বাংলাদেশ   রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬  

শিরোনাম

একটি উপাধ্যক্ষ পদকে ঘিরে দেড় দশকের অনিশ্চয়তা: শেষ কোথায়?

আবদুল্লাহ মজুমদার :    |    ০২:৩০ পিএম, ২০২৬-০৬-০২

একটি উপাধ্যক্ষ পদকে ঘিরে দেড় দশকের অনিশ্চয়তা: শেষ কোথায়?

একটি উপাধ্যক্ষ পদ। একটি নিয়োগ। কয়েকটি তদন্ত। একাধিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা। আর তারপরও বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা অনিশ্চয়তা।
সাধারণভাবে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ কিংবা পদোন্নতির বিষয়টি নির্ধারিত প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু কখনো কখনো একটি একক পদকে ঘিরে এমন জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পেশাগত জীবনের নয়, বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তোলে। চট্টগ্রামের একটি কলেজের উপাধ্যক্ষ পদকে কেন্দ্র করে প্রায় দেড় দশক ধরে চলমান বিরোধ ও অনিশ্চয়তা সেই প্রশ্নগুলোকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিয়োগ, এমপিওভুক্তি, তদন্ত, আদালতের নির্দেশনা, সরকারিকরণ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দীর্ঘ ইতিহাস। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি একটি ব্যক্তিগত চাকরিগত বিরোধের সীমা অতিক্রম করে শিক্ষা প্রশাসনের কাঠামোগত দুর্বলতা, দীর্ঘসূত্রতা এবং জবাবদিহির সংকটের প্রতীক হয়ে উঠেছে বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্ট অনেকে।

এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সেলিমুজ্জামানের দাবি, তিনি যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন শেষে উপাধ্যক্ষ পদে যোগদান করলেও পরবর্তীতে নানা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তিনি আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হন।

ঘটনার সূত্রপাত ১৯৯৭ সালে। ওই বছরের ১ অক্টোবর তিনি চট্টগ্রামের ইমাম গাজ্জালী ডিগ্রি কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি এমপিওভুক্ত হন। প্রায় ১২ বছর তিনি সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০১০ সালের ৫ মে তিনি আশেকানে আউলিয়া ডিগ্রি কলেজে উপাধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন।

এরপর থেকেই শুরু হয় জটিলতার দীর্ঘ অধ্যায়। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নিয়োগ ও এমপিও-সংক্রান্ত নথি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণের পর নথি ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, ফাইল অনুপস্থিতি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক অসংগতি দেখা দেয়। একই সময়ে ঘুষ দাবির অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

পর্যায়ক্রমে বিষয়টি একাধিক তদন্ত কমিটির আওতায় আসে। তবে প্রতিটি তদন্তই ভিন্ন ভিন্ন মত ও ব্যাখ্যা প্রদান করে, যার ফলে কোনো একক ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এতে সমস্যার সমাধানের বদলে অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘায়িত হয়।

২০১১ ও ২০১২ সালের মধ্যে বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। গভর্নিং বডির পুনর্গঠন, তদন্ত কমিটির পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ভিন্নতার কারণে পুরো প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা দেখা দেয়।

সবচেয়ে বিতর্কিত পর্যায় হিসেবে ২০১২ সালের ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো পূর্ব নোটিশ বা যথাযথ কারণ দর্শানো ছাড়াই তাঁর উপাধ্যক্ষ পদ বাতিল করা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই সিদ্ধান্তে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ছিল এবং আইনি কাঠামো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।

পরবর্তীতে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। হাইকোর্টে রিট দায়েরের পর আদালত বিষয়টি পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দেন এবং পরবর্তী সময়ে নিয়োগ বাতিল-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের নির্দেশ আসে বলে জানা যায়। তবে এখানেই জটিলতার অবসান ঘটেনি। অভিযোগ রয়েছে, আদালতের নির্দেশনার পরও প্রশাসনিক পর্যায়ে বিষয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে নিষ্পত্তি হয়নি এবং দীর্ঘ সময় তিনি প্রশাসনিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন।

২০১৬ সালে সংশ্লিষ্ট কলেজটি সরকারিকরণ করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নাম সরকারিকরণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এতে করে বিষয়টি নতুন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। একই সঙ্গে একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে সুস্পষ্ট অনিয়ম প্রমাণিত না হলেও চূড়ান্ত সমাধান অনুপস্থিত থাকে।

পরবর্তী সময়ে আদালত আবারও প্রশাসনকে বিষয়টি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার পরও প্রশাসনিক পর্যায়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিষয়টি দীর্ঘায়িত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
সবশেষ ২০২৫ সালে একাধিক প্রশাসনিক পর্যালোচনা ও তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁর এমপিওভুক্তি ও পদ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করার সুপারিশ আসে। তবে বাস্তবায়নের পর্যায়ে অগ্রগতি না থাকায় বিষয়টি আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাস অতিক্রান্ত হলেও বিষয়টির দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।

এদিকে ২০২৬ সালের মে মাসে তিনি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন, যা দীর্ঘদিনের এই প্রশাসনিক জটিলতার সর্বশেষ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কলেজ প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দীর্ঘ সময় ধরে চলমান এই নীরবতা এবং অনিষ্পন্নতা নতুন করে কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।

প্রশ্ন হলো, একটি নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে যদি বছরের পর বছর তদন্ত, শুনানি, আদালতের নির্দেশনা এবং প্রশাসনিক পর্যালোচনার পরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত না হয়, তবে সেই দায় কার? ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান নাকি পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার?

এই ঘটনাকে ঘিরে মতভেদ থাকতে পারে, আইনি ব্যাখ্যারও ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—যে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নির্ভর করে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর। যখন একটি বিষয় দেড় দশক ধরে ঝুলে থাকে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু একজন ব্যক্তি নন; প্রশ্নবিদ্ধ হয় পুরো ব্যবস্থার দক্ষতা ও জবাবদিহি।

চট্টগ্রামের এই উপাধ্যক্ষ পদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু দেড় দশকের এই দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ইতোমধ্যে একটি বড় প্রশ্ন রেখে গেছে—ন্যায়সঙ্গত ও চূড়ান্ত প্রশাসনিক সমাধানের জন্য একজন নাগরিককে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?

লেখক: সভাপতি, সেভ দ্য রিভার্স বাংলাদেশ সোসাইটি, চট্টগ্রাম।

রিটেলেড নিউজ

চতুর্থবারের মতো খোলা হলো শাহজালাল মাজারের দানবাক্স, মিলল প্রায় ৮৯ লাখ টাকা

চতুর্থবারের মতো খোলা হলো শাহজালাল মাজারের দানবাক্স, মিলল প্রায় ৮৯ লাখ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেট প্রতিনিধি : সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের টাকা গণনা শেষে চতুর্থ দফায় পাওয়া গ...বিস্তারিত


কুড়িগ্রামে বিএনপির ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান

কুড়িগ্রামে বিএনপির ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের অংশ হিসেবে পরিষ্কার-পরিচ...বিস্তারিত


বাড়ছে পানি, ৫ জেলায় বন্যার শঙ্কা

বাড়ছে পানি, ৫ জেলায় বন্যার শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক : বৃষ্টিপাত বেড়ে নদ-নদীর পানি সতর্কসীমায় পৌঁছালে দেশের পাঁচ জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। শনি...বিস্তারিত


পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে : লাভের আশায় ১১টি ট্রেন ইজারা দেবে রেল

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে : লাভের আশায় ১১টি ট্রেন ইজারা দেবে রেল

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : রাজশাহী প্রতিনিধি : পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ১১টি ট্রেন ইজারা দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে চারটি ট্রেনের দর...বিস্তারিত


ড্রোনে অপরাধী, ক্যাম্পাসে ইয়াবা: নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পুলিশ

ড্রোনে অপরাধী, ক্যাম্পাসে ইয়াবা: নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক : পুলিশের একাংশের পুরোনো ও অচল যানবাহন, পুলিশের অবস্থান নজরদারিতে অপরাধীদের ড্রোনের ব্যবহার এবং মে...বিস্তারিত


বিরোধীদলের কারণেই কেউ কেউ ডিসেম্বরে আসতে চায় : পানিসম্পদ মন্ত্রী

বিরোধীদলের কারণেই কেউ কেউ ডিসেম্বরে আসতে চায় : পানিসম্পদ মন্ত্রী

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : প্রথমদিন থেকেই বিরোধীদল প্রতিমুহূর্তে সরকারি দলকে অসহযোগিতা করার কারণেই ...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

নোয়াখালী প্রতিনিধি : : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্তার অ...বিস্তারিত


সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : সৌদি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, স্পীড লিমিট এর চাইতে অধিক গতিতে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের উপ...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর