শিরোনাম
আমাদের বাংলা ডেস্ক : | ০৭:৫৪ পিএম, ২০২৫-১২-১১
- মাহাবুব রহমান দুর্জয়
পৃথিবীকে কখনোই স্বর্গ বলা হয়নি। মানুষ তার জন্মলগ্ন থেকেই লড়াই, সংঘাত, বিপর্যয় আর বেদনার ইতিহাস বহন করে চলেছে। তবুও মানুষ নামের প্রাণীটি তার অদম্য বুদ্ধি, বিবেক ও মানবিক শক্তির জোরে ধারাবাহিকভাবে সভ্যতার সোপান বেয়ে ওপরে উঠেছে। তার সৃষ্টিশীলতা, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকার মানবসভ্যতার উজ্জ্বলতম অধ্যায়গুলো লিখেছে। কিন্তু আজ, একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে পৃথিবীর চিত্র আমাদের সামনে এক ভয়াবহ প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরে মানুষ কি তার মানবিকতার আলো হারিয়ে ফেলেছে? আজকের বিশ্বে প্রতিদিনের সংবাদ যেন মৃত্যুর মিছিল। যুদ্ধ, গণহত্যা, নারী-শিশুর উপর নির্যাতন, জাতিগত নিপীড়ন, ধর্ম-বিদ্বেষ, দখলদারিত্ব সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এক অমানবিকতার সাম্রাজ্য। রাষ্ট্রের শক্তি বহু জায়গায় ব্যবহৃত হচ্ছে দুর্বলকে চূর্ণ করতে, মানুষের মৌলিক অধিকারকে কেড়ে নিতে, কণ্ঠরোধ করতে। স্বার্থের লোভ আর ক্ষমতার নেশায় ব্যক্তি, সমাজ ও বিশ্বরাজনীতি সবই যেন মানবিকতার বিপরীত শক্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। এ বাস্তবতা আমাদের বাধ্য করে ভাবতে, আমরা কি একটি সভ্য সংকটের মুখোমুখি? এই পথের শেষ কি তবে মানবজাতির বিলুপ্তির দিকে?
সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ: সভ্যতার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। পৃথিবীর বহু অঞ্চলে যুদ্ধ আজ যেন রুটিন সংবাদ। ধোঁয়া-উঠা শহর, ভেঙে পড়া বাড়ি, দগ্ধশিশুর আর্তনাদ সবকিছুই যেন ক্যামেরার জন্য নির্মম বাস্তবতার ছবি। যারা এসব ভোগ করছে তারা মানুষ, আর যারা দেখছে তারাও মানুষ। কিন্তু আমাদের আবেগ, বিবেক, অনুভূতি সব যেন অসাড় হয়ে গেছে। একসময় একটি নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুও বিশ্বকে নাড়া দিতো। আজ হাজারো প্রাণহানির খবরও আমাদের ততটা স্পর্শ করে না। মিডিয়ার অতিরিক্ত তথ্য প্রবাহ এবং ক্রমাগত মৃত্যু-সংবাদের চাপে মানুষের মানসিক প্রতিক্রিয়া ভোঁতা হয়ে গেছে। সহিংসতা যেন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক, প্রতিদিনের বাস্তবতা। এটাই মানবিকতার মৃত্যুর প্রথম লক্ষণ; অন্যের কষ্টে অনুভূতি কাজ না করা।
ন্যায়ের মূল্যহীনতা: ক্ষমতার বিস্ফোরক অহংকার- মানবসভ্যতার মূল ভিত্তি ছিল ন্যায়বিচারের ধারণা। যে সমাজে ন্যায় নেই, সে সমাজ যত উন্নতই হোক, ভিতরে ভিতরে তা পচে যায়। আজ পৃথিবীর বহু দেশেই ন্যায়বিচার ক্ষমতার সামনে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
অভিযোগ আছে-
- শক্তিশালী রাষ্ট্র দুর্বল রাষ্ট্রকে গ্রাস করছে,
- ক্ষমতাবান ব্যক্তি গরিব মানুষের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে,
- মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভয় দেখিয়ে স্তব্ধ করে দেওয়া হচ্ছে,
- আইনের চোখ নাকি সমান থাকলেও তার প্রয়োগে বৈষম্য দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে।
যে পৃথিবীতে মানুষের হক কেড়ে নেওয়া হয়, সেখানে সহমর্মিতা টিকে থাকতে পারে না। ন্যায়বিচারের পতন আসলে মানবিকতার পতন। আর মানবিকতার পতন মানেই সভ্যতাকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া।
প্রযুক্তির যুগে মানুষের একাকিত্ব ও মানসিক বিপর্যয়-
মানবিকতা কেবল সামাজিক কাঠামোর বিষয় নয়; এটি মানুষের মানসিক গঠনের সাথে যুক্ত। আজকের যুগে প্রযুক্তি আমাদের সামনে বিপুল সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। আমরা এক ক্লিকে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগাযোগ করছি, কয়েক সেকেন্ডে তথ্যের সাগরে ডুবে যাচ্ছি। কিন্তু এই প্রযুক্তির ভারেই মানুষ আরো একা, আরো ভীত, আরো অন্তর্মুখী হয়ে পড়ছে। ডিজিটাল আসক্তি, সামাজিক মাধ্যমে ঘৃণা, সম্পর্কের ভাঙন, মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ এবং পরিচয় সংকট। এসবই মানুষের ভেতরের মানবিক মমতা, ধৈর্য, সহনশীলতা ও ভালোবাসাকে ক্ষয় করে দিচ্ছে। যে মানুষ নিজের ভেতর শান্তি খুঁজে পায় না, সে অন্যকে শান্তি দিতে পারে না। সভ্যতার এই মনস্তাত্ত্বিক ক্ষয় মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য গভীর হুমকি।
বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতা: ক্ষমতা বনাম মানবতা।
বিশ্বশক্তির প্রতিযোগিতা মানবজীবনকে মূল্যহীন করে ফেলেছে। রাষ্ট্রগুলো শক্তি প্রদর্শনে মত্ত; অস্ত্রের বাজার ফুলেফেঁপে উঠেছে; যুদ্ধ যেন রাজনৈতিক অর্থনীতির অংশবিশেষ। বহু আন্তর্জাতিক চুক্তি, মানবাধিকার সনদ, জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র সবই কাগজে-কলমে শক্তিশালী হলেও বাস্তবে বহু অঞ্চলে সেগুলোর প্রয়োগ ব্যর্থ। মানুষের প্রাণ এখন জিওপলিটিক্সের হিসাব-নিকাশে এক ইউনিট সংখ্যা মাত্র। এই যে মানুষকে সংখ্যায় পরিণত করা এটাই মানবিকতার মৃত্যুঘণ্টা।
মানবিকতার আলো কি তবে নিভে গেছে?
না। যখনই আমরা মনে করি মানবতা হারিয়ে গেছে, তখন কোথাও না কোথাও কিছু মানুষের কর্মকাণ্ড আমাদের ভুল প্রমাণ করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় স্বেচ্ছাসেবকদের জীবনবাজি রেখে উদ্ধার কাজ, নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো সাধারণ জনগণ, দুর্দশাগ্রস্তদের খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করা মানবিক হাত, নির্যাতিতের জন্য আদালতে লড়াই করা সৎ আইনজীবী, পথশিশুকে পড়াতে বসা এক তারুণ্যের স্বেচ্ছাশ্রম, বন্যায় আটকে পড়া মানুষের জন্য গ্রামবাসীর সম্মিলিত উদ্যোগ...। এ দৃশ্যগুলো বলে- অন্ধকার যতই ঘন হোক, আলো কখনো সম্পূর্ণ নিভে যায় না। মানুষের ভেতরের ভালোবাসা, দয়া, করুণা এই গুণগুলো তখনই প্রকট হয় যখন অমানবিকতা প্রবল হয়ে ওঠে।
মানবিকতা কি জন্মগত না অর্জিত?
মানুষের জন্মগত প্রবণতা দ্বিমুখী। সে যেমন স্বার্থপর হতে পারে, তেমনি অসাধারণ আত্মত্যাগের ক্ষমতাও তার আছে। মানবিকতা শেখানো যায়, চর্চা করা যায়, বেড়ে ওঠার পরিবেশে উন্নত করা যায়। সমাজ যখন সবকিছু স্বার্থ দিয়ে মাপে, তখন মানুষও শেখে স্বার্থপরতা। সমাজ যখন সবাইকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিতে শেখায়, তখন মানবিকতা বিকশিত হয়। অতএব মানবিকতা একটি সামাজিক নির্মাণ, যার ওপর নির্ভর করে সভ্যতার ভবিষ্যৎ।
মানবিকতার পুনর্জাগরণ কীভাবে সম্ভব?
মানবজাতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই নতুনভাবে মানবিক চেতনা জাগাতে হবে। প্রয়োজন- ১. ন্যায়বিচারের প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি, রাষ্ট্রকে আইনের প্রয়োগে সমতা নিশ্চিত করতে হবে। ২. শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবিক মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্তি, শুধু তথ্য বা চাকরি-কেন্দ্রিক শিক্ষা দিয়ে মানুষ তৈরি হয় না।প্রয়োজন নৈতিক ও সামাজিক মানবিক শিক্ষা। ৩. গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা, ঘৃণা নয়, তথ্য-ভিত্তিক সত্য প্রচার জরুরি। ৪. রাজনৈতিক সদিচ্ছা, মানবিক সংকটের সমাধানে বিশ্ব নেতৃত্বকে প্রতিযোগিতার বৃত্ত ভেঙে সহযোগিতায় আসতে হবে। ৫. নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা, জনগণের তৃণমূল উদ্যোগই মানবতার ভিত্তি শক্ত করে। ৬. প্রযুক্তির মানবিক ব্যবহার, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেন বিভাজন নয়, সংযোগ সৃষ্টি করে।
মানবজাতির বিলুপ্তি- বাস্তব ভয় না প্রতীকী সতর্কতা?
মানুষ শারীরিকভাবে বিলুপ্ত হবে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন আশঙ্কা ব্যক্ত করলেও, তার আগেই যে জিনিসটি হারিয়ে যেতে পারে তা হলো মানবিকতা। মানবিকতা নাই মানে সভ্যতা নেই, ন্যায় নেই, শান্তি নেই এরপর মানুষ থাকলেও সে মানুষ থাকবে না, থাকবে কেবল স্বার্থপর প্রাণী হিসেবে। সভ্যতার ইতিহাসে অনেক জাতির পতন ঘটেছে মানবিকতা হারানোর কারণেই। আমরা চাই না একবিংশ শতাব্দীর মানুষ সেই ভুল পুনরায় করুক।
উপসংহার: অন্ধকারের শেষে আলো-
পৃথিবী আজ কঠিন সময় অতিক্রম করছে। মানবিকতা গভীর সংকটে, বিশ্বের মানুষের কণ্ঠে হতাশা। তবুও ইতিহাস শেখায় মানুষ বারবার পতনের কিনারা থেকে ফিরে এসেছে। যখন অমানবিকতা সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছায়, তখনই মানবতা নতুন করে জেগে ওঠে।ভআমরা যে ব্যথা অনুভব করি, যে ক্ষোভ প্রকাশ করি, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিই এসবই প্রমাণ করে মানবিকতার শিখা পুরোপুরি নিভে যায়নি। সভ্যতাকে রক্ষা করতে হলে আজই আমাদের প্রত্যেককে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানবিকতার পক্ষে দাঁড়াতে হবে। মানবজাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ঠিক এই সিদ্ধান্তের ওপর।
আমরা কি অন্ধকারের কাছে হার মানবো, নাকি মানবিকতার আলো হাতে নিয়ে এগিয়ে যাবো? মানুষের ইতিহাস বলে- আলোই বেছে নেবে মানবজাতি।
লেখক : মানবাধিকার সংগঠক ও তরুণ সমাজ সেবক।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র ব...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে একটি নীরব যন্ত্...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মেজর (অব.) মনজুর কাদের সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘চীনকে ঘুমাতে দাও; যখন সে জেগে উঠবে, সে বিশ্বকে কা...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কাজী আব্দুল্লাহ আল বোরহান রিজভী বাংলাদেশ গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং সামাজ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্ত...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার : শহরের ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়ানো ক্ষুদ্র দোকানি, গ্রামের হতাশ তরুণ কিংবা চাকরির আশায়...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited