শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৬:২১ পিএম, ২০২৬-০৮-২৯
আবদুল্লাহ মজুমদার
রাত গভীর। চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ঘুম ভেঙে দরজা খুললেন মা। কিন্তু দরজার ওপাশে সন্তান নেই। নেই কোনো খবর, নেই কোনো ব্যাখ্যা। শুধু পড়ে আছে দীর্ঘ অপেক্ষা। সকাল গড়িয়ে রাত হয়, রাত পেরিয়ে আসে আরেক সকাল। দিন যায়, মাস যায়, বছরও পেরিয়ে যায়—তবু প্রিয় মানুষটি আর ফিরে আসে না। গুমের যন্ত্রণা এখানেই—মৃত্যুর মতো নিশ্চিত কোনো সমাপ্তি নেই, আছে শুধু অনিশ্চয়তা, উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষা। ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আমাদের সেই অপেক্ষারত মানুষগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।
জোরপূর্বক অন্তর্ধান বা গুম শুধু একজন মানুষের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার কেড়ে নেয় না; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে পরিবার থেকে সমাজে। মানুষটি কোথায় আছেন, তিনি জীবিত কি না, তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে স্বজনেরা আটকে থাকেন এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তায়। মৃত্যু অন্তত একটি পরিণতি নিশ্চিত করে; গুম রেখে যায় অনন্ত অপেক্ষা।
বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর হিসাবে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত অন্তত ৭০৮টি জোরপূর্বক অন্তর্ধানের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। এই হিসাবটি ছিল বিভিন্ন সময়ে নথিভুক্ত অভিযোগের ভিত্তিতে তৈরি একটি হিসাব। পরবর্তী সময়ে গুমের অভিযোগ তদন্তে রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠিত হলে সামনে আসে আরও বড় চিত্র।
তদন্ত কমিশনে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে জোরপূর্বক অন্তর্ধান হিসেবে চিহ্নিত করে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনা ‘নিখোঁজ ও মৃত’ শ্রেণিতে পড়ে। আর ১ হাজার ২৮২ জন বিভিন্ন সময় ফিরে এসেছেন বলে কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, একটি পরিবার, কিছু স্বপ্ন এবং একটি অসমাপ্ত গল্প। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কমিশন মনে করছে নথিভুক্ত সংখ্যার বাইরেও প্রকৃত গুমের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। অর্থাৎ সামনে আসা হিসাবটিই হয়তো পুরো বাস্তবতার শেষ কথা নয়।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা দরকার—অভিযোগ আর অপরাধ প্রমাণ এক বিষয় নয়। কোনো অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত। সেই তদন্তের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে কে দায়ী, কী ঘটেছিল এবং কোন পর্যায়ে কার ভূমিকা ছিল। কোনো নাগরিক অপরাধ করলে তাঁকে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে; কিন্তু কাউকে গোপনে তুলে নিয়ে তাঁর অবস্থান অজানা রাখা আইনের শাসনের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রাষ্ট্রের শক্তি নাগরিককে ভয় দেখানোর মধ্যে নয়; নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যেই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর মানুষের আস্থা তখনই তৈরি হয়, যখন মানুষ বিশ্বাস করে—অন্যায় হলে প্রতিকার মিলবে, অভিযোগের তদন্ত হবে এবং অপরাধীর পরিচয় বা ক্ষমতা বিবেচনা না করে বিচার হবে।
গুমের সবচেয়ে গভীর ক্ষত তৈরি হয় পরিবারে। একজন নিখোঁজ ব্যক্তির স্ত্রী বছরের পর বছর স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় থাকেন। সন্তান বাবাকে ছাড়াই বড় হয়। মা প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। কেউ জানেন না প্রিয় মানুষটি কোথায়, কী অবস্থায় আছেন, তাঁর কী পরিণতি হয়েছে। এমন অনিশ্চয়তার যন্ত্রণা কোনো আদালতের রায় দিয়েও সহজে মুছে ফেলা যায় না।
তাই গুমের বিচার মানে শুধু অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা নয়; ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছেও সত্য পৌঁছে দেওয়া। কী ঘটেছিল, কারা দায়ী এবং তাঁদের স্বজনের পরিণতি কী হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার তাঁদের রয়েছে। সত্যকে আড়াল করে কোনো সমাজ দীর্ঘমেয়াদে শান্তি ও আস্থা ফিরে পেতে পারে না।
এখানে রাষ্ট্র ও সরকারের পার্থক্যটিও মনে রাখা জরুরি। সরকার বদলায়, রাষ্ট্র থাকে। তাই কোনো সরকারের আমলে সংঘটিত গুমের অভিযোগকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব হলো অতীতের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করা, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো, সত্য প্রকাশ করা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার জরুরি। কোনো সরকার, কোনো বাহিনী কিংবা কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি যেন আইনের ঊর্ধ্বে উঠতে না পারে—এ নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। হেফাজতে থাকা ব্যক্তির অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি বাড়ানো এবং মানবাধিকার সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।
বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট জোরপূর্বক অন্তর্ধান থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যোগ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে এবং একই দিনে কনভেনশনটি অনুসমর্থনও করে। এই পদক্ষেপকে কেবল আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার হিসেবে দেখলে হবে না; এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটতে হবে দেশের আইন, প্রতিষ্ঠান ও বিচারব্যবস্থায়।
সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছার। গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার যদি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে পাল্টে যায়, তাহলে ন্যায়বিচার কখনো প্রতিষ্ঠিত হবে না। আজ যে অন্যায়ের বিচার চাইছি, আগামীকাল যেন একই অন্যায় আর কারও জীবনে নেমে না আসে—এই নিশ্চয়তাই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
বর্তমান সরকারের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। প্রতিশোধের রাজনীতি নয়; বরং স্বচ্ছ তদন্ত, আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ন্যায়বিচারের মাধ্যমে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। অতীতের অন্ধকারকে উন্মোচন করেই ভবিষ্যতের নিরাপদ পথ তৈরি করতে হবে।
ইতিহাসের শিক্ষা খুব পরিষ্কার—অন্যায় চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু মুছে ফেলা যায় না। সত্যকে যত দীর্ঘ সময় আড়াল করা হয়, একদিন তা তত শক্তি নিয়ে ফিরে আসে। তাই গুমের প্রতিটি অভিযোগের সত্য উদ্ঘাটন শুধু ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায় নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিও আমাদের দায়িত্ব।
৩০ আগস্ট তাই শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়। এই দিনটি যেন আমাদের সেই মায়ের মুখ মনে করিয়ে দেয়, যিনি আজও দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন; সেই সন্তানের কথা মনে করিয়ে দেয়, যে বাবার ফেরার গল্প শুনতে শুনতে বড় হয়ে গেছে; সেই স্ত্রীর কথা মনে করিয়ে দেয়, যার জীবনের একটি অধ্যায় কোনো শেষ বাক্য ছাড়াই থেমে আছে। তাঁদের অপেক্ষার কাছে রাষ্ট্রের একটি দায় আছে—সত্য জানানো, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন অন্ধকার আর ফিরে না আসার নিশ্চয়তা দেওয়া। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো মানুষকে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যেতে হবে না, কোনো পরিবারকে প্রিয়জনের ভাগ্য জানার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না। অতীতের গুমের স্মৃতি আমাদের বিবেককে জাগিয়ে রাখুক; কিন্তু সেই স্মৃতি যেন আর কোনো পরিবারের নতুন বাস্তবতা না হয়।
গুমের স্মৃতি তাই ইতিহাসের সতর্কবার্তা হয়ে থাকুক—ভবিষ্যতের বাস্তবতা হয়ে নয়।
লেখক : মহাসচিব, ট্রাস্ট অব হিউম্যান রাইটস্ বাংলাদেশ।c
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ভাত আমাদের খুব আপন। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় তার উপস্থিতি এত স্বাভাবিক যে, ভাত নিয়ে আলাদা করে ভা...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট। ঢাকার মাটিতে থেমে গেল কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের পথচলা। যে কবি একদিন অন্যায়ের ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : কোনো কোনো কণ্ঠ শুধু গান গায় না, একটি সময়কে ধারণ করে। আবদুর রহমান বয়াতীর কণ্ঠ ছিল তেমনই—মাটির গন্ধ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ফল প্রকাশের পর মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে কয়েকটি সংখ্যা। কারও জন্য সেই সংখ্যা আনন্দের, কারও জন্য হতা...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আলেয়া মান্নান প্রিয়, তুমি একটি বার ভালোবেসে যেও। ব্যস্ততার পরে একবার অবসর করে আসিও...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার ডিজিটাল যুগে একটি ভিডিও কখনো কখনো হাজার বক্তৃতার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। কয়...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited