শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক | ১১:৫২ পিএম, ২০২৬-০৬-২৫
দুদকের ৫ মামলা, ট্রুথ কমিশনে দোষ স্বীকার, একসঙ্গে ৮ পদে কর্তৃত্ব; অভিযোগ ১,৬০০ কোটি টাকার অনিয়ম ও অর্থপাচারের
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত কর্মকর্তা কাজী হাসান বিন শামসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, জালিয়াতি এবং অর্থপাচারের অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে। মূল পদ নির্বাহী প্রকৌশলী হলেও রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার বলয়ে থেকে বছরের পর বছর ধরে তিনি প্রধান প্রকৌশলী, প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সিডিএ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, আদালত এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, টেন্ডার, কমিশন বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করা হয়েছে।
২০০৫ সালে কল্পলোক প্রকল্প থেকেই অভিযোগের শুরু
কাজী হাসান বিন শামসের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযোগের সূত্রপাত হয় ২০০৫ সালে। ওই সময় নগরের বাকলিয়া এলাকায় প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত ‘কল্পলোক আবাসিক এলাকা (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। বিষয়টি তদন্তে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে অভিযোগ রয়েছে, তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রহস্যজনক কারণে সেই প্রতিবেদন আর প্রকাশিত হয়নি।
২০০৮ সালে দুদকের ৫ মামলা
২০০৮ সালে অক্সিজেন-কুয়াইশ বুড়িশ্চর সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ২০০৬ সালে নির্মিত দুটি ক্রস কালভার্টের প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় ছিল যথাক্রমে ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা এবং ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া পরিমাপ বই (এমবি) ও ভুয়া বিলের মাধ্যমে সিডিএ থেকে যথাক্রমে ৫ লাখ ৯১ হাজার টাকা এবং ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়।
এ ঘটনায় সরকারের ৭ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৮ অক্টোবর কোতোয়ালি থানায় কাজী হাসানের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
ট্রুথ কমিশনে দোষ স্বীকার ও অর্থ জমা
দুদকের মামলার পর ২০০৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর কাজী হাসান বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল শাখার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ৩ লাখ টাকা জমা দেন। পরে ট্রুথ কমিশনের কাছে দোষ স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশের মাধ্যমে মার্জনাপত্র গ্রহণ করেন।
তবে পরবর্তীতে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ ট্রুথ কমিশনকে অবৈধ ঘোষণা করলে সেই সুবিধা বাতিল হয়ে যায়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে ফৌজদারি মামলার দায় থেকে অব্যাহতির সুযোগও আর থাকে না।
এদিকে ২০১২ সালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় চার্জশিটভুক্ত আসামি হিসেবে তাকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দিলেও অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুস সালাম তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি।
আউটার রিং রোড প্রকল্পে নতুন বিতর্ক
দুর্নীতির অভিযোগ ও মামলা থাকা সত্ত্বেও ২০১১ সালে তাকে দেওয়া হয় ৩ হাজার ৩২৪ কোটি টাকার চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্পের দায়িত্ব।
সূত্র বলছে, ৮৫৬ কোটি টাকার প্রকল্পটি একাধিকবার সংশোধন করে ব্যয় প্রায় চার গুণ বাড়ানো হয়। ২০১৯ সালের ১৩ জুলাই নির্মাণাধীন পতেঙ্গা আউটার রিং রোডের কয়েকশ ফুট অংশ ধসে পড়ে এবং শহর রক্ষা বাঁধের ব্লক সরে যায়। নির্মাণকাজের মান নিয়ে তখন ব্যাপক সমালোচনা দেখা দেয়।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পে নিয়োজিত সাতজন কর্মকর্তা মূল বেতনের ১০ শতাংশ অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার নিয়ম থাকলেও তারা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করেন।
২০২১ সালে দুদক এ বিষয়ে দায়মুক্তি দিলেও ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায় বলে জানা গেছে। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।
পাহাড় কাটা ও জমি কেনার অভিযোগ
বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সীতাকুণ্ড এলাকায় স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডকে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে রিসোর্ট নির্মাণে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে কাজী হাসানের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এর বিনিময়ে তিনি ওই এলাকায় নিজের নামেও বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সিডিএর বড় বড় টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে রাজনৈতিকভাবে সহায়তা করা হতো।
১,৬০০ কোটি টাকার সম্পদ ও যুক্তরাষ্ট্রে অর্থপাচারের অভিযোগ
বিগত ১৫ বছরে প্রকল্প কমিশন, ঘুষ বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে কাজী হাসানের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এই অর্থের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করা হয়েছে। জানা গেছে, তার বড় মেয়ে বর্তমানে নিউইয়র্কের স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত। অভিযোগ রয়েছে, মেয়ের নাম ব্যবহার করে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তিও কেনা হয়েছে।
একই সঙ্গে ৮ পদে কর্তৃত্ব
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিজের মামা, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মোসলেম উদ্দিন এবং সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের প্রভাব ব্যবহার করে সিডিএর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে বা বিভিন্ন সময়ে তিনি একযোগে যেসব দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে সেগুলো হলো— ১. নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল পদ) ২. বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ৩. তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী-১ (চলতি দায়িত্ব) ৪. ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী ৫. ভারপ্রাপ্ত প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ৬. নগর উন্নয়ন কমিটির সদস্য সচিব ৭. বিশেষ প্রকল্প অনুমোদন কমিটির চেয়ারম্যান ৮. ইমারত নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একই ব্যক্তি পরিকল্পনা, অনুমোদন, বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্বে থাকায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আদালতে জাল নথি দাখিলের অভিযোগ
চলতি বছরের মে মাসে দুদকের মামলা সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায় তার বিপক্ষে যাওয়ার পরও প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পেতে তিনি উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করেন।
অভিযোগ রয়েছে, আদালতে দাখিল করা দুটি আবেদনপত্রে (২০১৯ ও ২০২৫ সালের) তিনি উভয় ক্ষেত্রেই নিজের চাকরির বয়স ২১ বছর উল্লেখ করেন। ছয় বছরের ব্যবধানেও চাকরির মেয়াদ অপরিবর্তিত থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সিডিএ সূত্রের দাবি, ওই আবেদনপত্রগুলোর রিসিভ কপি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষর যাচাই করে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চাকরি প্রবিধানমালা ১৯৯০ অনুযায়ী প্রধান প্রকৌশলী হতে হলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। কিন্তু কাজী হাসানের মূল পদ নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়ায় তার সেই যোগ্যতা রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত ১৬ বছরে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে তিনি ৪৪টি রিট পিটিশন দায়ের করেছেন।
তদন্ত কমিটি গঠন, পরে থমকে যায় কার্যক্রম
গত বছরের ১১ ডিসেম্বর সিডিএর ২০ হাজার ৭১৬ কোটি টাকার ১৩টি মেগা প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যবহার করে শেষ পর্যন্ত সেই তদন্ত কার্যক্রম কার্যকরভাবে এগোতে দেওয়া হয়নি।
সচেতন মহলে প্রশ্ন
দুদকের মামলা, ট্রুথ কমিশনে দোষ স্বীকার, প্রকল্প অনিয়ম, অর্থপাচার, জাল নথি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো একের পর এক অভিযোগের পরও কেন কাজী হাসান বিন শামসের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না—তা নিয়ে চট্টগ্রামের সচেতন মহলে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
তাদের প্রশ্ন, এত অভিযোগের পরও কীভাবে তিনি বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকছেন এবং তার ক্ষমতার উৎস কোথায়—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জনস্বার্থেই জরুরি হয়ে উঠেছে।
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : চট্টগ্রামের কিশোরী সুপর্বা সুধা বিশ্বাস। ১৩ বছর বয়সী অষ্টম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর ঝুলিতে ইতোমধ্...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : বাংলাদেশ এডিটরস্ ফোরাম গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে যে, সম্প্রতি চট্টগ্রামের একটি দৈনিক পত্রি...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : নোবিপ্রবি প্রতিনিধি : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি ও শহীদদের স্মরণে বাংলাদেশ ইসলাম...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু পুরুষের শাস্তির বিধান কেন অবৈধ নয়, তা জানতে ...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর বিচার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এগোচ্...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষা প্রতি...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited