শিরোনাম
আমাদের বাংলা ডেস্ক : | ০৪:৩৩ পিএম, ২০২৫-১২-১৫
মাহাবুব রহমান দুর্জয় :
বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ। এই সত্য অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছে। দারিদ্র্য হ্রাস, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বিস্তার, ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা সব মিলিয়ে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাওয়ার বাস্তব সক্ষমতা অর্জন করেছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার আড়ালে একটি গভীর ও ভয়ংকর সংকট নীরবে সমাজের ভিত কুরে কুরে খাচ্ছে। সেই সংকটের নাম তরুণ সমাজের রাজনৈতিক, নৈতিক ও সামাজিক বিপথগামিতা।
একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। তরুণরাই পরিবর্তনের চালিকাশক্তি, রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান হাতিয়ার। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে জাতি তার তরুণদের সঠিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও নৈতিক আদর্শ দিতে পেরেছে, সেই জাতিই দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বিপরীতে, যে রাষ্ট্র তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত হতে দিয়েছে, রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে কিংবা অপরাধের দিকে ঠেলে দিয়েছে, সেই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে দুর্বল ও পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ আজ ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ দেশ ও রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত উন্নতি, ক্ষমতা, অর্থ ও ভোগবাদী জীবনের পেছনে ছুটছে। দেশপ্রেম আজ অনেকের কাছে কেবল স্লোগান বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ট্যাটাসে সীমাবদ্ধ। রাষ্ট্র, সংবিধান, গণতন্ত্র ও নাগরিক দায়িত্ব এসব বিষয় তরুণদের চিন্তার কেন্দ্র থেকে সরে যাচ্ছে। এর ফলে সমাজে দায়িত্বহীনতা বাড়ছে, রাজনৈতিক সচেতনতা কমছে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
এই শূন্যতার সুযোগ নিয়েই অপরাধী চক্র, রাজনৈতিক সুবিধাবাদী গোষ্ঠী এবং দেশবিরোধী শক্তিগুলো তরুণ সমাজকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, চোরাকারবারি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা, কিশোর গ্যাং, রাজনৈতিক সহিংসতা ও ভাড়াটে ক্যাডার সংস্কৃতির সঙ্গে তরুণদের সরাসরি সম্পৃক্ততা। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো- এই পরিস্থিতি কি কাকতালীয়? নাকি এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের যৌথ ফল? বাস্তবতা হলো, তরুণ সমাজের এই বিপথগামিতা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এটি একটি দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়া, যেখানে পরিবার, শিক্ষা ব্যবস্থা, রাজনীতি ও রাষ্ট্র সব ক্ষেত্রেই কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। পরিবার, যা একজন নাগরিকের প্রথম পাঠশালা, সেখানে আজ নৈতিক শিক্ষার চরম ঘাটতি। অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক প্রতিযোগিতা ও ভোগবাদী মানসিকতার কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের মানুষ করার বদলে কেবল সফল করার দিকেই মনোযোগী। ফলে মূল্যবোধহীন সাফল্য তরুণদের কাছে আদর্শ হয়ে উঠছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থাও উদ্বেগজনক। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ ডিগ্রি উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়েছে। ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংবিধান, নাগরিক অধিকার ও কর্তব্য এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত হচ্ছে না। শিক্ষিত তরুণ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সচেতন নাগরিক তৈরি হচ্ছে না। এই শূন্যতা তরুণদের রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্ত করে তুলছে। এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বহু আগেই উপলব্ধি করেছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। তাই সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের বদলে তারা বেছে নিয়েছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, তথ্যযুদ্ধ ও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার পথ। মাদক, ভোগবাদ, বিকৃত বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং ভুয়া আদর্শের মাধ্যমে তরুণদের আত্মকেন্দ্রিক ও দায়িত্বহীন করে তোলা হচ্ছে।
এই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে দেশের কিছু দেশবিরোধী রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গোষ্ঠী সরাসরি সহযোগিতা করছে। তারা বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তরুণদের ব্যবহার করছে- কখনো ধর্মের নামে উগ্রবাদ সৃষ্টি করে, কখনো গণতন্ত্রের নামে অরাজকতা উসকে দিয়ে, আবার কখনো তথাকথিত নাগরিক আন্দোলনের আড়ালে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। এই গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্য একটাই রাষ্ট্রকে দুর্বল করা, উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়া এবং বাংলাদেশকে আবার পরনির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা। এর ফলাফল আজ স্পষ্ট। মাদকাসক্ত তরুণদের সংখ্যা বাড়ছে, রাজনৈতিক সহিংসতায় তরুণদের প্রাণ ঝরছে, শিক্ষিত বেকারত্ব ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, আর অপরাধমূলক রাজনীতি সমাজে স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো- তরুণদের একটি অংশ অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে দেখার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলছে।
এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে দেশ পরিচালনার জন্য দেশপ্রেমিক, দক্ষ ও নৈতিক নেতৃত্ব পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। তখন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া দুর্বল হবে, জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বিদেশি শক্তির প্রভাব আরও বাড়বে। তরুণ সমাজ ধ্বংস হলে দেশ যে ধ্বংসের পথে যাবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জাতীয় ঐকমত্য। পরিবারকে তার নৈতিক দায়িত্বে ফিরতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে হতে হবে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধানকেন্দ্রিক। রাজনীতিকে তরুণদের জন্য সেবার প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে হবে, অপরাধের আশ্রয়স্থল নয়। রাষ্ট্রকে মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিতে হবে। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। তরুণদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে হবে, কিন্তু ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভ্রান্তিকর ও রাষ্ট্রবিরোধী বয়ান প্রচারের বদলে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে সত্য তুলে ধরতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশি প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সবশেষে বলতে হয়, এই লড়াই কেবল রাষ্ট্রের নয়, কেবল সরকারের নয়। এটি একটি জাতির অস্তিত্বের লড়াই। তরুণদের নিজেদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার হবে, নাকি দেশের রক্ষাকবচ হবে। বাংলাদেশ বারবার সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে এসে থমকে গেছে। এবার আর থামার সুযোগ নেই। তরুণ সমাজ বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে, এই সত্য উপলব্ধি করে এখনই রাজনৈতিক ও নৈতিক জাগরণ ঘটাতে হবে। ইতিহাস আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
লেখক : মাহাবুব রহমান দুর্জয়
তরুণ সংগঠক ও সমাজ সেবক
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মোহাম্মদ সেলিম উদ্দীন (এম.এ কামিল) প্রতিষ্টাতা: কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা লেখক: হাফেজ মোহাম্ম...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মাহাবুব রহমান দুর্জয় : মানুষের জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী। অথচ এই অল্প সময়ের জীবনেই আমরা কত সম্পর্ক গড়ে à...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মাহাবুব রহমান দুর্জয় : সমাজে কিছু আচরণ আছে, যেগুলোকে আমরা এতদিন ধরে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে নিতে à...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র বà...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে একটি নীরব যন্ত্à...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মেজর (অব.) মনজুর কাদের সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘চীনকে ঘুমাতে দাও; যখন সে জেগে উঠবে, সে বিশ্বকে কাà¦...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited