শিরোনাম
আমাদের বাংলা ডেস্ক : | ০২:১৪ পিএম, ২০২৬-০৫-০৯
আবদুল্লাহ মজুমদার :
ফজরের আজান ভেসে ওঠার আগেই যে মানুষটি নীরবে দিনের যুদ্ধ শুরু করেন, গভীর রাত পর্যন্ত দায়িত্বের কোনো শেষ থাকে না—তিনি মা। ঘুমন্ত সন্তানের কপালে হাত রেখে জ্বর মাপা, সন্তানের ভবিষ্যতের চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটানো, নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো নীরবে বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্ন পূরণের পথ তৈরি করা—এসবই একজন মায়ের প্রতিদিনের জীবনগাথা। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, সবচেয়ে নির্মল ভালোবাসা এবং সবচেয়ে নিঃস্বার্থ সম্পর্কের নাম- মা। অথচ সময়ের নির্মম বাস্তবতায় সেই মায়েরাই আজ অবহেলা, অপমান, মানসিক যন্ত্রণা, এমনকি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। আধুনিকতার চাকচিক্য যত বেড়েছে, ততই যেন ফিকে হয়ে গেছে পারিবারিক বন্ধনের উষ্ণতা ও মানবিকতার গভীরতা।
একজন মা সন্তানের জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করেন, তা ভাষায় সম্পূর্ণ প্রকাশ করা সম্ভব নয়। গর্ভধারণের দীর্ঘ কষ্ট, শারীরিক দুর্বলতা, সন্তান জন্মদানের অসহনীয় যন্ত্রণা—সবকিছু তিনি হাসিমুখে সহ্য করেন শুধুমাত্র সন্তানের মুখ দেখার আশায়। সন্তান জন্মের পর তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত জুড়ে থাকে সন্তানের চিন্তা। রাতের পর রাত জেগে থাকা, নিজের খাওয়া-ঘুম ভুলে সন্তানের যত্ন নেওয়া, সামান্য অসুস্থতায় উদ্বেগে ছটফট করা—এসবই যেন একজন মায়ের স্বাভাবিক দায়িত্ব। সন্তান ভালো থাকলে মা শান্তি পান, আর সন্তানের কষ্টে তার বুক হাহাকার করে ওঠে।
মা শুধু সন্তানকে জন্মই দেন না; তিনি তাকে মানুষ করে তোলেন। একজন সন্তানের নৈতিকতা, মানবিকতা, মূল্যবোধ ও চরিত্র গঠনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন মা। শিশুর প্রথম ভাষা, প্রথম শিক্ষা, প্রথম নিরাপত্তাবোধ—সবকিছুই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। তাই একটি সুস্থ, সুন্দর ও মানবিক সমাজ গঠনের ভিত্তিও অনেকাংশে নির্ভর করে একজন মায়ের শিক্ষা ও স্নেহের ওপর।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। ইসলামে মায়ের প্রতি সম্মান ও দায়িত্ব পালনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত।” এই বাণী শুধু ধর্মীয় শিক্ষাই নয়, মানবিকতারও এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একজন মায়ের দোয়া সন্তানের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসে—এ বিশ্বাস যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে স্থান করে নিয়েছে। কারণ একজন মা কখনো সন্তানের অমঙ্গল কামনা করেন না; তার প্রতিটি প্রার্থনা জুড়ে থাকে সন্তানের সুখ, সুস্থতা ও সফলতার আকাঙ্ক্ষা।
মায়ের ভালোবাসার গভীরতা এতটাই বিস্তৃত যে, পৃথিবীর সবচেয়ে অপরাধী সন্তানটিও মায়ের কাছে আশ্রয় খুঁজে পায়। সন্তান ভুল করতে পারে, অপরাধ করতে পারে, সমাজের কাছে ঘৃণিত হতে পারে—তবুও মা তাকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করতে পারেন না। এমনও বলা হয়, একজন সন্তান ভয়ংকর অপরাধ করেও যদি ঘরে ফিরে আসে, মা-ই প্রথম কাঁপা হাতে দরজা খুলে দেন। কারণ একজন মায়ের হৃদয়ে বিচার-বিবেচনার আগেই জেগে ওঠে সন্তানের প্রতি সীমাহীন মায়া। পৃথিবী যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখনও একজন মা সন্তানের জন্য চোখের জল ফেলেন, তার সংশোধনের জন্য প্রার্থনা করেন। এই নিঃশর্ত ভালোবাসাই মাকে পৃথিবীর সবচেয়ে অনন্য মানুষে পরিণত করেছে।
কিন্তু বর্তমান সমাজের বাস্তবতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
প্রযুক্তিনির্ভর ও আত্মকেন্দ্রিক জীবনে মানুষ যত বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ছে, পারিবারিক সম্পর্ক ও মূল্যবোধ ততই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। অনেক সন্তান আজ বৃদ্ধ মা-বাবাকে বোঝা মনে করছে। কেউ তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে, কেউ মানসিকভাবে আঘাত করছে, আবার কোথাও কোথাও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটছে। সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়—কোনো মা সন্তানের অবহেলায় অসহায় জীবন কাটাচ্ছেন, কেউ আশ্রয় নিয়েছেন বৃদ্ধাশ্রমে, আবার কেউ নিজের সন্তানদের কাছেই অপমানিত হচ্ছেন। এই চিত্র শুধু দুঃখজনক নয়; এটি আমাদের সামাজিক বিবেকেরও করুণ পরাজয়।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, ছোটবেলায় যে মা সন্তানের সামান্য জ্বরেও সারারাত জেগে থাকতেন, বৃদ্ধ বয়সে সেই মায়ের পাশে দাঁড়ানোর সময়ও অনেক সন্তানের থাকে না। যে মা নিজের নতুন কাপড়ের ইচ্ছা বিসর্জন দিয়ে সন্তানের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন, সেই মাকেই একসময় সংসারের অতিরিক্ত বোঝা মনে করা হয়। অনেক মা সন্তানের সংসারে থেকেও একাকিত্ব ও অবহেলার শিকার হন। কেউ কেউ অপমান সহ্য করে নীরবে চোখের জল ফেলেন, তবুও সন্তানের অমঙ্গল কামনা করেন না। কারণ মায়ের হৃদয় সবসময় ক্ষমা, মায়া ও ভালোবাসায় পূর্ণ থাকে।
এই মানবিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে পরিবার থেকেই মূল্যবোধের শিক্ষা শুরু করতে হবে। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে—মায়ের প্রতি সম্মান, যত্ন ও দায়িত্ব পালন কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি একজন মানুষের নৈতিক কর্তব্য। শুধু মা দিবসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন লেখা পোস্ট করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রকৃত দায়িত্ব হলো—মায়ের পাশে থাকা, তার কষ্ট বোঝা, তার অনুভূতিকে মূল্য দেওয়া এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তাকে সম্মান করা।
রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—সবাইকে এ বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। বৃদ্ধ মা-বাবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সামাজিক ও পারিবারিক উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ যে সমাজ তার মায়েদের সম্মান দিতে জানে না, সেই সমাজ কখনো প্রকৃত অর্থে সভ্য হতে পারে না।
দিনশেষে পৃথিবীর সব আলো নিভে গেলেও একজন মা সন্তানের জন্য প্রার্থনা করে যান। সন্তানের সুখের জন্য সেজদায় ভিজে ওঠে তার চোখ, সন্তানের কষ্ট নিজের বুকে ধারণ করে তিনি নীরবে বেঁচে থাকেন। পৃথিবীর সবচেয়ে ক্লান্ত মুখটিও সন্তানের সামনে হাসতে পারে—শুধু একজন মায়ের পক্ষেই তা সম্ভব। তাই মাকে ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়; এটি মানবিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। যে ঘরে মায়ের মুখে হাসি থাকে, সে ঘরেই শান্তি থাকে; যে সমাজ মায়ের চোখের জল মুছে দিতে পারে, সেই সমাজই সত্যিকার অর্থে সুন্দর, মানবিক ও সভ্য হয়ে ওঠে।
লেখক : সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।
নিজস্ব প্রতিবেদক :: : ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে অস্থিরতা কোনোভাবেই কমছে না। গত রোববার আবারও ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যাল...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি : কুড়িগ্রাম ব্যাটালিয়ন (২২ বিজিবি) সীমান্ত এলাকায় পরিচালিত বিশেষ ...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে দুই মাস দায়িত্ব পালনের পর এবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচিত স...বিস্তারিত
চট্টগ্রাম ব্যুরো : : চট্টগ্রাম নগরের ফয়’স লেক চিড়িয়াখানার প্রবেশমুখে অবস্থিত একটি আবাসিক হোটেল থেকে মোহাম্মদ রিপন ও...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ভেতরে মানুষ খুঁজে পায় সাময়িক প্রশান্তি, কেউ খুঁজে পায় অভ্যাস, আর কেউ ক্লান্ত জীবনে...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ঈদের সকাল গড়িয়ে দুপুর নামতেই দেশের অলিগলি, গ্রামের উঠোন আর শহরের মোড়ে মোড়ে জমতে থাকে কোরবানির পশুর...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited