শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৫:৩৭ পিএম, ২০২৬-০৬-২৯
ডিজিটাল যুগে সংবাদ এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং কয়েকটি ক্লিকেই মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছে দেশ-বিদেশের নানা তথ্য। সংবাদ পরিবেশনের প্রচলিত ধারাকে বদলে দিয়ে অনলাইন সাংবাদিকতা তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনা, নতুন কর্মক্ষেত্র এবং মানুষের মতপ্রকাশের বিস্তৃত সুযোগ।
কিন্তু সম্ভাবনার এই আলোচনার পাশাপাশি সামনে এসেছে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নও। সাংবাদিকতার মতো মর্যাদাপূর্ণ পেশার পরিচয় ব্যবহার করে যখন অনিয়ম, অস্বচ্ছ নিয়োগ, অর্থের বিনিময়ে প্রতিনিধি তৈরি কিংবা জবাবদিহিতাহীন সংবাদ কার্যক্রমের অভিযোগ ওঠে, তখন প্রশ্ন তৈরি হয়—অনলাইন সাংবাদিকতা কি তার বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গা ধরে রাখতে পারছে? নাকি পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে পেশার মূল মূল্যবোধ?
সাংবাদিকতা শুধু একটি পরিচয়পত্র, পদবি বা একটি ওয়েবসাইটের নাম নয়। এটি সত্য অনুসন্ধানের দায়িত্ব, মানুষের জানার অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি পেশা। একজন সাংবাদিকের মূল কাজ হলো তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই, ঘটনার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য পাঠকের সামনে তুলে ধরা।
কিন্তু বর্তমানে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সহজ বিস্তারের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকতার পরিচয়কে ভিন্নভাবে ব্যবহার করছে—এমন অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম পরিচালনার চেয়ে পরিচয়পত্র প্রদান, প্রতিনিধি নিয়োগ এবং সংখ্যাবৃদ্ধিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নয়, পুরো সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু অনলাইন পোর্টাল প্রতিনিধি নিয়োগের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই না করেই কাজ শুরু করে দেয়। প্রার্থীর যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সাংবাদিকতার দক্ষতা কিংবা পেশাগত নৈতিকতা যাচাইয়ের পরিবর্তে অনেক সময় শুধু একটি পরিচয়পত্র দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে প্রক্রিয়া। ফলে মাঠপর্যায়ে এমন কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান, যাদের পেশাগত প্রস্তুতি ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
আরেকটি বড় অভিযোগ হলো—কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধি নিয়োগ বা প্রেস কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। সাংবাদিকতা যেখানে জনস্বার্থ রক্ষার একটি দায়িত্বশীল পেশা, সেখানে অর্থের বিনিময়ে পরিচয় তৈরির প্রবণতা এই পেশার মৌলিক চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এমনই একটি অভিযোগ উঠেছে ‘দৈনিক জনতার খবর’ নামের একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালকে ঘিরে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, প্রতিনিধি নিয়োগের সময় তার কাছ থেকে এক হাজার টাকা নেওয়া হয়। কিছুদিন ওই পোর্টালে সংবাদ প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে কোনো পূর্ব নোটিশ, লিখিত ব্যাখ্যা কিংবা গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়াই সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, একই উপজেলার একাধিক ব্যক্তিকে প্রতিনিধি ও প্রেস কার্ড দেওয়া হয়েছে। একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামো, সম্পাদকীয় নীতিমালা এবং প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এ ধরনের কার্যক্রম কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—তা নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের বিষয়।
তবে একটি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ দিয়ে পুরো অনলাইন সাংবাদিকতাকে বিচার করা যায় না। বরং এই ঘটনা সামনে আনে একটি বৃহত্তর বাস্তবতা—ডিজিটাল গণমাধ্যমের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ, পেশাগত মানদণ্ড এবং জবাবদিহিতার বিষয়গুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একটি সংবাদমাধ্যম পরিচালনা শুধু একটি ওয়েবসাইট তৈরি করা কিংবা কয়েকজনকে পরিচয়পত্র দেওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে সম্পাদকীয় নীতি, সংবাদ যাচাইয়ের প্রক্রিয়া, দক্ষ জনবল, পাঠকের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং পেশাগত সততা। একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে তার প্রকাশিত সংবাদের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।
এ ক্ষেত্রে সম্পাদক ও মালিকপক্ষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া, একাধিক সূত্র নিশ্চিত করা এবং সংবাদটির সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করা সম্পাদকীয় দায়িত্বের অংশ। কিন্তু যখন কোনো প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকতার মূল চর্চার পরিবর্তে শুধু পরিচয়পত্র বিতরণ বা প্রতিনিধি সংখ্যা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়, তখন ধীরে ধীরে কমতে থাকে মানুষের আস্থা।
সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বাস। একজন পাঠক যখন কোনো সংবাদ পড়েন, তখন তিনি ধরে নেন—এই তথ্য যাচাই করা হয়েছে, দায়িত্বশীলতার সঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে। সেই বিশ্বাসে আঘাত এলে শুধু একটি সংবাদমাধ্যম নয়, পুরো গণমাধ্যম ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অনলাইন সাংবাদিকতার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভুয়া তথ্য ও অপেশাদার সংবাদ পরিবেশন। দ্রুত সংবাদ দেওয়ার প্রতিযোগিতায় অনেক সময় যাচাই-বাছাইয়ের গুরুত্ব কমে যায়। অথচ সাংবাদিকতার মূল নীতি হলো—দ্রুততার চেয়ে নির্ভুলতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ভুল তথ্য সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে এবং মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থা। অনলাইন সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন, মালিকানা, সম্পাদকীয় কাঠামো এবং কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিনিধি নিয়োগের ক্ষেত্রে থাকতে হবে নির্দিষ্ট নীতিমালা, লিখিত নিয়োগপত্র, দায়িত্বের স্পষ্ট বিবরণ এবং জবাবদিহিতার ব্যবস্থা।
একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ, নৈতিক মানদণ্ড এবং তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। সাংবাদিক সংগঠন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো প্রতারণামূলক, অনিবন্ধিত এবং পেশার মর্যাদা ক্ষুণ্নকারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়ানো। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে—শুধু একটি প্রেস কার্ড বা অনলাইন পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা বিচার না করে তার বৈধতা, সংবাদ প্রকাশের মান এবং পেশাগত অবস্থান যাচাই করা জরুরি।
সাংবাদিকতা কখনোই শুধু পরিচয়ের বিষয় নয়; এটি দায়িত্বের বিষয়। একটি সংবাদমাধ্যমের শক্তি তার কার্ড, পদবি কিংবা বাহ্যিক পরিচয়ে নয়—তার সততা, পেশাগত মান এবং মানুষের আস্থায়।
তাই অনলাইন সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে পরিচয়ের আড়ালে কী চলছে তার ওপর নয়, বরং সত্য, দায়িত্ব ও জনস্বার্থের প্রতি কতটা অঙ্গীকার রয়েছে তার ওপর। কারণ একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম গড়ে ওঠে তখনই, যখন সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষা পায় এবং সংবাদ পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
লেখক: কলামিস্ট, সাংবাদিক, সহকারী সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মো. কামাল উদ্দিন : চারটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক, ‘লাভ বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা—এক সংগ্রাম...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : মাসের শেষ দিকে সংসারের খরচ মেলাতে গিয়ে অনেক সরকারি কর্মচারীকেই হিমশিম খেতে হয়। বাড়িভাড়া, সন্তানদà§...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তায় প্রতিদিনের যানজট, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, বর্জ্যের স্তূপ আà...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : সকালে সংবাদ সংগ্রহে বের হন একজন সাংবাদিক। মানুষের কথা, সমাজের সংকট আর অনিয়ম-অসংগতি তুলে ধরাই তাঁর à¦...বিস্তারিত
মো. আরফান উদ্দীন : পৃথিবীর আর কোন দেশে বাংলাদেশের মতো প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় এত মানুষের প্রাণহানি ঘটে কি না, তা আমার...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : একটি গিটার কখনো কখনো শুধু বাদ্যযন্ত্র থাকে না—হয়ে ওঠে একটি সময়ের কণ্ঠস্বর। বাংলাদেশের ব্যান্ডস...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited