বাংলাদেশ   রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬  

শিরোনাম

বুড়িগঙ্গা হত্যাযজ্ঞ: চার দশকের নোংরা রাজনীতি, লুটপাট ও অবরুদ্ধ নদীর আখ্যান

আমাদের বাংলা ডেস্ক :    |    ০৪:৫৭ পিএম, ২০২৬-০৬-১৬

বুড়িগঙ্গা হত্যাযজ্ঞ: চার দশকের নোংরা রাজনীতি, লুটপাট ও অবরুদ্ধ নদীর আখ্যান

​সাইফুল ইসলাম (তামিম), ডেমরা থানা:
​একটি নদীকে কীভাবে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা যায়, তার নিকৃষ্টতম উদাহরণ ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং গত চার দশক ধরে একশ্রেণীর ‘নদীখেকো’ মানুষ, রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল এবং প্রশাসনের চরম উদাসীনতায় বুড়িগঙ্গাকে এক মৃত নর্দমায় পরিণত করা হয়েছে। ১৯৮০-এর দশক থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত—পরিবর্তিত হয়েছে একাধিক সরকার, কিন্তু বুড়িগঙ্গার ভাগ্য বদলায়নি। প্রতিটি সরকারের আমলেই রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ এই নদীকে গ্রাস ও লুটপাট করেছে।
​জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন সময়ের তদন্ত প্রতিবেদন ও মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ করে বুড়িগঙ্গা ধ্বংসের এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নেপথ্যের কারিগরদের চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
​চার দশকের রাজনৈতিক গ্রাস: ১৯৮০ থেকে ২০২৬
​গত ৪৬ বছরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যে দল বা সরকারই এসেছে, বুড়িগঙ্গার বুক চিরে গড়ে উঠেছে তাদের দলীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের অবৈধ সাম্রাজ্য।
​১. এরশাদ আমল (১৯৮২-১৯৯০): শিল্পায়নের নামে দূষণের ভিত্তিপ্রস্তর
​এই আমলে বুড়িগঙ্গার তীরে হাজারীবাগে অপরিকল্পিতভাবে ট্যানারি শিল্পের বিস্তার ঘটে। পরিবেশ আইনের তোয়াক্কা না করে সরাসরি নদীর বুকে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম ও রাসায়নিক ফেলার লাইসেন্স যেন পরোক্ষভাবে দিয়ে দেওয়া হয়। তৎকালীন সরকারের স্থানীয় প্রভাবশালী ও ব্যবসায়ীরা নদীর তীরবর্তী নিচু জমি ও তলদেশ ভরাট করে প্রথম বড় ধরনের দখলদারিত্বের সূচনা করেন।
​২. বিএনপি ও আওয়ামী লীগ আমল (১৯৯১-২০০৬): দলীয় প্রভাবের মহোৎসব
​নব্বইয়ের দশক থেকে নদীর দুই পাড়ে দখলের রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়।
​বিএনপি আমল (২০০১-২০০৬): এই সময়ে বুড়িগঙ্গা ও আদি বুড়িগঙ্গার বিশাল অংশ ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, এমপি এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। কামরাঙ্গীরচর, সোয়ারীঘাট ও সদরঘাট এলাকায় নদীর সীমানা পিলার বিতর্কিতভাবে ভেতরের দিকে স্থাপন করে নদী ছোট করা হয়। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীদের মালিকানাধীন ডকইয়ার্ড, বালুর গদি এবং বহুতল ভবন গড়ে ওঠে বুড়িগঙ্গার বুকে।
​কারা জড়িত ছিলেন: জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের বিভিন্ন সময়ের খসড়া তালিকা ও স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি আসনের তৎকালীন একাধিক প্রভাবশালী সংসদ সদস্য, স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের প্রথম সারির নেতাসহ বেশ কয়েকজন ওয়ার্ড কমিশনার এই দখলের নেপথ্যে ছিলেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে থাকা কিছু কর্মকর্তা এবং রাজউকের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ভুয়া দলিল তৈরি করে নদীর জমি লিজ দেওয়া হয়েছিল।
​৩. আওয়ামী লীগ আমল (২০০৯-২০২৪): ‘উন্নয়নের’ আড়ালে করপোরেট দখলদারিত্ব
​বিগত দেড় দশকে বুড়িগঙ্গার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয়েছে করপোরেট ও রাজনৈতিক শক্তির অভূতপূর্ব সিন্ডিকেটের কারণে।
​গ্রাস ও লুটপাটের চিত্র: নদী রক্ষা কমিশনের তৈরিকৃত (যা পরবর্তীতে নানা চাপে গোপন করার চেষ্টা করা হয়) এবং পরিবেশবাদী সংগঠন ‘বাপা’ (BAPA)-এর তালিকায় বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের প্রায় ৮৯৪টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়। এই আমলে নদীর তীরে বিশাল বিশাল ডকইয়ার্ড, পাওয়ার প্ল্যান্ট, টেক্সটাইল মিল এবং আবাসন প্রকল্প (হাউজিং) গড়ে তোলেন তৎকালীন সরকারের সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং দলীয় ব্যবসায়ী গ্রুপ।
​কারা জড়িত ছিলেন: বিগত সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী শীর্ষ জনপ্রতিনিধি ও তৎকালীন কয়েকজন সংসদ সদস্যের (এমপি) প্রত্যক্ষ পরোক্ষ মদদে আদি বুড়িগঙ্গার বুক চিরে বহুতল মার্কেট ও কারখানা বানানো হয়। এছাড়া ওয়াটারফ্রন্ট সংলগ্ন বড় বড় শিল্প গ্রুপের মালিকরা (যারা তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে বা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন) নদীর তলদেশ ভরাট করে তাদের কারখানার সীমানা বাড়িয়েছেন। উচ্ছেদ অভিযানের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ করে ‘লোকদেখানো’ নাটক করা হলেও, ক্ষমতার জোরে পরদিনই আবার নদী পুনর্দখল হয়েছে।
​৪. অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমল (২০২৪-২০২৬): আইনি জটিলতা ও অন্তরাল
​সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে নতুন করে তালিকা তৈরি ও উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আমলাতান্ত্রিক ও আইনি মারপ্যাঁচে থমকে আছে। সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের অনেকেই এখন কারাগারে বা আত্মগোপনে থাকলেও, তাদের প্রতিষ্ঠিত অবৈধ স্থাপনাগুলোর বড় অংশই এখনো উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ বা বিভিন্ন রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের হাতবদলে টিকে রয়েছে।
​বুড়িগঙ্গার জন্য বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকি কি কি?
​বুড়িগঙ্গাকে সম্পূর্ণ 'ক্লিনিক্যালি ডেড' বা মৃত ঘোষণা করার পেছনে বর্তমানে প্রধান যে হুমকিগুলো কাজ করছে:
​১. আদি বুড়িগঙ্গার চিরতরে বিলুপ্তি: বুড়িগঙ্গার মূল প্রাণ ছিল এর ‘আডি চ্যানেল’ বা আদি বুড়িগঙ্গা। কামরাঙ্গীরচর এলাকার এই চ্যানেলটি প্রায় ৮০% ভরাট হয়ে গেছে। শত শত ঘরবাড়ি, সরকারি-বেসরকারি আবাসন ও সীমানা পিলার জালিয়াতির কারণে এটি এখন সরু নালায় পরিণত।
​২. গৃহস্থালি ও পয়ঃবর্জ্যের সরাসরি পতন: বুড়িগঙ্গায় ২৫৮টি সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৮০ হাজার কিউবিক মিটার তরল বিষাক্ত শিল্পবর্জ্য এবং ঢাকা শহরের গৃহস্থালি বর্জ্য সরাসরি পড়ছে। ঢাকার ওয়াসার সুয়ারেজ লাইনের একটি বড় অংশ কোনো ট্রিটমেন্ট ছাড়াই নদীতে গিয়ে মুক্ত হচ্ছে।
​৩. সীমানা পিলারের জালিয়াতি: বিআইডব্লিউটিএ এবং জেলা প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা সিএস (Cadastral Survey) খতিয়ান অমান্য করে, শুকনো মৌসুমের নদীর সীমানা ধরে সীমানা পিলার স্থাপন করেছে। এর ফলে নদীর কয়েক হাজার একর জমি আইনিভাবেই দখলদারদের পকেটে চলে গেছে।
​৪. রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও নাম গোপন করার সংস্কৃতি: জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কোটি কোটি টাকা খরচ করে ৪৮টি নদীর দখলদারদের যে চূড়ান্ত তালিকা করেছিল, প্রভাবশালীদের বাঁচাতে সেই তালিকা প্রকাশ না করে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ না করা নদীর জন্য অন্যতম বড় হুমকি।
​বিশেষজ্ঞ মন্তব্য:
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) মতে, “বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হলে কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির উচ্ছেদ নয়, বরং সিএস রেকর্ড অনুযায়ী নদীর আদি সীমানা উদ্ধার করতে হবে। নদীখেকোদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের ফৌজদারি অপরাধী হিসেবে বিচার না করলে বুড়িগঙ্গার পানি কোনোদিনও বিষমুক্ত হবে না।”
​রাজনীতির নোংরা খেলায় ঢাকার এই লাইফলাইন আজ ধুঁকে ধুঁকে মরছে। ২০২৬ সালেও বুড়িগঙ্গার কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি ঢাকাবাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয়—আইন আছে, প্রশাসন আছে, কেবল নেই নদীকে ভালোবাসার রাজনৈতিক সততা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এই রাক্ষসে ভরা নগরীর, নিরীহ অসহায় মানুষ দের একটা দাবি হচ্ছে, উনি যেনো এই শহরের প্রাণের নদীটির জীবন ফেরানোর চেষ্টা করেন।
 

রিটেলেড নিউজ

চতুর্থবারের মতো খোলা হলো শাহজালাল মাজারের দানবাক্স, মিলল প্রায় ৮৯ লাখ টাকা

চতুর্থবারের মতো খোলা হলো শাহজালাল মাজারের দানবাক্স, মিলল প্রায় ৮৯ লাখ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেট প্রতিনিধি : সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের টাকা গণনা শেষে চতুর্থ দফায় পাওয়া গ...বিস্তারিত


কুড়িগ্রামে বিএনপির ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান

কুড়িগ্রামে বিএনপির ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের অংশ হিসেবে পরিষ্কার-পরিচ...বিস্তারিত


বাড়ছে পানি, ৫ জেলায় বন্যার শঙ্কা

বাড়ছে পানি, ৫ জেলায় বন্যার শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক : বৃষ্টিপাত বেড়ে নদ-নদীর পানি সতর্কসীমায় পৌঁছালে দেশের পাঁচ জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। শনি...বিস্তারিত


পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে : লাভের আশায় ১১টি ট্রেন ইজারা দেবে রেল

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে : লাভের আশায় ১১টি ট্রেন ইজারা দেবে রেল

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : রাজশাহী প্রতিনিধি : পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ১১টি ট্রেন ইজারা দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে চারটি ট্রেনের দর...বিস্তারিত


ড্রোনে অপরাধী, ক্যাম্পাসে ইয়াবা: নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পুলিশ

ড্রোনে অপরাধী, ক্যাম্পাসে ইয়াবা: নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক : পুলিশের একাংশের পুরোনো ও অচল যানবাহন, পুলিশের অবস্থান নজরদারিতে অপরাধীদের ড্রোনের ব্যবহার এবং মে...বিস্তারিত


বিরোধীদলের কারণেই কেউ কেউ ডিসেম্বরে আসতে চায় : পানিসম্পদ মন্ত্রী

বিরোধীদলের কারণেই কেউ কেউ ডিসেম্বরে আসতে চায় : পানিসম্পদ মন্ত্রী

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : প্রথমদিন থেকেই বিরোধীদল প্রতিমুহূর্তে সরকারি দলকে অসহযোগিতা করার কারণেই ...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

নোয়াখালী প্রতিনিধি : : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্তার অ...বিস্তারিত


সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : সৌদি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, স্পীড লিমিট এর চাইতে অধিক গতিতে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের উপ...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর