শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০১:০১ পিএম, ২০২৬-০৭-২৫
আবদুল্লাহ মজুমদার
ডিজিটাল যুগে একটি ভিডিও কখনো কখনো হাজার বক্তৃতার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও মুহূর্তেই লাখো মানুষের মোবাইল ফোনে পৌঁছে যায়, জনমতকে প্রভাবিত করে, একজন মানুষের সুনাম ধুলিসাৎ করতে পারে, আবার কখনো সত্য-মিথ্যার সীমারেখাকেও ঝাপসা করে দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতানেত্রীর ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর বলে প্রচারিত ভিডিও ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা কেবল কয়েকটি ভাইরাল ঘটনার গল্প নয়; এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার সামনে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন।
এ ঘটনাকে কেবল বিচ্ছিন্ন সাইবার অপরাধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে প্রযুক্তির অপব্যবহার, রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয় এবং সামাজিক মানসিকতার সংকটের বহিঃপ্রকাশ। রাজনীতি যখন নীতি, আদর্শ ও কর্মসূচির পরিবর্তে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংঘাতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সহজতম অস্ত্র হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত জীবন। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে কাজ করে যে তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণের তুলনায় বিতর্কিত, চাঞ্চল্যকর ও কেলেঙ্কারিমূলক কনটেন্ট অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে একটি ভিডিও মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, অথচ তার সত্যতা যাচাই অনেক সময় পেছনে পড়ে থাকে।
প্রযুক্তির এই যুগে আরেকটি বাস্তবতা সামনে এসেছে—চোখে দেখা সবকিছুই সত্য নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিডিও, ছবি এমনকি কণ্ঠস্বরও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে জাল করা সম্ভব। ফলে কোনো ভিডিও ভাইরাল হওয়ার অর্থ এই নয় যে সেটি সত্য। আবার কেবল বিতর্ক এড়ানোর জন্য প্রতিটি ভিডিওকে ভুয়া বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সত্য নির্ধারণের দায়িত্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নয়; সেটি প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে হবে। আইনের শাসনের মূল দর্শনই হলো—বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, জনমতের চাপে নয়।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা রয়েছে। কোনো জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ব্যক্তিগত আচরণ তখনই জনস্বার্থের বিষয় হয়ে ওঠে, যখন তা দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নির্বাচনী অনিয়ম, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে অবহেলা কিংবা অন্য কোনো অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। সে ক্ষেত্রে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও আইনি তদন্ত অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু কেবল জনকৌতূহল মেটানো, প্রতিপক্ষকে অপদস্থ করা কিংবা ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে কারও ব্যক্তিগত ভিডিও গোপনে ধারণ, সম্পাদনা বা প্রচার করা কোনোভাবেই জনস্বার্থ নয়; বরং তা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং আইনের শাসনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রবণতা কেবল ভিডিও নির্মাতা বা প্রচারকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সমাজের একাংশও অজান্তেই এর অংশীদার হয়ে উঠছে। যাচাই-বাছাই ছাড়াই ভিডিও শেয়ার করা, মন্তব্য করা কিংবা আরও ছড়িয়ে দেওয়া অনেকের কাছে যেন বিনোদন বা রাজনৈতিক অবস্থান জানানোর একটি সহজ মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ প্রতিটি শেয়ার একটি সম্ভাব্য চরিত্রহনন, একটি পরিবারের সামাজিক বিপর্যয় কিংবা একটি সংঘবদ্ধ সাইবার অপরাধচক্রের সাফল্যে পরিণত হতে পারে। অর্থাৎ প্রযুক্তির অপব্যবহারের পাশাপাশি আমাদের ডিজিটাল নৈতিকতার দুর্বলতাও এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু আইন কঠোর করাই যথেষ্ট নয়; আইন হতে হবে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর। গোপনে ভিডিও ধারণ, সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রকাশ, ডিপফেক তৈরি এবং ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তদন্তকারী সংস্থার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা দ্রুত সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে। অভিযোগের তদন্ত ও বিচার যেন রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বা জনচাপের ভিত্তিতে নয়, বরং সবার জন্য একই আইনি মানদণ্ডে পরিচালিত হয়—এ বিশ্বাসও রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ক্ষতিকর ও আইনবিরোধী কনটেন্ট দ্রুত অপসারণে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনস্বার্থ এবং জনকৌতূহল এক বিষয় নয়। তাই যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো ভিডিও প্রচার করা যেমন দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিপন্থী, তেমনি প্রকৃত জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য গোপন করাও গণমাধ্যমের দায়িত্ব নয়। একইভাবে এ ধরনের অপরাধ দমনের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ সংকুচিত করা হলে সেটিও গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হবে। প্রয়োজন স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ভারসাম্য।
একটি সভ্য সমাজকে চেনা যায় সে কীভাবে সত্যের অনুসন্ধান করে, কীভাবে ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা করে এবং কীভাবে ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করে—তার মাধ্যমে। প্রযুক্তি আমাদের হাতে অভূতপূর্ব শক্তি তুলে দিয়েছে; সেই শক্তি সত্য উদ্ঘাটনের হাতিয়ার হবে, নাকি চরিত্রহননের অস্ত্র—সিদ্ধান্তটি আমাদেরই। যদি রাজনীতি নীতির পরিবর্তে কেলেঙ্কারির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং জনআলোচনা যুক্তির পরিবর্তে ভাইরাল ভিডিওকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, নাগরিকের পারস্পরিক আস্থা এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি। তাই এখনই সময় এমন একটি ডিজিটাল ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার, যেখানে সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, মতপার্থক্য নির্ধারিত হবে যুক্তির আলোকে এবং মানুষের মর্যাদা ও ব্যক্তিগত অধিকার সুরক্ষিত থাকবে আইনের নিরপেক্ষ আশ্রয়ে।
লেখক: সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও সাহিত্যিক।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : জাতীয় পরিচয়পত্র একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান দলিল। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নাগর...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ভাত আমাদের খুব আপন। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় তার উপস্থিতি এত স্বাভাবিক যে, ভাত নিয়ে আলাদা করে ভা...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার রাত গভীর। চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ঘুম ভেঙে দরজা খুললেন মা। ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট। ঢাকার মাটিতে থেমে গেল কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের পথচলা। যে কবি একদিন অন্যায়ের ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : কোনো কোনো কণ্ঠ শুধু গান গায় না, একটি সময়কে ধারণ করে। আবদুর রহমান বয়াতীর কণ্ঠ ছিল তেমনই—মাটির গন্ধ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ফল প্রকাশের পর মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে কয়েকটি সংখ্যা। কারও জন্য সেই সংখ্যা আনন্দের, কারও জন্য হতা...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited