহান রিজভী বাংলাদেশ গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং সামাজ...বিস্তারিত


মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ! বিবেকের মৃত্যু হলে সভ্যতা শুধু নামেই টিকে থাকে

মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ! বিবেকের মৃত্যু হলে সভ্যতা শুধু নামেই টিকে থাকে

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্ত...বিস্তারিত


চাঁদাবাজি ও বেকারত্বের ছায়ায় রাষ্ট্রের নীতিগত চ্যালেঞ্জ

চাঁদাবাজি ও বেকারত্বের ছায়ায় রাষ্ট্রের নীতিগত চ্যালেঞ্জ

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার : শহরের ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়ানো ক্ষুদ্র দোকানি, গ্রামের হতাশ তরুণ কিংবা চাকরির আশায়...বিস্তারিত


ইটভাটা, পরিবেশ ও জীবিকার দ্বন্দ্ব

ইটভাটা, পরিবেশ ও জীবিকার দ্বন্দ্ব

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : ড. রাধেশ্যাম সরকার     বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারায় নির্মাণখাত একটি অপরিহার্য বাস্তবতা। শহর থ...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

নোয়াখালী প্রতিনিধি : : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্তার অ...বিস্তারিত


সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : সৌদি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, স্পীড লিমিট এর চাইতে অধিক গতিতে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের উপ...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর