শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৮:৪৭ পিএম, ২০২৬-০৬-০৭
রাষ্ট্রের আইন, প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ এবং আদালতের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে কখনো কখনো এমন কিছু ক্ষমতাকেন্দ্র গড়ে ওঠে, যেগুলোর অস্তিত্ব দৃশ্যমান না হলেও প্রভাব থাকে গভীর ও সুদূরপ্রসারী। এসব কাঠামো সমাজের ভেতরে ভয়, প্রভাব, অর্থ এবং নীরবতার সমন্বয়ে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করে, যা অনেক সময় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সমান্তরালে দাঁড়িয়ে যায়। বিশ্বজুড়ে এই ধরনের সংগঠিত ক্ষমতা-কাঠামোকে সাধারণত “মাফিয়া” নামে অভিহিত করা হয়।
তবে “মাফিয়া” কেবল অপরাধী গোষ্ঠীর পরিচয় নয়; এটি এক ধরনের সংগঠিত ক্ষমতা-ব্যবস্থা। অর্থ, প্রভাব, আনুগত্য এবং নিয়ন্ত্রণের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই কাঠামো সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতির বিভিন্ন স্তরে নিজের অবস্থান তৈরি করে। ফলে এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
মাফিয়া (Mafia) বলতে সাধারণত এমন সংগঠিত অপরাধচক্রকে বোঝানো হয়, যারা চাঁদাবাজি, মাদক পাচার, জুয়া, অর্থপাচার, মানবপাচারসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থ ও প্রভাব অর্জন করে। তবে এটি বিচ্ছিন্ন অপরাধীদের সমষ্টি নয়। এর রয়েছে নির্দিষ্ট নেতৃত্ব, শৃঙ্খলাবদ্ধ সদস্য কাঠামো, কঠোর গোপনীয়তা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুপরিকল্পিত কৌশল।
ঐতিহাসিকভাবে এই ধারণার শিকড় ইতালির সিসিলি অঞ্চলে। উনিশ শতকে রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার সুযোগে স্থানীয় কিছু গোষ্ঠী নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার জন্য বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে তোলে। সময়ের প্রবাহে সেই কাঠামো সংগঠিত অপরাধচক্রে রূপ নেয় এবং পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা রূপে বিস্তার লাভ করে।
একটি মাফিয়া কাঠামোর টিকে থাকার প্রধান ভিত্তি তিনটি—ভয়, আনুগত্য এবং নীরবতা। সংগঠনের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য এখানে সর্বোচ্চ মূল্যবোধ হিসেবে বিবেচিত হয়। একই সঙ্গে সমাজে এমন এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়, যেখানে মানুষ সহজে কথা বলে না, প্রতিবাদ করে না কিংবা বিরোধিতা করার সাহস পায় না। এই নীরবতাই অনেক সময় সংগঠনের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়।
বিশ্বজুড়ে Sicilian Mafia, Camorra, 'Ndrangheta, Yakuza এবং Bratva ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত হলেও তাদের মৌলিক কাঠামো প্রায় একই। গোপন নেটওয়ার্ক, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব বিস্তারের মধ্য দিয়েই তারা নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করে।
ইতিহাস দেখিয়েছে, রাষ্ট্র যেখানে দুর্বল, আইন প্রয়োগ যেখানে শিথিল এবং দুর্নীতি যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, সেখানেই এই ধরনের কাঠামো দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শুরুতে একটি নির্দিষ্ট এলাকা বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে তা অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর গভীরে প্রবেশ করে।
চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি, মাদক ও অস্ত্র পাচার, অর্থপাচার, মানবপাচার এবং বৈধ ব্যবসায় অনুপ্রবেশ—এসব কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে সংগঠিত অপরাধচক্রের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। আধুনিক যুগে ডিজিটাল ব্যাংকিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি, অনলাইন জালিয়াতি এবং আন্তর্জাতিক অর্থপাচারের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম আরও জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে।
এ ধরনের কাঠামো অনেক সময় একটি সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে তোলে, যেখানে কালো টাকা, অবৈধ বিনিয়োগ এবং বৈধ ব্যবসার আড়ালে অর্থপ্রবাহ একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। একই সঙ্গে নির্বাচন, স্থানীয় প্রশাসন, নীতিনির্ধারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে তারা এক ধরনের “ছায়া-রাষ্ট্র” (Shadow State) বৈশিষ্ট্য অর্জন করে।
বাংলা সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক ভাষ্যচর্চায় “মাফিয়া” শব্দটিকে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে বর্ষীয়ান সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ মিজানুর রহমান চৌধুরীর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর সম্পাদকীয় ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আড়ালে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট, অসাধু প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করতে “মাফিয়া” শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
সামাজিক বাস্তবতায় ভয়, সুবিধাবাদ কিংবা নিরুপায় অবস্থার কারণে অনেক মানুষ এই ধরনের কাঠামোর সঙ্গে আপস করে। ফলে নীরবতা ক্রমেই অপরাধচক্রের শক্তিতে পরিণত হয়। একইভাবে দুর্নীতি ও সংগঠিত অপরাধ একে অপরকে শক্তিশালী করে। প্রশাসনিক দুর্বলতা অপরাধকে সুযোগ দেয়, আর অপরাধ সেই দুর্বলতাকে আরও গভীর করে তোলে।
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে The Godfather, Goodfellas কিংবা The Sopranos-এর মতো চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন সিরিজ সংগঠিত অপরাধকে অনেক সময় রোমাঞ্চকর করে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাস্তবের মাফিয়া কাঠামো ভয়, অনিশ্চয়তা, সংঘাত এবং মানবিক বিপর্যয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতির সুযোগ, দ্রুত লাভের আকর্ষণ, সামাজিক নীরবতা এবং রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা—এসব কারণেই ছায়া-শক্তির এ ধরনের কাঠামো টিকে থাকে। তবে ইতিহাস এটিও দেখিয়েছে যে, এসব কাঠামোর পরিণতি শেষ পর্যন্ত খুব কম ক্ষেত্রেই শুভ হয়। Salvatore Riina কিংবা Bernardo Provenzano-এর মতো প্রভাবশালী মাফিয়া নেতাদের পরিণতিও শেষ পর্যন্ত কারাগার, পতন কিংবা সংঘাতেই সীমাবদ্ধ ছিল।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর একটি বহুল আলোচিত উদাহরণ। জমি ও পাহাড় দখল, একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি, এলাকা নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা, সংঘর্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান—সব মিলিয়ে সেখানে একটি জটিল স্থানীয় ক্ষমতা-কাঠামোর চিত্র দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।
সাম্প্রতিক সময়ে যৌথ বাহিনীর অভিযান, সংঘর্ষ এবং আটক-সংক্রান্ত ঘটনাগুলো পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। আন্তর্জাতিক অর্থে জঙ্গল সলিমপুরকে ক্লাসিক মাফিয়া বলা না গেলেও কাঠামোগতভাবে কিছু মিল অস্বীকার করা যায় না। এলাকা নিয়ন্ত্রণ, সশস্ত্র উপস্থিতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ, প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সংঘর্ষ এবং বিকল্প ক্ষমতা-কেন্দ্র তৈরির প্রবণতা এটিকে অন্তত ‘মাফিয়া-ধাঁচের’ একটি বাস্তবতা হিসেবে বিশ্লেষণের সুযোগ দেয়।
জঙ্গল সলিমপুরের ঘটনাপ্রবাহ তাই কেবল একটি এলাকার আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি, ভূমি ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং আইনের শাসনের কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। কারণ যেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়ে, সেখানে ছায়া-শক্তির উত্থান ঘটে; আর যেখানে আইনের শাসন শক্তিশালী হয়, সেখানে এসব কাঠামোর ভিত্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—মাফিয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, কোনো ছায়া-সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী নয়। তার ভেতরেই পতনের বীজ লুকিয়ে থাকে। সময়ের সঙ্গে রাষ্ট্র, আইন এবং সমাজের সম্মিলিত শক্তি যখন কার্যকর হয়ে ওঠে, তখন অন্ধকারের সবচেয়ে শক্তিশালী দেয়ালও একদিন ভেঙে পড়ে।
লেখক: সভাপতি, লাভ বাংলাদেশ পার্টি, চট্টগ্রাম মহানগর
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র দাখিলের ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : চট্টগ্রামের কিশোরী সুপর্বা সুধা বিশ্বাস। ১৩ বছর বয়সী অষ্টম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর ঝুলিতে ইতোমধ্...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : বাংলাদেশ এডিটরস্ ফোরাম গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে যে, সম্প্রতি চট্টগ্রামের একটি দৈনিক পত্রি...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : নোবিপ্রবি প্রতিনিধি : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি ও শহীদদের স্মরণে বাংলাদেশ ইসলাম...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু পুরুষের শাস্তির বিধান কেন অবৈধ নয়, তা জানতে ...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর বিচার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এগোচ্...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited