শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০২:৫৬ পিএম, ২০২৬-০৭-০৫
ইতিহাসের প্রতিটি বড় মহামারি মানবসভ্যতাকে একই শিক্ষা দিয়েছে—মানুষ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নয়। মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের সুস্থতা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ উন্নয়নের নামে নির্বিচারে বন উজাড়, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে মানুষ সেই সূক্ষ্ম ভারসাম্যকেই ক্রমাগত নষ্ট করছে। এর ফল হিসেবে প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। এমন বাস্তবতায় প্রতি বছরের ৬ জুলাই পালিত বিশ্ব জুনোসিস দিবস (World Zoonoses Day) কেবল একটি সচেতনতামূলক দিবস নয়; এটি মানবসভ্যতার স্বাস্থ্যনিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
১৮৮৫ সালের ৬ জুলাই ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর প্রথমবারের মতো জলাতঙ্কে আক্রান্ত কুকুরের কামড়ে মৃত্যুঝুঁকিতে থাকা নয় বছর বয়সী শিশু জোসেফ মেইস্টারের শরীরে সফলভাবে জলাতঙ্কের টিকা প্রয়োগ করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এ ঘটনা এক যুগান্তকারী মাইলফলক। সেই ঐতিহাসিক সাফল্যকে স্মরণ করেই বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব জুনোসিস দিবস। যদিও এটি জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক দিবস নয়, তবু জনস্বাস্থ্য, প্রাণিস্বাস্থ্য ও গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান দিবসটিকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে।
‘জুনোসিস’ বলতে এমন সংক্রামক রোগকে বোঝায়, যা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে কিংবা মানুষ থেকে প্রাণীর মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। জলাতঙ্ক, অ্যানথ্রাক্স, বার্ড ফ্লু, ব্রুসেলোসিস, লেপ্টোস্পাইরোসিস এবং নিপাহ ভাইরাস এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বিশ্ব স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মধ্যে নতুন উদ্ভূত সংক্রামক রোগের প্রায় ৭৫ শতাংশের উৎস প্রাণী। অর্থাৎ ভবিষ্যতের বহু মহামারির বীজ লুকিয়ে আছে প্রাণিজগৎ, পরিবেশ এবং মানুষের সঙ্গে তাদের পরিবর্তিত সম্পর্কের ভেতর।
কোভিড–১৯ মহামারি বিশ্ববাসীকে কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একটি অণুজীব কীভাবে কয়েক মাসের ব্যবধানে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, পর্যটন এবং সামাজিক কাঠামোকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে, তা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে। কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; রাষ্ট্রগুলোকে গুনতে হয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক মূল্য। ফলে জুনোটিক রোগ আর শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোচনার বিষয় নয়; এটি এখন জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকটের বড় অংশের জন্য দায়ী মানুষেরই কর্মকাণ্ড। বনভূমি উজাড়, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য, অপরিকল্পিত কৃষি ও খামারব্যবস্থা এবং জলবায়ু পরিবর্তন নতুন নতুন রোগজীবাণুর বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রতিক্রিয়া শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনেই ফিরে আসে—সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা সেই সত্যকে আরও স্পষ্ট করেছে।
এ কারণেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘ওয়ান হেলথ’ (One Health) ধারণা ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ধারণার মূল কথা হলো, মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের স্বাস্থ্যকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসক, প্রাণিচিকিৎসক, পরিবেশবিদ, কৃষিবিজ্ঞানী, গবেষক এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। খণ্ডিত পরিকল্পনা কিংবা বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ দিয়ে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশও এ বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয়। দেশে জলাতঙ্ক, অ্যানথ্রাক্স, বার্ড ফ্লু ও নিপাহ ভাইরাসসহ একাধিক জুনোটিক রোগের ইতিহাস রয়েছে। উচ্চ জনঘনত্ব, বিপুল প্রাণিসম্পদ, বন্য প্রাণীর আবাসস্থলের ক্রমসংকোচন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সীমিত সচেতনতা এ ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে প্রাণীর নিয়মিত টিকাদান, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা নিশ্চিত করা, আধুনিক রোগ নজরদারি জোরদার করা, গবেষণাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা গড়ে তোলা এখন আর বিলাসিতা নয়; এগুলো জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার মৌলিক পূর্বশর্ত।
এ ক্ষেত্রে ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণাকে কেবল নীতিপত্রে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ, পরিবেশ, কৃষি ও স্থানীয় সরকার—এসব খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে রোগ পর্যবেক্ষণব্যবস্থা আরও আধুনিক করা, তথ্য আদান-প্রদানের সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। কারণ, মহামারি শুরু হওয়ার পর তা মোকাবিলার চেয়ে আগেভাগে ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি কার্যকর এবং ব্যয়সাশ্রয়ী।
গণমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারে। বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য প্রচার, গুজব ও বিভ্রান্তি প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সম্পর্ক তুলে ধরার মাধ্যমে গণমাধ্যম সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও পরিবেশ-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়।
বিশ্ব জুনোসিস দিবস আমাদের সামনে একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরে—মহামারি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় কেবল উন্নত হাসপাতাল নির্মাণ বা চিকিৎসাসুবিধা বাড়ানো নয়; বরং রোগের উৎস চিহ্নিত করে শুরুতেই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা। প্রতিরোধ সব সময় চিকিৎসার চেয়ে কার্যকর, মানবিক এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক প্রতিযোগিতার নয়, সহাবস্থানের। সেই সত্যকে উপেক্ষা করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের স্বাস্থ্য—এই তিনটিকে সমান গুরুত্ব দিয়ে নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিশ্ব জুনোসিস দিবসের মূল বার্তাও এখানেই। নীরব এই স্বাস্থ্যঝুঁকিকে অবহেলা করলে ভবিষ্যতের মহামারি আরও ভয়াবহ রূপে ফিরে আসতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন দূরদর্শী নীতি, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং সমন্বিত উদ্যোগ। কারণ, সুস্থ মানুষ, সুস্থ প্রাণী ও সুস্থ পরিবেশ—এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি নিরাপদ, টেকসই এবং মহামারি-সহনশীল বাংলাদেশ।
লেখক: সাংবাদিক,কলামিস্ট ও সহকারী সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : জাতীয় পরিচয়পত্র একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান দলিল। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নাগর...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ভাত আমাদের খুব আপন। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় তার উপস্থিতি এত স্বাভাবিক যে, ভাত নিয়ে আলাদা করে ভা...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার রাত গভীর। চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ঘুম ভেঙে দরজা খুললেন মা। ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট। ঢাকার মাটিতে থেমে গেল কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের পথচলা। যে কবি একদিন অন্যায়ের ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : কোনো কোনো কণ্ঠ শুধু গান গায় না, একটি সময়কে ধারণ করে। আবদুর রহমান বয়াতীর কণ্ঠ ছিল তেমনই—মাটির গন্ধ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ফল প্রকাশের পর মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে কয়েকটি সংখ্যা। কারও জন্য সেই সংখ্যা আনন্দের, কারও জন্য হতা...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited