শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০১:৪৮ পিএম, ২০২৬-০৬-০৬
একটি সংসার ভাঙার শব্দ বাইরে থেকে শোনা যায় না। কোনো একদিন হয়তো একই ছাদের নিচে বসবাস করা দুজন মানুষ নীরবে দুটি ভিন্ন পথে হাঁটতে শুরু করেন। তাদের মাঝখানে জমে থাকে না-বলা অভিমান, অপূর্ণ প্রত্যাশা, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক দূরত্ব। একটি বিচ্ছেদ শুধু দুটি মানুষের আলাদা হয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে ভেঙে যায় বহু স্বপ্ন, বদলে যায় বহু সম্পর্কের সমীকরণ, আর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে পরিবার ও সন্তানদের জীবনে। তাই বিবাহ এবং বিচ্ছেদ—উভয় বিষয়কেই ইসলাম গভীর দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার আলোকে বিবেচনা করেছে।
ইসলাম বিবাহকে অত্যন্ত মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। পরিবারকে সমাজের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার শিক্ষা দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ইসলাম মানুষের বাস্তবতাকেও স্বীকার করেছে। সব সম্পর্ক যে সফল হবে, সব দাম্পত্য যে সুখকর হবে—এমন ধারণা ইসলাম দেয় না।
কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যখন একসঙ্গে বসবাস উভয় পক্ষের জন্য কষ্ট, অশান্তি কিংবা অন্যায়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তখন ইসলাম তালাক বা ডিভোর্সের অনুমতি দিয়েছে। তবে এটি কোনোভাবেই প্রথম সমাধান নয়; বরং সব ধরনের সংশোধন, সংলাপ ও পুনর্মিলনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর গ্রহণযোগ্য শেষ পথ।
এ কারণেই ইসলামে তালাক বৈধ হলেও তা উৎসাহিত নয়। ইসলামী শিক্ষায় দাম্পত্য সম্পর্ক রক্ষা এবং পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ একটি বিচ্ছেদ কেবল স্বামী-স্ত্রীকে আলাদা করে না; এর প্রভাব পড়ে সন্তান, পরিবার এবং বৃহত্তর সমাজের ওপরও।
পবিত্র কোরআন দাম্পত্য সংকট সমাধানে ধৈর্য, সংলাপ ও সালিসের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। সূরা আন-নিসার নির্দেশনা অনুযায়ী, বিরোধ দেখা দিলে উভয় পরিবারের পক্ষ থেকে সালিস নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—রাগ, অভিমান কিংবা সাময়িক আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। সমস্যার সমাধানের জন্য আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে।
বর্তমান সময়ে অনেক দাম্পত্য সম্পর্ক এমন সব কারণে ভেঙে যাচ্ছে, যেগুলো পারস্পরিক বোঝাপড়া, ধৈর্য ও শ্রদ্ধার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, অহংবোধ, অতিরিক্ত প্রত্যাশা এবং ‘আমি কেন ছাড় দেব’ ধরনের মানসিকতা অনেক সম্পর্ককে অকারণে সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ একটি সফল দাম্পত্য শুধু ভালোবাসার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এর জন্য প্রয়োজন সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং একে অপরকে বোঝার আন্তরিক চেষ্টা।
তালাকের ক্ষেত্রেও ইসলাম একটি সুশৃঙ্খল ও মানবিক পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে। হঠকারিতা, ক্রোধ কিংবা প্রতিশোধের মনোভাব থেকে তালাক দেওয়ার অনুমোদন ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তালাকের পর ইদ্দতের সময় নির্ধারণ এবং পুনর্মিলনের সুযোগ রাখার পেছনেও রয়েছে গভীর প্রজ্ঞা। কারণ আবেগের বশে নেওয়া অনেক সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম সেই অনুশোচনার পথ রুদ্ধ না করে সংশোধনের সুযোগ রেখেছে।
একই সঙ্গে ইসলাম নারীর অধিকারকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছে। অনেকের ধারণা, বিচ্ছেদের ক্ষমতা কেবল পুরুষের হাতে। বাস্তবে ইসলামী শরিয়তে নারীর জন্যও খুলার মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে বের হওয়ার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ কোনো দাম্পত্য সম্পর্ক যদি একজন নারীর জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে, তবে তিনি নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন। এটি ইসলামের ন্যায়ভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
কোরআনের নির্দেশনা হলো: “হয় সুন্দরভাবে রেখে দাও, নয় সুন্দরভাবে বিদায় দাও।” এই সংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যেই ইসলামের তালাক-দর্শনের মূল কথা নিহিত রয়েছে। সম্পর্ক টিকে থাকুক কিংবা ভেঙে যাক, সম্মান, ন্যায়বিচার ও মানবিকতা যেন অক্ষুণ্ণ থাকে। তাই তালাককে অপমান, প্রতিশোধ, মানসিক নির্যাতন কিংবা ক্ষমতার প্রদর্শনের হাতিয়ার বানানোর কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।
তালাকের পরও দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং তখন শুরু হয় নতুন ধরনের দায়িত্ব। বিশেষ করে সন্তানের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবার বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় মানসিক মূল্য অনেক সময় সন্তানদেরই দিতে হয়। পারিবারিক ভাঙনের কারণে শিশুরা নিরাপত্তাহীনতা, একাকিত্ব, হতাশা ও মানসিক অস্থিরতার শিকার হতে পারে। তাই বিচ্ছেদ ঘটলেও সন্তানের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা ইসলাম দিয়েছে। সন্তান কখনো মা-বাবার বিরোধের হাতিয়ার হতে পারে না।
সমসাময়িক সমাজে দাম্পত্য ভাঙনের পেছনে অর্থনৈতিক কারণও ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, কোথাও কোথাও বিবাহকে পারিবারিক বন্ধনের চেয়ে আর্থিক হিসাব-নিকাশের বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। অস্বাভাবিক অঙ্কের কাবিন নির্ধারণ, সামাজিক প্রতিযোগিতা, পারিবারিক মর্যাদা প্রদর্শনের প্রবণতা কিংবা অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে অনেক সম্পর্ক শুরু থেকেই চাপের মধ্যে পড়ে। কাবিন অবশ্যই নারীর ন্যায্য অধিকার। কিন্তু যখন এটি পারস্পরিক আস্থার পরিবর্তে দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতার উপাদানে পরিণত হয়, তখন দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে তালাককে রাগের ভাষা কিংবা চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ফোন বা ক্ষণিকের আবেগের বশবর্তী হয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক পরিবারকে ভেঙে দিচ্ছে। অথচ ইসলাম তালাককে তাৎক্ষণিক আবেগের বিষয় নয়; বরং গভীর দায়িত্ববোধ, আত্মসংযম এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুতর সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করে।
ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি একদিকে পরিবারকে রক্ষা করতে চায়, অন্যদিকে অসহনীয় কষ্ট, জুলুম কিংবা অবিচারের মধ্যে কাউকে জোর করে আটকে রাখতেও চায় না। অর্থাৎ ইসলাম অন্ধভাবে বিচ্ছেদের পক্ষে নয়, আবার যেকোনো মূল্যে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার পক্ষেও নয়। বরং ন্যায়, মানবিকতা এবং মানুষের মর্যাদাকে কেন্দ্র করেই তার অবস্থান।
ভাঙন কখনোই কাম্য নয়, কিন্তু সব ভাঙন ব্যর্থতার গল্পও নয়। কখনো কখনো একটি বিচ্ছেদ অন্যায়, অশান্তি ও অসহনীয় কষ্ট থেকে মুক্তির পথ হয়ে ওঠে। তবে সেই সিদ্ধান্ত যেন না হয় রাগের, প্রতিশোধের বা আবেগের; বরং হোক বিবেক, ন্যায়বিচার ও দায়িত্ববোধের আলোকে নেওয়া একটি পরিণত সিদ্ধান্ত। ইসলাম সেই শিক্ষাই দেয়। তাই তালাক বা ডিভোর্সকে সাধারণ বিচ্ছেদ হিসেবে নয়, বরং একটি দায়িত্বশীল শেষ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা উচিত—যেখানে পরিবার, সন্তান, মানবিক মর্যাদা এবং আল্লাহর বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সমানভাবে বিবেচিত হয়। মানবিকতা, ন্যায় এবং ভারসাম্যের এই দর্শনই ইসলামের সৌন্দর্যকে অনন্য করে তুলেছে।
লেখক: প্রাক্তন ছাত্র, আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আল-আরাবিয়া মোজাহেরুল উলুম।
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আলেয়া মান্নান প্রিয়, তুমি একটি বার ভালোবেসে যেও। ব্যস্ততার পরে একবার অবসর করে আসিও...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার ডিজিটাল যুগে একটি ভিডিও কখনো কখনো হাজার বক্তৃতার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। কয়...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : সমকালীন বাংলা কবিতায় এমন কিছু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যেগুলো কেবল কবিতার সংকলন নয়; বরং সময়, স...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র ব...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : একসময় একটি চাকরি মানেই ছিল একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, স্বস্তি ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। মাস ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে যেমন প্রকাশ করে, তেমনি মানুষের মানবিকতা, রাষ্ট্...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited