বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬  

শিরোনাম

ত্রাণ বিতরণে নৈতিকতার প্রশ্ন

আবদুল্লাহ মজুমদার :    |    ০৪:৪৪ পিএম, ২০২৬-০৭-১৮

ত্রাণ বিতরণে নৈতিকতার প্রশ্ন

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে যেমন প্রকাশ করে, তেমনি মানুষের মানবিকতা, রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা এবং সমাজের নৈতিক অবস্থানকেও পরীক্ষার মুখে দাঁড় করায়। বন্যা, পাহাড়ি ঢল, ঘূর্ণিঝড় কিংবা নদীভাঙনে যখন হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে, তখন তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠে মানুষের সহমর্মিতা। সেই সহমর্মিতারই বাস্তব প্রকাশ হলো ত্রাণ কার্যক্রম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ত্রাণ বিতরণকে ঘিরে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে মানবিকতার চেয়ে প্রচার, দায়িত্ববোধের চেয়ে আত্মপ্রদর্শন এবং সেবার চেয়ে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ অনেক ক্ষেত্রেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবার নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রায়ই এমন দৃশ্য দেখি, যেখানে ত্রাণ বিতরণের আগে ক্যামেরা প্রস্তুত হয়, ভিডিও ধারণের আয়োজন করা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, তারপর শুরু হয় ছবি ও ভিডিও প্রকাশের প্রতিযোগিতা। যেন ত্রাণের প্রকৃত উদ্দেশ্য ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া নয়, বরং কে কত বেশি প্রচার পেলেন, সেটিই হয়ে ওঠে মুখ্য বিষয়।

আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে 'ভিউ', 'লাইক' ও 'শেয়ার' যেন অনেকের কাছে মানবিকতার নতুন পরিমাপক। একটি খাদ্যের প্যাকেট, কয়েক বোতল বিশুদ্ধ পানি বা কিছু শুকনো খাবার বিতরণ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রচারণা চালানো হয়। এতে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—এটি কি সত্যিই মানবসেবা, নাকি আত্মপ্রচারের আরেকটি কৌশল?
এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও অনেক সময় একই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কোথাও সামান্য ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেও বিশাল ব্যানার, ফেস্টুন, মাইকিং, সংবাদ সম্মেলন কিংবা দীর্ঘ ফটোসেশনের আয়োজন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ত্রাণের পরিমাণের চেয়ে প্রচারের পরিমাণই বড় হয়ে ওঠে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ও অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়।

ত্রাণ গ্রহণকারী মানুষটি কোনো অনুষ্ঠানের অতিথি নন; তিনি একজন বিপর্যস্ত নাগরিক। তার অসহায় মুহূর্তকে ক্যামেরাবন্দী করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া কতটা নৈতিক, সে প্রশ্নের উত্তর আমাদের বিবেককেই দিতে হবে। মানুষের দারিদ্র্য, ক্ষুধা কিংবা দুর্দশা কখনোই প্রচারের উপকরণ হতে পারে না। মানবিক সহায়তা এমনভাবে দেওয়া উচিত, যাতে উপকারভোগীর সম্মান ও ব্যক্তিগত মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে।

আমাদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাও একই কথা বলে। ইসলামে গোপনে দান করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ দানের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং মানুষের কষ্ট লাঘব করা, নিজের পরিচিতি বৃদ্ধি করা নয়। অন্যান্য ধর্ম ও মানবিক দর্শনেও দানের ক্ষেত্রে বিনয়, আন্তরিকতা এবং আত্মপ্রচারের বিরোধিতা করা হয়েছে। তাই দানের সঙ্গে অহংকার, প্রদর্শন কিংবা রাজনৈতিক প্রচার যুক্ত হলে তার মানবিক মূল্য অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়।

তবে একটি বিষয়ও স্বীকার করতে হবে—সব ধরনের ছবি বা তথ্য প্রকাশ অপ্রয়োজনীয় নয়। সরকারি অর্থ কিংবা জনসাধারণের অনুদানে পরিচালিত ত্রাণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মানুষ জানতে চাইবে তাদের দেওয়া অর্থ কোথায় ব্যয় হলো, কতজন উপকৃত হলো এবং কীভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হলো। কিন্তু স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নামে আত্মপ্রচার কিংবা উপকারভোগীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার কোনো সুযোগ নেই। তথ্য প্রকাশ আর প্রচারণা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এই সীমারেখা স্পষ্টভাবে বজায় রাখতে হবে।

দুর্যোগের সময় আরেকটি অস্বস্তিকর চিত্রও প্রায়ই দেখা যায়। ত্রাণ বিতরণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কে আগে গেল, কে বেশি প্যাকেট বিতরণ করল, কার ব্যানার বড়, কার ছবি বেশি প্রচার হলো—এসব বিষয় যেন মূল আলোচনায় চলে আসে। অথচ দুর্যোগ কোনো রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের পরিচয় দেখে আসে না। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরও তখন কোনো দলীয় পরিচয় থাকে না; থাকে শুধু বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তাই দুর্যোগকে রাজনৈতিক প্রচারণার মঞ্চে পরিণত করা শুধু অনৈতিকই নয়, অমানবিকও।

এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রতি বছর একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছি না? বন্যা এলেই ত্রাণ, পানি নামলেই সব ভুলে যাওয়া—এই চক্র কত দিন চলবে? দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নদী ও খালের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো এবং আগাম প্রস্তুতির ওপর যতটা গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, বাস্তবে তা খুব কমই দেখা যায়। ফলে প্রতিবছর একই মানুষ একই দুর্ভোগের শিকার হন, আর আমরা প্রতিবছর একই ধরনের ত্রাণ বিতরণের ছবি দেখি।

এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। দুর্যোগ মোকাবিলা শুধু ত্রাণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। উদ্ধার, পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ, কর্মসংস্থান, কৃষকের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর কার্যকর উদ্যোগই হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় নীতির মূল ভিত্তি। ত্রাণ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু টেকসই সমাধান দিতে পারে না।

রাজনৈতিক দলগুলোরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। বিরোধী দল হোক কিংবা ক্ষমতাসীন দল—দুর্যোগের সময় সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবন রক্ষা করা। কে কত বেশি প্রচার পেল, সেই প্রতিযোগিতা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; বরং জনগণের আস্থা দুর্বল করে। দুর্যোগের সময় রাজনৈতিক সহমর্মিতা ও জাতীয় ঐক্যের যে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হওয়ার কথা, বাস্তবে অনেক সময় তার পরিবর্তে দেখা যায় প্রচারের প্রতিযোগিতা।

একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও দায়িত্ব রয়েছে। মানুষের অসহায়ত্বকে 'কনটেন্ট' বানিয়ে ভিউ বাড়ানোর প্রবণতা সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। একজন ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে খাবার তুলে দেওয়ার মুহূর্তটি যদি শুধুই ভিডিও নির্মাণের উপাদান হয়ে যায়, তাহলে সেখানে মানবিকতার চেয়ে বাজারজাতকরণের প্রবণতাই বেশি কাজ করছে। এই সংস্কৃতি যত বাড়বে, নিঃস্বার্থ মানবসেবার চর্চা ততই কমে যাবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, দানের প্রকৃত মূল্য তার পরিমাণে নয়; বরং দাতার আন্তরিকতা, বিনয় এবং দায়িত্ববোধে। অল্প দানও মহৎ হতে পারে, যদি তা নিঃস্বার্থভাবে করা হয়। আবার বিপুল ত্রাণও মানবিক মূল্য হারাতে পারে, যদি তার উদ্দেশ্য হয় আত্মপ্রচার বা রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন।

আজ প্রয়োজন ত্রাণের নতুন সংস্কৃতি নয়, মানবিকতার পুরোনো মূল্যবোধে ফিরে যাওয়া। প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষ প্রচারের জন্য নয়, বিবেকের তাড়নায় মানুষের পাশে দাঁড়াবে; যেখানে ত্রাণের প্যাকেটের চেয়ে মানুষের মর্যাদা বড় হবে; যেখানে ক্যামেরার ফ্ল্যাশের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল হবে সহমর্মিতার আলো।

দুর্যোগে আক্রান্ত মানুষের কষ্ট কখনোই রাজনৈতিক পুঁজি, সামাজিক জনপ্রিয়তা কিংবা ডিজিটাল ভিউ বাড়ানোর উপকরণ হতে পারে না। মানবিক সহায়তার সর্বোচ্চ সৌন্দর্য নীরবতায়, আন্তরিকতায় এবং দায়িত্বশীলতায়। আমাদের নৈতিকতা, ধর্মীয় শিক্ষা এবং সামাজিক মূল্যবোধ—সবই সেই পথের দিকনির্দেশনা দেয়। এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সেই পথেই হাঁটব, নাকি মানবিকতার জায়গা দখল করে নিতে দেব আত্মপ্রচার, প্রতিযোগিতা ও রাজনীতিকে?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কতটা মানবিক, কতটা দায়িত্বশীল এবং কতটা নৈতিক হবে।

লেখক : সাংবাদিক, সংগঠক ও সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।

রিটেলেড নিউজ

যেও ভালোবেসে

যেও ভালোবেসে

আমাদের বাংলা ডেস্ক : :   আলেয়া মান্নান   প্রিয়, তুমি একটি বার ভালোবেসে যেও।   ব্যস্ততার পরে একবার অবসর করে আসিও...বিস্তারিত


যখন রাজনীতির অস্ত্র ভাইরাল ভিডিয়ো

যখন রাজনীতির অস্ত্র ভাইরাল ভিডিয়ো

আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার  ডিজিটাল যুগে একটি ভিডিও কখনো কখনো হাজার বক্তৃতার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। কয়...বিস্তারিত


যেখানে রাত্রি লিখে সময়ের ইতিহাস সারাফ নাওয়ার -এর রাত্রির ভাটলিপি 

যেখানে রাত্রি লিখে সময়ের ইতিহাস সারাফ নাওয়ার -এর রাত্রির ভাটলিপি 

আবদুল্লাহ মজুমদার : : সমকালীন বাংলা কবিতায় এমন কিছু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যেগুলো কেবল কবিতার সংকলন নয়; বরং সময়, স...বিস্তারিত


ম্যান্ডেলার শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক অনিবার্য পাঠ

ম্যান্ডেলার শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক অনিবার্য পাঠ

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র ব...বিস্তারিত


একটি চাকরিতে আর সংসার চলে না: মূল্যস্ফীতি, কর্মসংকট ও নতুন দারিদ্র্যের অশনিসংকেত

একটি চাকরিতে আর সংসার চলে না: মূল্যস্ফীতি, কর্মসংকট ও নতুন দারিদ্র্যের অশনিসংকেত

আবদুল্লাহ মজুমদার : : একসময় একটি চাকরি মানেই ছিল একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, স্বস্তি ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। মাস ...বিস্তারিত


চিকিৎসাসেবা বাণিজ্যের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ: দায় কার?

চিকিৎসাসেবা বাণিজ্যের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ: দায় কার?

আবদুল্লাহ মজুমদার : : একটি রাষ্ট্রের সভ্যতার অন্যতম মানদণ্ড তার স্বাস্থ্যব্যবস্থা। কারণ একজন মানুষ যখন জীবনের সবচেয়...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

নোয়াখালী প্রতিনিধি : : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্তার অ...বিস্তারিত


সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : সৌদি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, স্পীড লিমিট এর চাইতে অধিক গতিতে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের উপ...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর