শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৮:৫৫ পিএম, ২০২৬-০৭-০৮
একটি রাষ্ট্রের সভ্যতার অন্যতম মানদণ্ড তার স্বাস্থ্যব্যবস্থা। কারণ একজন মানুষ যখন জীবনের সবচেয়ে অসহায় মুহূর্তে পৌঁছান, তখন তাঁর শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠেন একজন চিকিৎসক। সেই চিকিৎসকের হাতে তিনি তুলে দেন নিজের জীবন, নিজের স্বজনের জীবন, নিজের সর্বশেষ বিশ্বাস। তাই চিকিৎসা কেবল একটি পেশা নয়; এটি মানবিকতা, নৈতিকতা, বিজ্ঞান এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য সমন্বয়।
প্রাচীনকাল থেকেই চিকিৎসকদের বলা হয় মানুষের জীবনরক্ষার সৈনিক। যুগে যুগে অসংখ্য চিকিৎসক ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মহামারি, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অজানা রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁদের অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতেও হাজারো নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক প্রতিদিন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সীমিত অবকাঠামো, অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং নানাবিধ প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছেন। তাঁদের অবদান অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
কিন্তু এই বাস্তবতার পাশাপাশি আরেকটি বাস্তবতাও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্যসেবাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম, নাগরিক আলোচনায় বারবার উঠে আসছে চিকিৎসাসেবার ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ফলো-আপ ফি, ওষুধের মূল্য, প্রেসক্রিপশন পদ্ধতি, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ভূমিকা এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন। অভিযোগগুলোর সবই যে সত্য, তা নয়; আবার সবই যে ভিত্তিহীন, তাও বলা যায় না। ফলে প্রশ্নটি আজ আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
চিকিৎসা যেভাবে সেবার প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, সেখানে যদি বাণিজ্যিকতার অভিযোগ বারবার সামনে আসে, তবে দায় কার?
এই প্রশ্নের উত্তর কোনো এক ব্যক্তি, কোনো এক পেশা কিংবা কোনো এক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শুধু চিকিৎসকদের দোষারোপ করলেই বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র উঠে আসে না। একইভাবে শুধু হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওষুধ কোম্পানি কিংবা সরকারের ব্যর্থতার কথা বললেও সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যায় না। বরং দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, জবাবদিহির অভাব, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, কিছু অসাধু ব্যক্তির অনৈতিক আচরণ এবং রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নে ঘাটতি—সব মিলিয়েই এই সংকটের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, টিকাদান কর্মসূচি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে, দেশীয় ওষুধশিল্প ব্যাপক উন্নতি করেছে এবং চিকিৎসাসেবার পরিধিও বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে দেশে দুই শতাধিক কার্যকর ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে; নিবন্ধিত ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে সংখ্যাটি প্রায় তিন শতাধিকের কাছাকাছি। সরকার পরিচালিত একমাত্র ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হলো Essential Drugs Company Limited। অন্যদিকে Square Pharmaceuticals, Incepta Pharmaceuticals, Beximco Pharmaceuticals, Renata PLC এবং Popular Pharmaceuticals-এর মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠান শুধু দেশের চাহিদাই পূরণ করছে না, বিশ্বের বহু দেশেও ওষুধ রপ্তানি করছে। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের গর্ব।
কিন্তু এই সাফল্যের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ঘিরে জনআস্থার সংকট কেন তৈরি হচ্ছে—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার শক্তি কেবল আধুনিক হাসপাতাল, উন্নত যন্ত্রপাতি বা ওষুধশিল্পের প্রবৃদ্ধিতে নয়; প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে রোগীর বিশ্বাসে। আর সেই বিশ্বাসে যখন ফাটল ধরে, তখন পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সুতরাং এখন সময় এসেছে আবেগ নয়, বাস্তবতার আলোকে স্বাস্থ্যখাতের শক্তি ও দুর্বলতা—উভয়কেই নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করার। অনিয়ম যেখানে আছে, সেখানে সংস্কার; আর যেখানে সততা ও সাফল্য আছে, সেখানে যথাযথ স্বীকৃতি—এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই পারে স্বাস্থ্যসেবাকে আবার মানুষের আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে।
রোগীর অভিযোগ, স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাস্তবতা:
স্বাস্থ্যসেবাকে ঘিরে সাধারণ মানুষের যে অভিযোগগুলো সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তার শুরুই হয় চিকিৎসকের সাক্ষাৎ পাওয়ার সংগ্রাম দিয়ে। অনেক জনপ্রিয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সিরিয়াল নির্ধারিত ফোন নম্বরে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক রোগীর অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, নিয়মিত প্রক্রিয়ায় সিরিয়াল না মিললেও কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সহকারী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে দ্রুত সিরিয়াল নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। যদি কোথাও এমন অনিয়ম ঘটে থাকে, তবে তা শুধু রোগীদের মধ্যে বৈষম্যই সৃষ্টি করে না, স্বাস্থ্যসেবার ন্যায়সংগত প্রাপ্তির নীতিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। একজন রোগীর চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার কখনোই তাঁর আর্থিক সক্ষমতা বা পরিচিতির ওপর নির্ভর করতে পারে না।
এরপর আসে ভিজিট ফির প্রসঙ্গ। চিকিৎসকদের ফি নির্ধারণে তাঁদের দীর্ঘ শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই ফি যখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন চিকিৎসাসেবা একটি মৌলিক অধিকার থেকে ধীরে ধীরে ব্যয়বহুল পণ্যে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আরও বেশি প্রশ্ন ওঠে তখন, যখন একই রোগের ধারাবাহিক চিকিৎসার অংশ হিসেবে কেবল পরীক্ষার রিপোর্ট দেখানোর জন্যও রোগীকে আবার পূর্ণ ভিজিট ফি দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক দিনের ব্যবধানে একই চিকিৎসকের কাছে গিয়ে একই রোগের অগ্রগতি জানাতেও নতুন করে পুরো ফি দিতে হওয়ায় রোগীরা আর্থিক চাপে পড়েন। ফলো-আপ ভিজিটের ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ ও যৌক্তিক নীতিমালা প্রণয়ন সময়ের দাবি।
অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভিযোগও বহু বছরের। অনেক রোগীর অভিজ্ঞতা, সামান্য অসুস্থতার ক্ষেত্রেও দীর্ঘ তালিকার পরীক্ষা লিখে দেওয়া হয়। অবশ্য আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম এবং অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা অপরিহার্য। কিন্তু চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া যদি অতিরিক্ত পরীক্ষা করানো হয়, তবে তা রোগীর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায় এবং চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি করে। তাই প্রতিটি পরীক্ষার পেছনে সুস্পষ্ট চিকিৎসাগত যুক্তি থাকা প্রয়োজন।
এই অভিযোগের সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও প্রায়ই উঠে আসে—ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে কমিশনভিত্তিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ। বহু বছর ধরে জনপরিসরে এই অভিযোগ আলোচিত হলেও, যেখানেই এমন অনৈতিক চর্চা প্রমাণিত হবে, সেখানে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে এটিও নিশ্চিত করতে হবে যে, সৎ ও নীতিবান চিকিৎসক কিংবা মানসম্পন্ন ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠান যেন কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হন। অনিয়মকারীদের দায় কখনোই পুরো খাতের ওপর চাপানো উচিত নয়।
রোগীদের আরেকটি বহুল আলোচিত অভিযোগ হলো, একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে অন্য চিকিৎসকের কাছে গেলে পূর্বে করা পরীক্ষার ফল অনেক সময় গ্রহণ করা হয় না। অনেককে অন্য একটি নির্দিষ্ট ল্যাবরেটরি থেকে একই পরীক্ষা পুনরায় করিয়ে আনতে বলা হয়। অবশ্য পরীক্ষার মান নিয়ে যৌক্তিক সন্দেহ, রোগের অবস্থার পরিবর্তন বা সময়ের ব্যবধান থাকলে পুনরায় পরীক্ষা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া একই পরীক্ষা বারবার করানো রোগীর সময়, অর্থ ও মানসিক শক্তির অপচয় ঘটায়। তাই পরীক্ষার মান নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড চালু করা এখন সময়ের দাবি।
ওষুধ কোম্পানির প্রভাব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে উপঢৌকন, আর্থিক প্রণোদনা বা অন্যান্য সুবিধার বিনিময়ে নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ প্রেসক্রাইব করার অভিযোগ জনপরিসরে আলোচিত। অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া এবং কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন সব সময় রোগীর সর্বোত্তম চিকিৎসাগত স্বার্থের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত।
ওষুধের মূল্য নিয়েও সাধারণ মানুষের অসন্তোষ কম নয়। একই কার্যকর উপাদান (জেনেরিক), একই মাত্রা এবং একই মানদণ্ড পূরণকারী একাধিক ব্র্যান্ডের ওষুধের দামে অনেক সময় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। কিন্তু বেশি দাম মানেই যে ওষুধের গুণগত মান বা কার্যকারিতা বেশি—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। একটি ওষুধের মান নির্ভর করে উৎপাদনের গুণগত মান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকির ওপর। তাই রোগীর চিকিৎসাগত প্রয়োজন, নিরাপত্তা ও আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় যৌক্তিক ও সাশ্রয়ী ওষুধ ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে জেনেরিক প্রেসক্রিপশনকে উৎসাহিত করা হলে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
দায় স্বীকার, সংস্কারের পথ ও আস্থা পুনর্গঠন:
তবে স্বাস্থ্যসেবা খাতের সব সমস্যার দায় চিকিৎসকদের কাঁধে চাপিয়ে দিলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ আড়াল হয়ে যায়। বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলো দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট, শয্যার অপ্রতুলতা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। একজন চিকিৎসককে অনেক সময় অল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক সংখ্যক রোগী দেখতে হয়। এমন বাস্তবতায় প্রত্যেক রোগীকে কাঙ্ক্ষিত সময় ও মনোযোগ দেওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। ফলে অনেক ভুল বোঝাবুঝি ও অসন্তোষেরও জন্ম নেয়।
একইভাবে দেশের সব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরীক্ষার মানও সমান নয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা হলেও অন্য কিছু প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাই মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার গড়ে তোলা, নিয়মিত অডিট, আধুনিক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রোগী যেন নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ফল পান, সেটিই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
অন্যদিকে, রোগীরও দায়িত্ব রয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ যথাযথভাবে অনুসরণ করা, নিজ সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ না করা, চিকিৎসার ইতিহাস গোপন না করা, প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ সেবন করা এবং অকারণে এক চিকিৎসক থেকে অন্য চিকিৎসকের কাছে ছুটে বেড়ানোর প্রবণতা কমানো চিকিৎসার সফলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক ও রোগী—উভয়ের পারস্পরিক আস্থা ছাড়া একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে ওঠে না।
তাহলে প্রশ্নটি আবারও ফিরে আসে—চিকিৎসা যে মানবসেবার প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, সেখানে বাণিজ্যিকতার অভিযোগ কেন? দায় কার?
এই প্রশ্নের উত্তর একক নয়। যেখানে নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, সেখানে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। যেখানে জবাবদিহি অনুপস্থিত, সেখানে স্বার্থের সংঘাত বাড়ে। যেখানে রোগীর অধিকার সুরক্ষিত নয়, সেখানে অসন্তোষ জন্ম নেয়। আর যেখানে নৈতিকতার চেয়ে মুনাফা বেশি গুরুত্ব পায়, সেখানে সেবা ধীরে ধীরে পণ্য হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই এই সংকটের দায় যেমন সম্মিলিত, তেমনি সমাধানও হতে হবে সম্মিলিত।
এখন সময় এসেছে স্বাস্থ্য খাতে কিছু মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নের। প্রথমত, চিকিৎসকদের ভিজিট ফি ও ফলো-আপ ফির জন্য একটি স্বচ্ছ ও যৌক্তিক নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা পুরোপুরি ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে, যাতে কোনো রোগী বৈধ প্রক্রিয়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে সিরিয়াল নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব না করেন। তৃতীয়ত, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মান নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। চতুর্থত, কমিশনভিত্তিক যেকোনো অনৈতিক চর্চার বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, চিকিৎসকদের স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। ষষ্ঠত, জেনেরিক প্রেসক্রিপশনকে উৎসাহিত করতে হবে এবং রোগীকে সাশ্রয়ী বিকল্প সম্পর্কে জানার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সপ্তমত, জাতীয় পর্যায়ে ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড চালু করা প্রয়োজন, যাতে অপ্রয়োজনে একই পরীক্ষা বারবার করতে না হয়। অষ্টমত, রোগীর অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও প্রতিকারের জন্য স্বাধীন ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, স্বাস্থ্যসেবাকে কেবল চিকিৎসক, হাসপাতাল বা ওষুধ কোম্পানির বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি রাষ্ট্র, নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, চিকিৎসক, ওষুধশিল্প, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং রোগী—সবার সম্মিলিত দায়িত্বের ক্ষেত্র। যে কোনো এক পক্ষের ব্যর্থতা পুরো ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অর্জন কম নয়। দেশীয় ওষুধশিল্প আজ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করছে, দক্ষ চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। তাই এই খাতকে সন্দেহের নয়, আস্থার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। অনিয়ম থাকলে তা সাহসের সঙ্গে চিহ্নিত করতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে সৎ, দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসকদের সম্মানও অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে, হাসপাতালের দরজায় যে মানুষটি আসেন, তিনি একজন "রোগী" হওয়ার আগে একজন বাবা, মা, সন্তান, স্বামী, স্ত্রী কিংবা প্রিয়জন। তাঁর হাতে থাকে চিকিৎসার খরচ জোগাতে বিক্রি করা জমির দলিল, ধার করা টাকা কিংবা শেষ সঞ্চয়। তাই চিকিৎসার প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষ—মুনাফা নয়; সহমর্মিতা—উদাসীনতা নয়; নৈতিকতা—স্বার্থ নয়।
যেদিন একজন রোগী হাসপাতালের দরজায় দাঁড়িয়ে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন, "আমি এখানে একজন মানুষ হিসেবে মূল্য পাব, একটি আয়-উৎস হিসেবে নয়"—সেদিনই আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে মানবসেবার মর্যাদা অর্জন করবে। আর সেদিনই চিকিৎসা আবার তার প্রকৃত পরিচয়ে ফিরে আসবে—মানবতার সবচেয়ে মহৎ পেশা হিসেবে।
লেখক : সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আলেয়া মান্নান প্রিয়, তুমি একটি বার ভালোবেসে যেও। ব্যস্ততার পরে একবার অবসর করে আসিও...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার ডিজিটাল যুগে একটি ভিডিও কখনো কখনো হাজার বক্তৃতার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। কয়...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : সমকালীন বাংলা কবিতায় এমন কিছু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যেগুলো কেবল কবিতার সংকলন নয়; বরং সময়, স...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র ব...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : একসময় একটি চাকরি মানেই ছিল একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, স্বস্তি ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। মাস ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে যেমন প্রকাশ করে, তেমনি মানুষের মানবিকতা, রাষ্ট্...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited