বাংলাদেশ   শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬  

শিরোনাম

অর্ধশতাব্দী পরও নজরুল: বিদ্রোহ, সাম্য ও মানবতার কবি

আবদুল্লাহ মজুমদার :    |    ০৬:৫৪ পিএম, ২০২৬-০৮-২৭

অর্ধশতাব্দী পরও নজরুল: বিদ্রোহ, সাম্য ও মানবতার কবি

১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট। ঢাকার মাটিতে থেমে গেল কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের পথচলা। যে কবি একদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের কণ্ঠকে শক্ত করেছিলেন, পরাধীনতার বিরুদ্ধে সাহস জুগিয়েছিলেন এবং সাম্য ও মানবতার কথা বলেছিলেন, জীবনের শেষ সময় তাঁকে কাটাতে হয়েছে নীরবতার মধ্যে। স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেননি, আগের মতো লিখতেও পারেননি। কিন্তু তাঁর কথা থেমে যায়নি। তাঁর কবিতা, গান ও চিন্তা আজও মানুষের মনে বেঁচে আছে। দেখতে দেখতে তাঁর মৃত্যুর ৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ২০২৬ সালে তাঁর ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই বিশেষ সময়ে তাই তাঁকে শুধু কবি হিসেবে নয়, একজন সংগ্রামী মানুষ হিসেবেও মনে করা দরকার।

নজরুলের শৈশবের জীবন ছিল অভাবের। বাবাকে হারানোর পর সংসারের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। পড়াশোনা ঠিকমতো চালিয়ে যেতে পারেননি। জীবিকার জন্য মক্তবে শিক্ষকতা করেছেন, মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেছেন, মাজারেও কাজ করেছেন। পরে লেটো দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গান, কবিতা ও অভিনয়ের সঙ্গে পরিচিত হন। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, এই সাধারণ পরিবারের ছেলেটিই একদিন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বড় কবি হয়ে উঠবেন।

জীবনের এই কঠিন সময়গুলোই তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যায়। তিনি মানুষের অভাব দেখেছেন, ক্ষুধা দেখেছেন, বঞ্চনা দেখেছেন। তাই তাঁর কবিতায় শুধু নিজের কথা নেই। সেখানে আছে শ্রমিকের কথা, কৃষকের কথা, দরিদ্র মানুষের কথা। আছে সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষের কথাও।

নজরুল যখন সাহিত্যজগতে নিজের জায়গা তৈরি করছেন, তখন দেশ ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। চারদিকে ছিল অন্যায় ও পরাধীনতা। এসব তাঁকে ভাবিয়েছে। তাঁর কলমে প্রতিবাদের ভাষা এসেছে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের পর তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান। তাঁর কবিতার ভাষা ছিল নতুন, সাহসী ও সরাসরি।

কিন্তু এই বিদ্রোহের মূল্যও তাঁকে দিতে হয়েছে। তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লিখেছেন এবং ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। তাঁর লেখার কারণে মামলা হয়েছে, তাঁকে কারাগারে যেতে হয়েছে। কারাগারে থেকেও তিনি প্রতিবাদ করেছেন, অনশন করেছেন। অর্থাৎ নিজের বিশ্বাসের জায়গা থেকে তিনি সহজে সরে আসেননি।

নজরুলের বিদ্রোহ শুধু ইংরেজদের বিরুদ্ধে ছিল না। সমাজের অন্যায়, শোষণ, কুসংস্কার ও ধর্মীয় বিভেদের বিরুদ্ধেও তিনি কথা বলেছেন। তাঁর কাছে মানুষ ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চেয়েছেন এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষে মানুষে বড় কোনো ভেদাভেদ থাকবে না।

তাঁর অসাম্প্রদায়িক চিন্তা আজও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যেমন ইসলামী গান ও গজল লিখেছেন, তেমনি শ্যামাসংগীতও রচনা করেছেন। হিন্দু-মুসলমানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিষয়কে তিনি নিজের লেখায় জায়গা দিয়েছেন। তাঁর কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের আগে মানুষের পরিচয় ছিল বড়। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে তাঁর এই চিন্তা আরও বেশি মনে পড়ে।
নারীর অধিকার নিয়েও নজরুলের চিন্তা ছিল অনেকটা এগিয়ে। নারী-পুরুষের সমতার কথা তিনি বলেছেন। ‘নারী’ কবিতায় তাঁর সেই বক্তব্য স্পষ্ট। তিনি মনে করতেন, সমাজের উন্নতিতে নারী ও পুরুষের সমান ভূমিকা থাকা দরকার।

কিন্তু যে মানুষটি এত বড় বড় কথা বলেছেন, তাঁর নিজের জীবন ছিল অনেক কষ্টের। সংসারে অভাব ছিল। স্ত্রী প্রমীলা দেবী দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। নিজের জীবনেও নানা সংকট ছিল। তার ওপর ১৯৪২ সালে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।

এরপর তাঁর জীবনে আসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। ধীরে ধীরে তিনি বাক্‌শক্তি হারিয়ে ফেলেন। স্বাভাবিকভাবে কথা বলা ও লেখালেখি করা আর সম্ভব হয়নি। একজন কবির জন্য এটি ছিল অত্যন্ত কষ্টের বিষয়। যে মানুষটি সারাজীবন শব্দ নিয়ে কাজ করেছেন, সেই মানুষটির কাছ থেকেই একসময় শব্দ হারিয়ে গেল।

নজরুলের চিকিৎসা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। তাঁর অসুস্থতার শুরুতে যথাযথ চিকিৎসা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরে তাঁকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। জীবনের শেষ কয়েক দশক তাঁকে অনেকটা নীরব অবস্থায় কাটাতে হয়েছে।
এখানেই নজরুলের জীবনের একটি বড় বেদনা। আমরা আজ তাঁকে জাতীয় কবি হিসেবে সম্মান করি। তাঁর নামে অনুষ্ঠান করি। কিন্তু তাঁর জীবনের কঠিন সময়ে তিনি কতটা প্রয়োজনীয় সহায়তা পেয়েছিলেন, সেই প্রশ্নও থেকে যায়। একজন বড় কবির জীবনের শেষ সময় এতটা নীরব ও অসহায় হওয়া সত্যিই কষ্টের।

স্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্কও বিশেষ। ১৯৭২ সালে তাঁকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভ করেন। তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। তাঁর শেষ ঠিকানা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে।

তবে জাতীয় কবি হিসেবে তাঁর আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির গেজেট প্রকাশ পেতেও দীর্ঘ সময় লেগেছে। ২০২৪ সালে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি হয়। দীর্ঘদিন ধরে যে মর্যাদা মানুষ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বীকৃত ছিল, তার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে এত সময় লাগা নিঃসন্দেহে ভাবার বিষয়।

তবে নজরুলের অবমূল্যায়নের কথা শুধু রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বললে বিষয়টি পুরোপুরি বলা হবে না। আমাদের নিজেদেরও কিছু প্রশ্ন করা দরকার।

আমরা প্রতিবছর তাঁর জন্মদিন ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করি। তাঁর কবিতা আবৃত্তি করি, গান গাই। কিন্তু তাঁর চিন্তাগুলো কি আমাদের জীবনে আছে?

নজরুল সাম্যের কথা বলেছেন। অথচ সমাজে এখনো বৈষম্য আছে। তিনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ছিলেন। অথচ ধর্মের নামে বিভেদ এখনো দেখা যায়। তিনি দরিদ্র মানুষের কথা বলেছেন। অথচ দরিদ্র মানুষের কষ্টও শেষ হয়নি। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু আমরা অনেক সময় অন্যায় দেখেও চুপ থাকি।

তাহলে কি আমরা নজরুলকে শুধু কবি হিসেবেই ভালোবাসি, মানুষ হিসেবে নয়? তাঁর কবিতা ও গানকে ভালোবাসি, কিন্তু তাঁর আদর্শকে নয়?

এই প্রশ্নগুলোই হয়তো তাঁর ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সবচেয়ে বেশি ভাবার বিষয়।

নজরুলের জীবন আমাদের একটি শিক্ষা দেয়—প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের কথা বলতে হয়। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে হয়। মানুষকে ধর্ম-বর্ণ দিয়ে নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে হয়। আর সমাজে যারা পিছিয়ে আছে, তাদের পাশে দাঁড়াতে হয়।

নজরুলের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী তাই শুধু একটি স্মরণদিবস নয়। এটি তাঁর জীবন ও কাজকে নতুন করে দেখার সময়। তাঁর কষ্টের কথা মনে করার সময়। তাঁর অবহেলার জায়গাগুলো নিয়ে ভাবার সময়। একই সঙ্গে তাঁর কবিতা, গান ও মানবিক চিন্তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সময়।

৫০ বছর আগে নজরুল চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর প্রয়োজন এখনো শেষ হয়নি। অন্যায় দেখলে তাঁর কবিতার কথা মনে পড়ে, মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি হলে তাঁর সাম্যের বাণী মনে পড়ে, আর কেউ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে তাঁর বিদ্রোহী চেতনার কথা মনে পড়ে।

তাই ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে নজরুলকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় উপায় হয়তো বড় কোনো আয়োজন নয়। তাঁর কবিতা আবৃত্তি বা তাঁর গান গাওয়ার পাশাপাশি যদি তাঁর একটি কথাও আমরা জীবনে মেনে চলি—মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসি, অন্যায়ের সামনে নীরব না থাকি এবং বিভেদের বদলে মানুষের পাশে দাঁড়াই—তাহলেই তাঁর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানানো হবে। ৫০ বছর আগে কবি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর প্রয়োজন এখনো ফুরোয়নি। যত দিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার প্রয়োজন থাকবে, যত দিন মানুষ সাম্যের স্বপ্ন দেখবে, তত দিন নজরুল আমাদের মাঝেই থাকবেন।

আবদুল্লাহ মজুমদার 
সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।

রিটেলেড নিউজ

দেহঘড়ি থেমেছে, থামেনি আবদুর রহমান বয়াতীর সুর

দেহঘড়ি থেমেছে, থামেনি আবদুর রহমান বয়াতীর সুর

আবদুল্লাহ মজুমদার : : কোনো কোনো কণ্ঠ শুধু গান গায় না, একটি সময়কে ধারণ করে। আবদুর রহমান বয়াতীর কণ্ঠ ছিল তেমনই—মাটির গন্ধ...বিস্তারিত


বোর্ড চ্যালেঞ্জ: নম্বর কি সত্যিই ভবিষ্যৎ মাপে?

বোর্ড চ্যালেঞ্জ: নম্বর কি সত্যিই ভবিষ্যৎ মাপে?

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ফল প্রকাশের পর মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে কয়েকটি সংখ্যা। কারও জন্য সেই সংখ্যা আনন্দের, কারও জন্য হতা...বিস্তারিত


যেও ভালোবেসে

যেও ভালোবেসে

আমাদের বাংলা ডেস্ক : :   আলেয়া মান্নান   প্রিয়, তুমি একটি বার ভালোবেসে যেও।   ব্যস্ততার পরে একবার অবসর করে আসিও...বিস্তারিত


যখন রাজনীতির অস্ত্র ভাইরাল ভিডিয়ো

যখন রাজনীতির অস্ত্র ভাইরাল ভিডিয়ো

আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার  ডিজিটাল যুগে একটি ভিডিও কখনো কখনো হাজার বক্তৃতার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। কয়...বিস্তারিত


যেখানে রাত্রি লিখে সময়ের ইতিহাস সারাফ নাওয়ার -এর রাত্রির ভাটলিপি 

যেখানে রাত্রি লিখে সময়ের ইতিহাস সারাফ নাওয়ার -এর রাত্রির ভাটলিপি 

আবদুল্লাহ মজুমদার : : সমকালীন বাংলা কবিতায় এমন কিছু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যেগুলো কেবল কবিতার সংকলন নয়; বরং সময়, স...বিস্তারিত


ম্যান্ডেলার শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক অনিবার্য পাঠ

ম্যান্ডেলার শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক অনিবার্য পাঠ

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র ব...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

নোয়াখালী প্রতিনিধি : : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্তার অ...বিস্তারিত


সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : সৌদি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, স্পীড লিমিট এর চাইতে অধিক গতিতে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের উপ...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর