শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৬:৩৩ পিএম, ২০২৬-০৬-১৮
আবদুল্লাহ মজুমদার
কর্ণফুলী নদী বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণপ্রবাহ। চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন অসংখ্য দেশি-বিদেশি জাহাজ এই নদী ও বহিঃনোঙর এলাকায় নোঙর করে। এসব জাহাজ দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতির গতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এই ব্যস্ত নৌপথের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে আরেকটি সমান্তরাল অর্থনীতি—চোরাই ডিজেল, লুব অয়েল, স্ক্র্যাপ, ব্যাটারি, যন্ত্রাংশ ও নকল পণ্যের অবৈধ বাণিজ্য। সম্প্রতি পতেঙ্গা এলাকায় কোস্ট গার্ডের পৃথক দুটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ চোরাই মালামাল ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার হওয়ার ঘটনা সেই অন্ধকার বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এ ঘটনা শুধু কয়েকজন চোর বা চোরাকারবারির অপরাধ নয়; বরং এটি একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটভিত্তিক অর্থনৈতিক অপরাধের ইঙ্গিত বহন করে।
কোস্ট গার্ডের অভিযানে বহিঃনোঙর এলাকা থেকে চোরাই লুব অয়েল, ডিজেল, স্ক্র্যাপ, ব্যাটারি এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আলামত প্রমাণ করে যে, চোরচক্রগুলো কেবল চুরি করেই থেমে নেই; নিজেদের কার্যক্রম রক্ষা ও নিয়ন্ত্রণে বলপ্রয়োগের প্রস্তুতিও রাখছে। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব পণ্য বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে চুরি করা হয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। অর্থাৎ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্রকে ঘিরে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র সক্রিয় রয়েছে।
বহিঃনোঙরে অবস্থানরত জাহাজগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এসব চক্রের লক্ষ্যবস্তু। অভিযোগ রয়েছে, গভীর রাতে ছোট নৌযান ব্যবহার করে অথবা অসাধু ব্যক্তিদের সহযোগিতায় জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল, লুব অয়েল, ব্যাটারি, স্ক্র্যাপ ও বিভিন্ন মূল্যবান যন্ত্রাংশ সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে সেগুলো বিভিন্ন গুদাম, ভাঙারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা অবৈধ বাজারে বিক্রি করা হয়। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু মালামাল উদ্ধার ও কয়েকজনকে আটক করা হলেও পুরো চক্রের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। বরং এটি স্পষ্ট যে, এ ধরনের অপরাধের পেছনে রয়েছে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক, যার শিকড় অনেক গভীরে বিস্তৃত।
চোরাই পণ্যের এই বাণিজ্য শুধু চট্টগ্রাম বা কর্ণফুলী নদীকেন্দ্রিক নয়। অভিযোগ রয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চোরাই লুব অয়েল, ডিজেল, স্ক্র্যাপ, ব্যাটারি এবং নকল পণ্যের বিস্তৃত বাজার গড়ে উঠেছে। ব্যবহৃত তেল পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে নতুন পণ্যের মোড়কে বিক্রি, নামী ব্র্যান্ডের নকল লুব অয়েল বাজারজাত করা কিংবা চোরাই জ্বালানি কম দামে বিক্রি করার মতো কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ফলে সাধারণ ভোক্তা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে, তিনি বৈধ পণ্য কিনছেন নাকি চোরাই বা নকল পণ্য ব্যবহার করছেন।
এ ধরনের বাণিজ্যের অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। চোরাই পণ্য বাজারে প্রবেশ করায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারায়। অন্যদিকে বৈধ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। যারা নিয়ম মেনে কর ও শুল্ক পরিশোধ করে ব্যবসা পরিচালনা করেন, তাদের জন্য বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বৈধ ব্যবসার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং অপরাধভিত্তিক অর্থনীতিকে উৎসাহিত করে।
এর পাশাপাশি রয়েছে নিরাপত্তা ও ভাবমূর্তির প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নিরাপদ বন্দর ও নৌপথ একটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। বহিঃনোঙরে অবস্থানরত বিদেশি জাহাজ থেকে যদি নিয়মিত চুরি হয়, তাহলে তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। বিদেশি জাহাজ মালিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হলে তার নেতিবাচক প্রভাব দেশের বন্দর কার্যক্রম ও বাণিজ্যিক সক্ষমতার ওপরও পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—চোরাই পণ্যের এত বড় বাজার টিকে থাকে কীভাবে? বাস্তবতা হলো, চোরাই পণ্যের ক্রেতা রয়েছে বলেই এই ব্যবসা টিকে আছে। জাহাজ থেকে চুরি হওয়া তেল, স্ক্র্যাপ বা ব্যাটারি কোথাও না কোথাও বিক্রি হচ্ছে, কেউ না কেউ তা কিনছে এবং সেই পণ্য আবার বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে শুধু চোরকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যারা জেনেশুনে চোরাই পণ্য কেনাবেচা করছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধের সরবরাহ ও চাহিদা—উভয় দিকেই সমান গুরুত্ব না দিলে এ চক্র কখনো ভাঙা সম্ভব হবে না।
আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ার অভিযোগ। স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগ প্রচলিত যে, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া এত বড় চোরাই বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এটিও সত্য যে, কোনো অপরাধচক্র যখন বছরের পর বছর ধরে সক্রিয় থাকে, তখন তাদের পেছনে প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
দুঃখজনকভাবে প্রায়ই দেখা যায়, অভিযানে ধরা পড়ে মাঠপর্যায়ের বাহক বা ছোটখাটো সদস্যরা; কিন্তু অর্থদাতা, গডফাদার, চোরাই পণ্যের বড় ক্রেতা এবং নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে কিছুদিন অভিযান চলার পর পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এ বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত করতে হবে এবং অপরাধচক্রের আর্থিক উৎস ও পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করতে হবে।
কোস্ট গার্ডের সাম্প্রতিক অভিযান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে চোরাই বাণিজ্যের বিরুদ্ধে প্রকৃত সাফল্য অর্জন করতে হলে বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, বন্দর কর্তৃপক্ষ, পুলিশ, কাস্টমস ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ। বহিঃনোঙর এলাকায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বৃদ্ধি, সন্দেহভাজন গুদাম ও ক্রেতা নেটওয়ার্ক শনাক্তকরণ, নকল পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
কর্ণফুলীর বুকে ভেসে থাকা প্রতিটি জাহাজ কেবল পণ্য বহন করে না; বহন করে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, আন্তর্জাতিক আস্থা এবং জাতীয় স্বার্থ। সেই জাহাজকে কেন্দ্র করে যদি চোরাই তেল, স্ক্র্যাপ, ব্যাটারি ও নকল পণ্যের অন্ধকার অর্থনীতি গড়ে ওঠে, তবে তা শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিরুদ্ধে এক নীরব আঘাত। তাই সময় এসেছে বাহক নয়, মূল হোতাদের চিহ্নিত করার; বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, পুরো সিন্ডিকেটকে ভেঙে দেওয়ার। কারণ কর্ণফুলীর অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা এই চোরাই অর্থনীতির অবসান ঘটাতে না পারলে অভিযানের সাফল্য সাময়িক হবে, কিন্তু সমস্যার শিকড় থেকে যাবে অটুট।
লেখক: সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মাহমুদুর রহমান মাসুদ, ভালুকা প্রতিনিধি: ময়মনসিংহের ভালুকায় 'ময়মনসিংহ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মাহমুদুর রহমান মাসুদ, ভালুকা প্রতিনিধি: ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতন দিবসের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উদযাপন ...বিস্তারিত
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি : : রাঙামাটির কেন্দ্রীয় কবরস্থানে জায়গা সংকটের অভিযোগ, সম্প্রসারণ ও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের প্রস্ত...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : সিরাজগঞ্জ ব্যুরো : সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও ইসলামিক ফাউণ্ডেশন সিরাজগঞ্জের উদ্যোগে জুলাই গণঅ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : রাজশাহী প্রতিনিধি : রাজশাহীতে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা বৃদ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার নুনখাওয়া ইউনিয়নের চরকাটগিরাই এলাকায় অবস্থ...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited