বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬  

শিরোনাম

অনিরুদ্ধ রায়ের প্রতারণার খতিয়ান

নিজস্ব প্রতিবেদক    |    ০৬:২২ পিএম, ২০২৬-০৯-০৬

অনিরুদ্ধ রায়ের প্রতারণার খতিয়ান

ঢাকার কূটনৈতিক ও ব্যবসায়ী পাড়ায় আরএমএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনিরুদ্ধ কুমার রায় একজন পরিচিত মুখ। আপাতদৃষ্টিতে তাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একজন সফল ব্যক্তিত্ব মনে হলেও, অনুসন্ধানে এই সফল ব্যবসায়ী পরিচয়ের পেছনে লুকিয়ে থাকা এক কুৎসিত দ্বৈত জীবন, আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের ছায়া এবং ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণার ধারাবাহিক চিত্র উঠে এসেছে। তার এই সাজানো সাম্রাজ্যের নেপথ্যে থাকা অন্ধকার অধ্যায় নিয়ে আমাদের বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো অনিরুদ্ধ রায়ের গোপন ভূ-রাজনৈতিক তৎপরতা। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা সূত্রের দাবি অনুযায়ী, তিনি মূলত ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ -এর একজন এজেন্ট হিসেবে আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক রক্ষায় অত্যন্ত গোপনে কাজ করছেন। বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারণী মহল, উচ্চপদস্থ আমলা এবং কূটনৈতিক বাণিজ্যের সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে সরবরাহ করাই ছিল তার মূল দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ছদ্মবেশ ধারণ করে তিনি ঢাকার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবাধ যাতায়াত গড়ে তুলেছিলেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তা কৌশল বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করা।
বাংলাদেশে অনিরুদ্ধ রায় একাধিকবার সিআইপি মর্যাদা লাভ করেছেন। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে তার ভারতীয় নাগরিকত্বের নথি লুকিয়ে রেখেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত ভারতীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করে বাংলাদেশের বাইরে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ পাচার করতেন। বাংলাদেশে যখনই ব্যাংকিং খাত বা রাজস্ব ব্যবস্থার কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হতো, তখনই তিনি নিজের এই গোপন ভারতীয় নাগরিকত্ব ও বৈদেশিক সুরক্ষাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতেন। একই সাথে দুই দেশের আইনি ব্যবস্থার ফাঁকফোকর গলিয়ে তিনি একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন, অন্যদিকে নিজের ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করেছেন।
শুধু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা রাজস্ব ফাঁকিই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও অনিরুদ্ধ রায়ের বিরুদ্ধে মারাত্মক নৈতিক স্খলন ও পারিবারিক প্রতারণার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি তার প্রথম স্ত্রীর তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রেখে চতুরতার সাথে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তবে এই দ্বিতীয় বিয়ে কেবল কোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না; অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দ্বিতীয় পক্ষের বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও সম্পত্তি হস্তগত করার অসৎ উদ্দেশ্যেই তিনি এই সম্পর্কের জাল বিছিয়েছিলেন। পারিবারিক সম্পর্ককে পুঁজি করে তিনি তার শ্বশুরবাড়ির জমিজমা ও অর্থ আত্মসাতের চক্রান্তে লিপ্ত হন, যা পরবর্তীতে জানাজানি হলে চরম মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয় ভুক্তভোগী পরিবারটি।
একই সাথে দেশের ব্যবসায়ী মহলেও অনিরুদ্ধ রায়ের পরিচিতি একজন কুখ্যাত ‘প্রতারক’ হিসেবে। যৌথ মূলধনী ব্যবসায় অংশীদারদের লভ্যাংশ না দেওয়া, জাল ব্যাংকিং কাগজপত্র তৈরি করা এবং চামড়া ও পোশাক শিল্পের সরবরাহকারীদের কোটি কোটি টাকার পাওনা পরিশোধ না করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি ২০১৭ সালে গুলশান থেকে তার রহস্যময় ৭৯ দিনের নিখোঁজ বা গুম হওয়ার ঘটনার পেছনেও কোনো আইনি কারণ ছিল না; বরং পাওনাদারদের তীব্র চাপ ও নিজের বিপুল আর্থিক অনিয়ম ধামাচাপা দিতেই তিনি এই নাটক সাজিয়েছিলেন বলে তার তৎকালীন ব্যবসায়িক অংশীদারেরা দাবি করেন।
অনিরুদ্ধ রায় আরএমএম গ্রুপের এমডি হলেও, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং সরকারি তালিকায় তিনি মূলত ‘এফবি ফুটওয়্যার’-এর প্রতিনিধি হিসেবে সিআইপি মর্যাদা পেয়েছিলেন। গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই এফবি ফুটওয়্যারে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার একটি বিশাল অঙ্কের অপ্রকাশিত ও গোপন বিনিয়োগ ছিল। অনিরুদ্ধ রায় মূলত সেই ব্যবসায় বিচারপতি সিনহার আর্থিক স্বার্থ দেখভালকারী বেনামি প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। এছাড়া তিনি এস আলমের ব্যবসায়িক পার্টনার ছিলেন। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি রহমত উল্লাহর ব্যবসায়িক পার্টনার ছিলেন।
২০১৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমান পদ্মা ব্যাংক) একটি বড় অর্থ কেলেঙ্কারি উন্মোচিত হয়। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দুজন ব্যবসায়ীর নামে ব্যাংকটির গুলশান শাখা থেকে ৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। এই ৪ কোটি টাকা পরবর্তীতে পে-অর্ডারের মাধ্যমে সরাসরি জমা হয় বিচারপতি সিনহার ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই ভুয়া ঋণ প্রক্রিয়া পরিচালনা এবং ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বিচারপতি সিনহার অ্যাকাউন্টে পৌঁছানোর মূল মধ্যস্থতাকারী ও কৌশলী ছিলেন অনিরুদ্ধ রায় ও তার ঘনিষ্ঠ চক্র।
এছাড়া আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘আশিয়ান সিটি’ সংক্রান্ত একটি আপিল মামলার প্রক্রিয়া চলার সময় প্রায় ৫০ কোটি টাকার একটি বিশাল সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। প্রধান বিচারপতির সাথে আশিয়ান সিটি কর্তৃপক্ষের গোপন যোগাযোগ এবং এই ৫০ কোটি টাকা লেনদেনের প্রধান অনুঘটক ও সমন্বয়কারী ছিলেন অনিরুদ্ধ রায়। ব্যাংকিং চ্যানেল এবং নগদ অর্থ সরবরাহে তার সরাসরি সংশ্লিষ্টতার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে।
পাচারকারী সিন্ডিকেট ও তদন্তের জাল বিচারপতি সিনহার ব্যক্তিগত সহকারী রঞ্জিত রায় এবং অনিরুদ্ধ রায় ছিলেন একই সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য। তারা উত্তরার একটি বিলাসবহুল বহুতল ভবন অবৈধভাবে দখল করে তার পাওয়ার অব অ্যাটর্নি রঞ্জিত রায়ের স্ত্রী শ্রান্তি রায়ের নামে হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে যখন বিচারপতি সিনহার ব্যাংকিং লেনদেনের অবৈধ নথিপত্র এবং অনিরুদ্ধের সাথে গোপন লেনদেনের তথ্য ফাঁস হতে শুরু করে, তখন ধরা পড়ার ভয়ে রঞ্জিত রায় সপরিবারে সিঙ্গাপুরে পালিয়ে যান।
২০১৭ সালের আগস্টে অনিরুদ্ধ রায়ের রহস্যময় নিখোঁজ হওয়ার পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার কল ডিটেইলস রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখতে পায়, নিখোঁজ হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বিচারপতি সিনহার সাথে নিয়মিত সরাসরি টেলিফোনে এবং গোপন মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন। পরবর্তীতে দুদক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এই সিনহা-অনিরুদ্ধ চক্রের ফারমার্স ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের সন্দেহজনক লেনদেনের নথিপত্র জব্দ করে এবং আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

রিটেলেড নিউজ

গফরগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রোগীদের জন্য জরুরি নির্দেশনা

গফরগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রোগীদের জন্য জরুরি নির্দেশনা

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি: গফরগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ভর্তি রোগী ও তাদের...বিস্তারিত


হাটহাজারীতে ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনে দুর্ঘটনা, নিহত ২ সেনাসদস্য

হাটহাজারীতে ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনে দুর্ঘটনা, নিহত ২ সেনাসদস্য

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মোঃ নাজিম উদ্দীন, হাটহাজারী : চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলন চলাকালে ট্যাংক থেক...বিস্তারিত


প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে এগিয়ে যাচ্ছে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে এগিয়ে যাচ্ছে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধিঃ প্রতিষ্ঠার প্রায় পাঁচ বছর পর ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে এগিয়ে য...বিস্তারিত


কুড়িগ্রাম ভোগডাঙ্গা মডেল কলেজ এলাকায় দেড় বছরের শিশুকে রেখে অজ্ঞাত নারী উধাও, থানায় জিডি

কুড়িগ্রাম ভোগডাঙ্গা মডেল কলেজ এলাকায় দেড় বছরের শিশুকে রেখে অজ্ঞাত নারী উধাও, থানায় জিডি

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি : কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ৩নং ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের ভোগডাঙ্গা মডেল কলেজ এলা...বিস্তারিত


সংসদে প্রস্তাবিত ‘হেবা ও সম্পত্তি হস্তান্তর’ বিল কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী: হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জের হুঁশিয়ারি

সংসদে প্রস্তাবিত ‘হেবা ও সম্পত্তি হস্তান্তর’ বিল কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী: হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জের হুঁশিয়ারি

মোঃ জহির উদ্দিন, কক্সবাজার : : সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ‘হেবা সম্পত্তি হস্তান্তর’ বিলটিকে সম্পূর্ণ কুরআন ও সুন্নাহ প...বিস্তারিত


বন্ধ নয়, শৃঙ্খলা আনতে চায় সরকার : অটোরিকশার জন্য আসছে কিউআর কোড-ডিজিটাল ট্র্যাকিং

বন্ধ নয়, শৃঙ্খলা আনতে চায় সরকার : অটোরিকশার জন্য আসছে কিউআর কোড-ডিজিটাল ট্র্যাকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক : ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে একটি ডিজিটাল, নিবন্ধিত ও শৃঙ্খলিত ব্যবস্থার আওতায় আন...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

নোয়াখালী প্রতিনিধি : : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্তার অ...বিস্তারিত


সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : সৌদি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, স্পীড লিমিট এর চাইতে অধিক গতিতে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের উপ...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর