শিরোনাম
আমাদের বাংলা ডেস্ক : | ০২:৪১ পিএম, ২০২৬-০৬-১১
মিঁঞা মুহম্মদ জামশেদ উদ্দীন
সবেমাত্র কোরবানি ঈদ গেল। সবার মনে না হলেও অধিকাংশের মনে খুশি খুশি ভাবসাব, যদিও বা সরকারি ছুটির শেষে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কাজে যোগ দিয়েছেন। ৭ জুনও সকল স্কুল-কলেজ খুলেছে। তাই মেয়ে জেন প্রাঞ্জলা জয়া তাড়াহুড়ো করে ফিরে। তার ফেরা হয় আরো কয়েকদিন আগে। ঠিক কোরবানি ঈদের দুদিন আগে শুক্রবার বিকেলে। তাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক শনিবার থেকে কোচিং নিবেন স্কুলে, তাই আগেভাগে বাসাবাড়িতে পৌঁছা। অবশ্য তাদের স্কুলের নিয়ম-কানুন একটু কড়া, সেনাবাহিনী পরিচালিত স্কুল। সবকিছু ঘড়ির কাটায় কাটায় মেনে চলতে হয়। যাক, এ দিকটাতে ভরসা রাখা যায়।
কিন্তু কথা হলো মেয়ে কোরবানি ঈদে বাড়িতে আসতে তার নানিকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে। ঘটনাটি আমার কাছে আচমকা মনে হলো ; একেতো তিনি বুড়ো-মানুষ, বয়সও সত্তরোর্ধ্ব, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে হাঁটাচলা করে, ভাতরুমে যেতে হলে একজনকে ধরে-ধরে নিয়ে যেতে হয়। বলতে গেলে, কারো সহযোগিতা ছাড়া বিছানা থেকে উঠতে পারে না। এ অবস্থায় তাকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে আসা; আমার কাছে বিষয়টি ভালো ঠেকেনি।
তাই মেয়েকে জিজ্ঞেস করে বলি, 'এভাবে কষ্ট না দিলে পারতে?' মেয়েও সোজাসাপ্টা উত্তর – 'বাবা, আমরা চলে আসতেছি তো, তাই সঙ্গে করে নিয়ে আসলাম, নানি আমাদের সাথে থাকতেন।'
আমি বললাম, কেন তোমাদের লাগোয়া বাসাতো তোমার ছোট খালার বাসা। সেও তোমার নানির মেয়ে; তাছাড়া তোমার খালার দুই মেয়ে ও সঙ্গে স্বামীও থাকে । তোমার খালা তো স্কুল শিক্ষিকা। তাহলে অসুবিধাটা কোথায়, ওখানে কয়েকদিনের জন্য রেখে আসতে পারতে শুধু শুধু টেনেহিঁচড়ে এভাবে আনার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। তাছাড়া ৫০ গজের মধ্যে তোমার এক বড়ো খালার বাড়ি, তাদেরও ছেলেপেলে, স্বামী আছে, কাছাকাছি তোমার দুই মামাও থাকে তোমার নানার বাড়িতে। এতো কাছেকিনারে নিকট আত্মীয়-স্বজন থাকতে তোমরা ভরসা পাচ্ছো না! মেয়ে বলে, নানু আমাদের সাথে থাকতে কম্পোটবেল মনে করে ; বললাম, ঠিক আছে যা ভালো মনে করেছ।
আবার ভাবি, আজকাল কাউরো ওপর ভরসা রাখা যায় না, সঙ্গে নানি থাকায় দেখেশুনে রাখছে আমার মেয়েকে, এটি আমার জন্য বড় আর্শীবাদ। এরপর অন্তর থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস আসে– মায়ের কথা মনে পড়ে। ২০০৭ সালের ১৩ মে সকাল ৫.৪৫ টায় আমাদের সকলকে ছেড়ে মা পরপারে চলে গেলেন। জীবত থাকতে মাকে নিয়ে আমাদের উৎকণ্ঠার শেষ ছিলোনা। বাবা ১৯৯৯ সালের ৪মার্চ মারা যাওয়ার পর মা আরো ভেঙে পড়েন। শরীরে অবস্থা ভালো ছিল না। তবে ভীষণভাবে ভোগেন শ্বাসকষ্টে। এতে করে তেমন একটা চলাফেরাও করতে পারতেন না। এর মধ্যে একবার পালং থেকে নিচে পড়ে হাতের হাড় ভেঙে পেলেন।
এটা নিয়ে কয়েক মাস মায়ের যন্ত্রণায় কাটে। সবশেষ এ চোট কেটে ওঠলেও ঘাতক শ্বাসকষ্ট থেকে শেষ রক্ষা পেলেন না। এমনিতে আমরা-ছেলেরা প্রতিদিনের মতো বের হয়ে পড়লে মা ঘরে থাকতেন একা। এদিকে আমি ও ছোটভাইয়ের বিয়ের বয়সও পার হয় অনেক আগে, আমার বয়স তখন ঠেকেছে চল্লিশোর্ধ্বে। আমার সাথে আমার ছোটভাইও থাকতো। আমাদের সিদ্ধান্ত হলো, মা যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন বিয়ে করবো না; কারণ হলো, যা কাছ থেকে দেখা বড় দুই ভাইয়ের বউদের অশোভনীয় আচরণে। খোদ আবার একটি বাবার হাতেনাতে ধরা খাওয়া; বাবা বড় মাফের একজন ব্যবসায়ী ও সমাজপতি ছিলেন। একদিন বাবার শরীর জ্বর জ্বর খারাপ লাগায় সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরেন। সচারাচর তিনি ওই সময় বাড়িতে আসেন না। ঠিক ওইসময় বড়োভাইয়ের বউ মায়ের সাথে চরম উদ্ধৃতপূর্ণ আচরণ করছিলেন। বাবা দীর্ঘক্ষণ আড়ালে থেকে তা প্রত্যক্ষ করেন। পরেক্ষণে তিনি ছেলের ওই বউকে ঘর থেকে বের করে দেন। এই একবার বের করাতে টানা দুই বছর কেটে গেল। তবে বাবাকে ক্ষণে ক্ষণে বলতাম, অন্তত তাদের ছেলে -মেয়েদের দিকে তাকিয়ে হলেও ক্ষমা করে দিন। না, তিনি ক্ষমা করলেন না। সর্বশেষ আমি গিয়ে একদিন চট্টগ্রাম থেকে আসার পথে নিয়ে আসি, কিন্তু ঘরে ওঠাতে পারিনি, বাবা রাজি হচ্ছিলেন না ওই ছেলের বউকে ঘরে তুলতে। আমার ভাবনা ছিল তারা পৃথক হলেও বাড়িতে সংসার করুক। এ ভাবনার কারণ হলো, ওই মহিলার বাপের বাড়ির অবস্থা অর্থনৈতিকভাবে খুবই নাজুক। এরমধ্যে তাদের বিয়ে দেয়া আরো দুই মেয়ে ঘরে এসে পড়েছে কারণে অকারণে। এমতো তাদের মাও পাগল হওয়া অবস্থা। আমাদের বড়োভাইয়ের বউও অন্যের ঘরে ঝিঁয়ের কাজ করেই প্রাণাহার করতে হচ্ছিল। এ অবস্থায় আমাকে দেখে তারা সম্ভবত মনে করে স্বর্গের দূত এসেছে–কোনোপ্রকার বাদপ্রতিবাদও করেন নি। সঙ্গে সঙ্গে বেবিট্যাক্সি করে ফেরা বড়োভাইয়ের বউকে সঙ্গে নিয়ে। অবশ্য এখন ভালোই আছে সন্তানসন্ততি নিয়ে। এ নারী ছিল বকলাম- অশিক্ষিত। অপর শিক্ষিত জনের আচরণ আরো মারাত্মক ও জঘণ্য।
একদিন মায়ের তীব্র শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। এ অবস্থায় মাকে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মেজভাইয়ের বউ কতো যে নিষ্ঠুর হলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অসুস্থ শাশুড়িকে বাসা থেকে টিফিনবক্স করে একমুঠো ভাত দিতে চরম অনীহা প্রকাশসহ বারণ করে বসে। এ নিয়ে তাদের স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘ বিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে ওই নারী বাপের বাড়ি চলে যায় শুধু ভাত দেওয়া- না দেওয়ার ঘটনায়। দেখা যায়, নিজ সন্তানদের একা রেখে এভাবে অর্ধবছর কেটে দেয়! অথচ এ নারীর একটু হলেও কালি-কলমের বান ছিল। এ চরম সত্য ও নিষ্ঠুরতা দেখে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত পাল্টায়। ভাবনায় আসে,
আমাদের বউরাও কি আসমান থেকে আসবে? তারাও এ দেশের আলো-হাওয়া ও পরিবেশে বড়ো হওয়া কারো না কারো মেয়ে হবেই; ঠিকই যা ভেবেছি তা হয়েছে। একদিন আমার মেঝবোন তাঁর স্বামীকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসে। যেহেতু সঙ্গে তাঁর স্বামী আসবেন আগে জানিয়েছেন, তাই আয়োজনে খাওয়া-দাওয়া একটু ভালো হওয়ায় চাই, এটি আমারও স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল। এজন্য সদাইপাতি অন্যদিনের চেয়ে একটু ভালো করা হয়। বিশেষ করে মাছ-মাংস তো আছেই। কিন্তু সমস্যা হলো লক্ষ্মি বউকে নিয়ে ; সে তা দেখে এমন ভাব শুরু করে দিল নাক ঝারাঝারি – 'আমি এতোসব রান্না করতে পারবো না, এতো ঝামেলাও সহিতে পারবো না!' অথচ ঘরের মধ্যে আমি, মেয়েসহ আমরা হাতে গুনা তিনজন। আত্মীয়-স্বজন বলতে তেমন কেউ একটা আসে না বাড়িতে। আর এ অবস্থায়ও এমন আচরণ ; ভাবনায় পড়ি, আমার মা বেঁচে থাকলে কি যে দশা হতো; আগে যা ভেবেছি তা তো এখন অক্ষরে অক্ষরে টের পাচ্ছি।
সে এক কঠিন ব্যাধী। সমাজ-বাস্তবতা আরো জটিল। চরম অবস্থা ঠেকেছে আত্মকেন্দ্রিক ভাবনা। ওনার ওপর তিন দুনা। তারপরও সন্তুষ্ট নয়; মা-বাবা সন্তান এখানেও চরম বৈরিতা। একটাকে একটা একচোখো দেখতে পারে না?
৩১মে ২০২৬ইং, মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটে ৭৫ বছর বয়সী বিধবা নূর জাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনা দেশব্যাপী হৈচৈ পড়ার কারণও আছে; আমাদের সমাজ এমন মৃত্যু কখনো প্রত্যাশা করে না। মৃত্যুর এ করুণ হাল ও বিভৎসতা
দেখে পরিবারটির প্রতি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকে আপামর জনগণ। বিশেষ করে পরিবারটি সামাজিক মর্যাদা এবং শিক্ষা-দীক্ষায় দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এরপরও সন্তানদের এমন চরম অবহেলায় ঘটে এ মর্মান্তিক অবতারণা। সব চাইতে বড়ো কথা হলো, তাদের কর্তব্য পরায়নতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। হাজার হলেও মা-সন্তানের সম্পর্ক শুধু টাকা-পয়সা ও সম্পদ দিয়ে পরিমাণ করা যায় না। এতো টাকা থাকার পরও মায়ের জন্য ন্যুনতম মাসে মাসে তারা ২০-৩০ হাজার টাকা ব্যয় করতে পারেননি, এমন মন-মানসিকতাও এক ধরণের নিকৃষ্ট রোগে ভোগা; ইচ্ছে করলে তাদের এক সন্তানই এ টাকা মায়ের হাত খরচের জন্য পাঠাতে পারতেন। প্রয়োজনে ঘরে একজন সেবিকা রেখে সেবাশুশ্রূতা করাতে পারতেন। শুধুমাত্র বোনের বাসায় ঠেলে দিয়ে দায়সারা যে প্রবণতা সৃষ্টি করে তারই খেসারত আজ তাদের পোহাতে হচ্ছে, সাধারণ জনগণ তা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। একটি নারীর মৃতদেহ দীর্ঘসময় ধরে পড়ে থাকার ঘটনা সমাজ কখনো দেখেনি। এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকলো জাতির কাছে। ওই নারীর যেভাবে করুণ মৃত্যু হয়েছে–থাকার ওই রুমের অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা অবস্থা দেখে পতিয়মান হয় যে মেয়েও মায়ের খোঁজ-খবর নিতেন না। মনে হচ্ছে ওই নারীকে তারা অনেক বেলা না খাইয়ে মেরেছে। কিন্তু পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা কেউ অর্থকষ্টে ছিল তাও প্রতিমান হয় না। আসলে ঘটনাটি কি? একে অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে ক্ষোভ ও প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা, আর এ ঘটনা ঘটাতে গিয়েই এ ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছে? আজকাল এমন সব ঘটনা ঘটে চলেছে না দেখলে বিশ্বাসও করা যায় না। আবার এসব ঘটনায় অন্যকিছুও ভাবনায় আসে। বাস্তব কথা হলো, ছেলেরা কোরবানির সময়েও কি মায়ের একটু খোঁজ-খবর নিতে পারেননি? আসলে কি, তাদের এ চরম অহমিকা ও দাম্ভিকতা আজকের এ নির্মম পরিণতি। ওই পরিবাটি এ ঘটনার মাসুল সামাজিক অপমান-ঘৃণিত অবস্থায় ধূঁকতে হবে দীর্ঘ বছর । অবশ্য ঘটনাটি তদন্ত হওয়া উচিত। পর্দার আড়ালে তৃতীয়পক্ষ কোনোপ্রকার কলকাঠি বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে পরকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে কিনা খতিয়ে দেখা উচিত ? এ দায় সমাজ ও রাষ্ট্রকে কুঁড়ে কু্ঁড়ে দহন করবে।
লেখক : কবি, গবেষক ও কলামিস্ট
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আলেয়া মান্নান প্রিয়, তুমি একটি বার ভালোবেসে যেও। ব্যস্ততার পরে একবার অবসর করে আসিও...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার ডিজিটাল যুগে একটি ভিডিও কখনো কখনো হাজার বক্তৃতার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। কয়...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : সমকালীন বাংলা কবিতায় এমন কিছু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যেগুলো কেবল কবিতার সংকলন নয়; বরং সময়, স...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র ব...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : একসময় একটি চাকরি মানেই ছিল একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, স্বস্তি ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। মাস ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে যেমন প্রকাশ করে, তেমনি মানুষের মানবিকতা, রাষ্ট্...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited