বাংলাদেশ   রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬  

শিরোনাম

চামড়ার বাজার: সংকট, সিন্ডিকেট ও সম্ভাবনার সমীকরণ

আবদুল্লাহ মজুমদার :    |    ০৫:১৬ পিএম, ২০২৬-০৫-৩১

চামড়ার বাজার: সংকট, সিন্ডিকেট ও সম্ভাবনার সমীকরণ

ঈদের সকাল গড়িয়ে দুপুর নামতেই দেশের অলিগলি, গ্রামের উঠোন আর শহরের মোড়ে মোড়ে জমতে থাকে কোরবানির পশুর চামড়া। কোথাও যত্নে লবণ মাখিয়ে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, আবার কোথাও অব্যবস্থাপনা ও অসচেতনতার কারণে দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান এই সম্পদ। অথচ এই চামড়াই কিছুদিন পর কারিগরের হাতে রূপ নেয় জুতা, ব্যাগ, বেল্ট, মানিব্যাগ কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিযোগ্য নানা পণ্যে।
 কোরবানির পশুর চামড়া তাই শুধু ধর্মীয় অনুষঙ্গ নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, শিল্প ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই চামড়ার বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, ক্রেতার সংকট এবং দুর্বল বাজারব্যবস্থার কারণে সম্ভাবনাময় এই খাত বারবার হতাশার প্রতীকে পরিণত হচ্ছে।
বাংলাদেশে কোরবানির সময় বিপুলসংখ্যক পশু জবাই হয় এবং এর বড় একটি অংশের চামড়া শিল্পকারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দেশের চামড়া শিল্প বহু বছর ধরেই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কাঁচা চামড়া সংগ্রহ থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপেই রয়েছে নানা দুর্বলতা ও অনিয়ম।
সবচেয়ে বড় সংকট দেখা যায় চামড়া সংরক্ষণের ক্ষেত্রে। পশু জবাইয়ের পর অনেক সময় অদক্ষভাবে চামড়া ছাড়ানোর কারণে এতে কাটা বা ছিদ্র তৈরি হয়, যা চামড়ার মান কমিয়ে দেয়। আবার পর্যাপ্ত লবণ ব্যবহার না করা, দীর্ঘসময় খোলা জায়গায় ফেলে রাখা কিংবা আর্দ্র পরিবেশে সংরক্ষণের কারণেও দ্রুত পচন ধরে। ফলে একটি মূল্যবান সম্পদ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। অথচ সামান্য সচেতনতা, প্রশিক্ষণ ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই ক্ষতি সহজেই কমানো সম্ভব।
তবে শুধু সংরক্ষণ সংকটই নয়, দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাজারে কাঁচা চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়াও বড় উদ্বেগের বিষয়। বাস্তবে অনেক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে, কোরবানির মৌসুমে চামড়ার দাম কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায় না। মাঠপর্যায়ে অনেক সংগ্রাহক, এতিমখানা ও মাদ্রাসা নামমাত্র দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়। কখনো আবার ক্রেতার অভাব, বাজারে অস্থিরতা এবং দরপতনের কারণে চামড়া বিক্রি করা প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়, যখন পরিবহন খরচের চেয়েও কম দামে চামড়া বিক্রি করতে হয়। এতে একদিকে সাধারণ মানুষ নিরুৎসাহিত হচ্ছে, অন্যদিকে এতিমখানা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চামড়ার বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, কার্যকর তদারকির অভাব এবং দুর্বল বাজারব্যবস্থা দীর্ঘদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার মূল্য নির্ধারণ করলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা কার্যকর হয় না। ফলে কাঁচা চামড়ার প্রকৃত সুবিধা প্রান্তিক সংগ্রাহক বা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না; বরং লাভের বড় অংশ চলে যায় একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে। এতে চামড়া শিল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে পরিবেশবান্ধব ট্যানারি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। উন্নত বিশ্বে পরিবেশসম্মত উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু দেশের অনেক ট্যানারিতে এখনও আধুনিক বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক মান পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রপ্তানি খাতে নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।
তবে আশার জায়গাও রয়েছে। বাংলাদেশে পর্যাপ্ত কাঁচামাল, দক্ষ শ্রমশক্তি ও উদ্যোক্তা সক্ষমতা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর নীতিমালা এবং বাস্তবমুখী উদ্যোগ। স্থানীয় পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, বাজার তদারকি জোরদার এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে অপচয় ও হতাশা—দুটিই অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে ট্যানারি শিল্পকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তুলতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
কোরবানির পর রাস্তায় পড়ে থাকা একটি কাঁচা চামড়া হয়তো প্রথম দেখায় খুব সাধারণ কিছু মনে হতে পারে। কিন্তু সেই চামড়ার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে হাজারো শ্রমিকের জীবিকা, এতিমের অধিকার, শিল্পকারখানার উৎপাদনচক্র এবং দেশের অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা। তাই এই সম্পদকে অবহেলা, সিন্ডিকেট ও অব্যবস্থাপনার হাতে ছেড়ে না দিয়ে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং কার্যকর পরিকল্পনার মাধ্যমে জাতীয় সম্পদে পরিণত করাই এখন সময়ের দাবি। কারণ সঠিক উদ্যোগ নেওয়া গেলে কোরবানির চামড়া শুধু একটি মৌসুমি উপকরণ নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হতে পারে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও সংগঠক।

রিটেলেড নিউজ

অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্রে বিকাশ, দায় কার?

অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্রে বিকাশ, দায় কার?

আবদুল্লাহ মজুমদার : : জাতীয় পরিচয়পত্র একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান দলিল। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নাগর...বিস্তারিত


ভাত বৃত্তান্ত : ভাতের ঘ্রাণে শেকড়ের সন্ধান 

ভাত বৃত্তান্ত : ভাতের ঘ্রাণে শেকড়ের সন্ধান 

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ভাত আমাদের খুব আপন। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় তার উপস্থিতি এত স্বাভাবিক যে, ভাত নিয়ে আলাদা করে ভা...বিস্তারিত


গুমের স্মৃতি যেন আর ফিরে না আসে

গুমের স্মৃতি যেন আর ফিরে না আসে

আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার রাত গভীর। চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ঘুম ভেঙে দরজা খুললেন মা। ...বিস্তারিত


অর্ধশতাব্দী পরও নজরুল: বিদ্রোহ, সাম্য ও মানবতার কবি

অর্ধশতাব্দী পরও নজরুল: বিদ্রোহ, সাম্য ও মানবতার কবি

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট। ঢাকার মাটিতে থেমে গেল কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের পথচলা। যে কবি একদিন অন্যায়ের ...বিস্তারিত


দেহঘড়ি থেমেছে, থামেনি আবদুর রহমান বয়াতীর সুর

দেহঘড়ি থেমেছে, থামেনি আবদুর রহমান বয়াতীর সুর

আবদুল্লাহ মজুমদার : : কোনো কোনো কণ্ঠ শুধু গান গায় না, একটি সময়কে ধারণ করে। আবদুর রহমান বয়াতীর কণ্ঠ ছিল তেমনই—মাটির গন্ধ...বিস্তারিত


বোর্ড চ্যালেঞ্জ: নম্বর কি সত্যিই ভবিষ্যৎ মাপে?

বোর্ড চ্যালেঞ্জ: নম্বর কি সত্যিই ভবিষ্যৎ মাপে?

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ফল প্রকাশের পর মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে কয়েকটি সংখ্যা। কারও জন্য সেই সংখ্যা আনন্দের, কারও জন্য হতা...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

নোয়াখালী প্রতিনিধি : : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্তার অ...বিস্তারিত


সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : সৌদি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, স্পীড লিমিট এর চাইতে অধিক গতিতে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের উপ...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর