বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬  

শিরোনাম

হিজড়া জনগোষ্ঠী: সামাজিক বৈষম্য, চাঁদাবাজির বিতর্ক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের সম্ভাবনা

আবদুল্লাহ মজুমদার :    |    ০২:৩৯ পিএম, ২০২৬-০৬-০৯

হিজড়া জনগোষ্ঠী: সামাজিক বৈষম্য, চাঁদাবাজির বিতর্ক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের সম্ভাবনা

শহরের ব্যস্ত মোড়, ট্রাফিক সিগন্যালের লালবাতি, বাজারের ভিড় কিংবা কোনো নবজাতকের আগমনে আনন্দঘন পরিবেশ—এসব জায়গায় হিজড়া সম্প্রদায়ের উপস্থিতি এখন আমাদের পরিচিত এক সামাজিক বাস্তবতা। কেউ তাদের দেখে কৌতূহলী হন, কেউ অস্বস্তি বোধ করেন, কেউ আবার এড়িয়ে চলেন। অথচ এই দৃশ্যমান উপস্থিতির আড়ালে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ বঞ্চনা, পরিচয়ের সংকট এবং বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রামের এক নীরব ইতিহাস। সমাজের মূলধারা থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া এই মানুষগুলোর জীবন কেবল সহানুভূতির বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে হিজড়া জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নতুন কোনো বিষয় নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা উপমহাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের অংশ হিসেবে বিদ্যমান। মুঘল আমলসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক সময়ে তাদের নির্দিষ্ট সামাজিক ভূমিকা ছিল। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা মূলধারার সমাজ থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রান্তিক অবস্থানে চলে যায়। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় “তৃতীয় লিঙ্গ” হিসেবে আইনি স্বীকৃতি তাদের পরিচয়ের নতুন দিগন্ত খুলে দিলেও সামাজিক বাস্তবতায় তাদের অবস্থান এখনো অনেকাংশে দুর্বল, অনিশ্চিত এবং বৈষম্যপূর্ণ।

“হিজড়া” ও “তৃতীয় লিঙ্গ” শব্দ দুটি প্রায়ই একই অর্থে ব্যবহৃত হলেও বাস্তবে এদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। “হিজড়া” মূলত দক্ষিণ এশিয়ার একটি ঐতিহ্যগত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়, যেখানে গোষ্ঠীগত জীবনধারা, নিজস্ব সামাজিক কাঠামো, গুরু-চেলা ব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক রীতিনীতি বিদ্যমান। অন্যদিকে “তৃতীয় লিঙ্গ” একটি বিস্তৃত আইনি ও সামাজিক ধারণা, যা নারী ও পুরুষের বাইরের লিঙ্গপরিচয়কে নির্দেশ করে। ফলে সব হিজড়া তৃতীয় লিঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন, কিন্তু সব তৃতীয় লিঙ্গ ব্যক্তি হিজড়া নন—এই বাস্তবতা অনেক সময় সমাজে ভুল বোঝাবুঝি ও বিভ্রান্তির জন্ম দেয়।

বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সঠিক সংখ্যা নিয়ে এখনো নির্ভুল জাতীয় পরিসংখ্যান নেই। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ধারণা অনুযায়ী এ সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার বা তারও বেশি হতে পারে। সামাজিক ভয়, পারিবারিক চাপ, পরিচয় গোপন রাখা এবং বৈষম্যের আশঙ্কা অনেককে পরিসংখ্যানের বাইরে রাখে। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী শহরগুলোতে তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়, কারণ সেখানে কর্মসংস্থান, গোষ্ঠীগত বসবাস এবং কিছু সামাজিক সহায়তার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি বিদ্যমান।

এই জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরেও রয়েছে বহুমাত্রিক বৈচিত্র্য। কেউ জন্মগতভাবে ইন্টারসেক্স, কেউ জন্মসূত্রে পুরুষ হলেও নারীসত্তা অনুভব করেন, আবার কেউ সামাজিক ও মানসিকভাবে তৃতীয় লিঙ্গ পরিচয় গ্রহণ করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টিকে মানবিক বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে দেখা হলেও সামাজিক মানসিকতা এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রথাগত ধারণা ও কুসংস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতার কারণে তাদের জীবনে তৈরি হয় দীর্ঘস্থায়ী প্রান্তিকতা। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, কর্মসংস্থানের সংকট, বাসস্থান সমস্যা এবং সামাজিক অবজ্ঞা তাদের নিত্যসঙ্গী। অনেকেই জীবিকার জন্য ভিক্ষাবৃত্তি, অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক আয় বা অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু হিজড়া ব্যক্তি শিক্ষা, অনলাইন ব্যবসা, বিউটি ও ফ্যাশন, মিডিয়া, সেলাই-দর্জির কাজ এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছেন, যা পরিবর্তনের একটি ধীর কিন্তু ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।

সাম্প্রতিক সামাজিক বাস্তবতা ও বিতর্ক
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু এলাকায় হিজড়া জনগোষ্ঠীর একটি অংশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অতিরিক্ত অর্থ আদায় বা জনসমাগমস্থলে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। অনেক স্থানে দেখা যায়, সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে তারা বিভিন্ন দোকান, অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অর্থ সংগ্রহ করেন। পাশাপাশি বিয়ে, সন্তান জন্ম, নতুন ব্যবসা শুরু কিংবা বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উপলক্ষে অর্থ প্রদানের একটি অনানুষ্ঠানিক সংস্কৃতিও কিছু এলাকায় গড়ে উঠেছে।

তবে এই বাস্তবতাকে পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর আরোপ করা ন্যায়সংগত নয়। এটি মূলত কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আচরণ, যা দীর্ঘদিনের সামাজিক প্রান্তিকতা, অর্থনৈতিক সংকট, কর্মসংস্থানের অভাব এবং কাঠামোগত বৈষম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই সমাধান কেবল আইনগত কঠোরতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং পুনর্বাসন, দক্ষতা উন্নয়ন, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূলধারার অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে তাদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করাও জরুরি।

স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও তারা নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। হরমোনজনিত জটিলতা, মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং বিষণ্নতা তাদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সহায়তা এবং নিরাপদ চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ সীমিত থাকে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবনেও তাদের বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। কেউ পরিবার গঠন করতে চান, কেউ সম্পর্কের মধ্যে থাকতে চান, আবার কেউ সামাজিক স্বীকৃতির প্রত্যাশায় থাকেন। কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও আইনি সীমাবদ্ধতা অনেক ক্ষেত্রে তাদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবুও তাদের মানবিক অনুভূতি, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা অন্য সবার মতোই বাস্তব ও স্বাভাবিক।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি সংবেদনশীল। ইসলামী ফিকহে ‘খুনসা’ বা জন্মগতভাবে অস্পষ্ট যৌন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। ইসলাম মানব মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও সহানুভূতির শিক্ষা দেয়, যেখানে জন্মগত অবস্থার কারণে কাউকে অপমান, অবজ্ঞা বা বঞ্চিত করা স্পষ্টভাবে নিরুৎসাহিত।

ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে হিজড়াদের “তৃতীয় লিঙ্গ” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর ফলে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, সরকারি ভাতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমে তাদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ধীরে ধীরে শিক্ষা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম, অনলাইন ব্যবসা, মিডিয়া ও বিভিন্ন সেবামূলক খাতে তাদের অংশগ্রহণও বাড়ছে।

কেবল আইন বা নীতিমালা প্রণয়ন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। মানবিক মর্যাদা কাগজে-কলমে স্বীকৃতির বিষয় নয়; এটি বাস্তব জীবনের আচরণ, সুযোগের সমতা এবং সামাজিক সম্মানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
একটি সমাজের সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তার প্রান্তিকতম মানুষের অবস্থান দিয়ে। যে সমাজ তার দুর্বল, অবহেলিত ও ভিন্ন পরিচয়ের মানুষকে সম্মান দিতে শেখে, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে মানবিক ও উন্নত সমাজে পরিণত হয়। হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠী কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়; তারা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই তাদের প্রতি মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীল আচরণের ভারসাম্যও রক্ষা করতে হবে। এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ নির্মাণের পথ সুগম করতে পারে।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক। 
সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।

রিটেলেড নিউজ

যেও ভালোবেসে

যেও ভালোবেসে

আমাদের বাংলা ডেস্ক : :   আলেয়া মান্নান   প্রিয়, তুমি একটি বার ভালোবেসে যেও।   ব্যস্ততার পরে একবার অবসর করে আসিও...বিস্তারিত


যখন রাজনীতির অস্ত্র ভাইরাল ভিডিয়ো

যখন রাজনীতির অস্ত্র ভাইরাল ভিডিয়ো

আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার  ডিজিটাল যুগে একটি ভিডিও কখনো কখনো হাজার বক্তৃতার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। কয়...বিস্তারিত


যেখানে রাত্রি লিখে সময়ের ইতিহাস সারাফ নাওয়ার -এর রাত্রির ভাটলিপি 

যেখানে রাত্রি লিখে সময়ের ইতিহাস সারাফ নাওয়ার -এর রাত্রির ভাটলিপি 

আবদুল্লাহ মজুমদার : : সমকালীন বাংলা কবিতায় এমন কিছু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যেগুলো কেবল কবিতার সংকলন নয়; বরং সময়, স...বিস্তারিত


ম্যান্ডেলার শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক অনিবার্য পাঠ

ম্যান্ডেলার শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক অনিবার্য পাঠ

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র ব...বিস্তারিত


একটি চাকরিতে আর সংসার চলে না: মূল্যস্ফীতি, কর্মসংকট ও নতুন দারিদ্র্যের অশনিসংকেত

একটি চাকরিতে আর সংসার চলে না: মূল্যস্ফীতি, কর্মসংকট ও নতুন দারিদ্র্যের অশনিসংকেত

আবদুল্লাহ মজুমদার : : একসময় একটি চাকরি মানেই ছিল একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, স্বস্তি ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। মাস ...বিস্তারিত


ত্রাণ বিতরণে নৈতিকতার প্রশ্ন

ত্রাণ বিতরণে নৈতিকতার প্রশ্ন

আবদুল্লাহ মজুমদার : : প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে যেমন প্রকাশ করে, তেমনি মানুষের মানবিকতা, রাষ্ট্...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

নোয়াখালী প্রতিনিধি : : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্তার অ...বিস্তারিত


সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : সৌদি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, স্পীড লিমিট এর চাইতে অধিক গতিতে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের উপ...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর