শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৪:৪৫ পিএম, ২০২৬-০৭-১৮
একসময় একটি চাকরি মানেই ছিল একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, স্বস্তি ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। মাস শেষে বেতন হাতে পেলেই সংসারের প্রয়োজনীয় ব্যয় মিটিয়ে কিছু অর্থ সঞ্চয় করা যেত। সেই সঞ্চয় ছিল হঠাৎ কোনো বিপদের দিনে নির্ভরতার আশ্রয়। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন একটি চাকরি করেও অসংখ্য পরিবার মাসের শেষ সপ্তাহে আর্থিক সংকটে পড়ে। ব্যাংকে সঞ্চয় থাকলেও প্রয়োজনমতো তা ব্যবহার করতে মানুষ দ্বিধাগ্রস্ত হন। কারণ একবার সঞ্চয়ে হাত দিতে হলে বর্তমান বাস্তবতায় তা পুনর্গঠন করা সহজ নয়। ফলে ব্যাংকের হিসাবের অঙ্ক বাড়লেও মানুষের মনে নিরাপত্তা ও স্বস্তি বাড়ছে না।
একটি দেশের অর্থনৈতিক সাফল্য কেবল প্রবৃদ্ধির হার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত হয়, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে, ক্রয়ক্ষমতা বজায় থাকে এবং মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা রাখতে পারে। কিন্তু আজ বাস্তবতা ভিন্ন। সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ উন্নয়নের পরিসংখ্যান নয়; বরং সীমিত আয়ে সংসারের ব্যয় কীভাবে সামলানো যাবে, সেটিই তাদের প্রতিদিনের সংগ্রাম।
মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমার খবর মিললেও বাজারের বাস্তবতা সাধারণ মানুষকে তেমন স্বস্তি দেয়নি। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, দুধ, ওষুধ, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাস—জীবনের প্রায় প্রতিটি অপরিহার্য খাতে ব্যয় বেড়েছে। ফলে বেতন অপরিবর্তিত থাকলেও মানুষের প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। মাসের শুরুতে যে বেতনকে যথেষ্ট মনে হয়, মাসের শেষদিকে সেটিই প্রয়োজন মেটাতে অপ্রতুল হয়ে পড়ে। ফলে বহু পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, আবার অনেকেই ঋণের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে পারিবারিক অর্থনীতিতে। একসময় একটি চাকরির আয়েই একটি পরিবার স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারত। এখন একই পরিবারে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই আয় করলেও সংসারের ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। আর যেসব পরিবারের একটিমাত্র আয়ের উৎস, তাদের অবস্থা আরও নাজুক। অফিস শেষে অনেকে খণ্ডকালীন কাজ করছেন, কেউ অনলাইনে অতিরিক্ত আয়ের চেষ্টা করছেন, কেউ টিউশনি বা ছোটখাটো ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন। তবু আয়-ব্যয়ের ব্যবধান কমছে না। দ্বিতীয় আয়ের সুযোগ সবার ভাগ্যে জোটে না। ফলে একটি চাকরি থাকা সত্ত্বেও অনেক মানুষ ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন, প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছেন কিংবা বহু বছরের সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। একটি চাকরিতে সংসার না চলার এই বাস্তবতা শুধু ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও একটি গভীর সতর্কবার্তা।
একসময় ব্যাংকে অর্থ থাকা মানেই ছিল নিশ্চিন্ত ভবিষ্যতের প্রতীক। আজ সেই নিরাপত্তাবোধে ভাটা পড়েছে। চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা সংসারের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে অনেকেই আমানত ভাঙছেন। আবার অনেকে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সঞ্চয়ে হাত দিতে সাহস পাচ্ছেন না। কারণ তাঁরা উপলব্ধি করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সেই অর্থ পুনরায় সঞ্চয় করা সহজ হবে না। অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা থাকলেও তা মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ দূর করতে পারছে না।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সে তুলনায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও আগের মতো নিয়োগ দিচ্ছে না। কোথাও উৎপাদন সংকুচিত হয়েছে, কোথাও কর্মী ছাঁটাই হয়েছে, আবার কোথাও নতুন নিয়োগ স্থগিত রয়েছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণের চাপ এবং কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতার কারণে টিকে থাকার লড়াই করছেন। একটি ছোট ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে কেবল একজন উদ্যোক্তার ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে কয়েকটি পরিবারের জীবিকাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। এই বাস্তবতা অর্থনীতির ভেতরে জমে ওঠা চাপেরই বহিঃপ্রকাশ।
মুদ্রাস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী চাপের সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য রাষ্ট্রের কিছু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও মধ্যবিত্তের জন্য কার্যকর কোনো সুরক্ষা বলয় নেই। সামাজিক মর্যাদা ও আত্মসম্মানের কারণে এই শ্রেণির মানুষ অনেক সময় নিজেদের সংকট প্রকাশও করতে পারেন না। সন্তানের লেখাপড়া, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে গিয়ে বহু পরিবার তাদের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় হারাচ্ছে। অনেকে ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন, কেউ অলংকার বিক্রি করছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দিচ্ছেন। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এভাবেই স্বাবলম্বী মধ্যবিত্তের একটি অংশ ধীরে ধীরে ‘নতুন দরিদ্র’ শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছে। এটি শুধু একটি সামাজিক সংকট নয়; অর্থনীতির জন্যও একটি অশনিসংকেত।
গ্রামীণ অর্থনীতিও নানামুখী চাপে রয়েছে। কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তা কৃষকের আয়কে সংকুচিত করছে। অন্যদিকে গ্রামে শিল্পায়ন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছেন। কিন্তু শহরও তাদের প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান দিতে পারছে না। ফলে বেকারত্ব, অর্ধবেকারত্ব এবং অনিশ্চিত আয়ের এক দুষ্টচক্র তৈরি হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে সমাজজীবনের প্রতিটি স্তরে। যখন একটি পরিবার চিকিৎসা পিছিয়ে দেয়, সন্তানের শিক্ষার ব্যয় কমিয়ে দেয়, পুষ্টিকর খাদ্যের পরিবর্তে নিম্নমানের খাদ্য গ্রহণে বাধ্য হয় কিংবা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা স্থগিত রাখে, তখন তার নেতিবাচক প্রভাব ব্যক্তি ও পরিবার ছাড়িয়ে জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়ে। দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ, পারিবারিক অস্থিরতা এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়িয়ে তোলে।
এই বাস্তবতা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। উন্নয়নের সাফল্য কেবল জিডিপির প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন একজন চাকরিজীবী একটি চাকরির আয়েই মর্যাদার সঙ্গে পরিবার পরিচালনা করতে পারবেন; যখন একজন তরুণ শিক্ষাজীবন শেষে কর্মসংস্থানের বাস্তব সম্ভাবনা দেখতে পাবেন; যখন একজন উদ্যোক্তা লোকসানের আশঙ্কার বদলে নতুন বিনিয়োগের সাহস পাবেন; এবং যখন মধ্যবিত্তকে সঞ্চয় ভেঙে টিকে থাকার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে না।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার, বেসরকারি খাত এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর বাজার তদারকি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে অর্থায়ন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকর সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও অপচয় রোধ, নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধি কোনো অর্থনীতির ইতিবাচক সূচক হতে পারে; কিন্তু সেই অর্থ যদি মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে না পারে, তবে তার প্রকৃত তাৎপর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। একইভাবে প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেও যদি মানুষের প্রকৃত আয় কমে, একটি চাকরিতে সংসার না চলে এবং মধ্যবিত্ত ধীরে ধীরে দারিদ্র্যের দিকে পিছিয়ে যেতে থাকে, তবে সেই উন্নয়নের সুফল নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
আজ প্রয়োজন এমন একটি অর্থনীতি, যেখানে মানুষের হাতে কাজ থাকবে, শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হবে, সঞ্চয় হবে নিরাপত্তার প্রতীক এবং একটি চাকরিই একটি পরিবারের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট হবে। কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো অবকাঠামো বা পরিসংখ্যান নয়—রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। সেই মানুষ যদি নীরবে দারিদ্র্যের দিকে এগিয়ে যায়, তবে তা শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের ভবিষ্যতের জন্যও এক গভীর অশনিসংকেত।
লেখক: সভাপতি, লাভ বাংলাদেশ পার্টি, চট্টগ্রাম মহানগর।
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মিজানুর রহমান চৌধুরী : রাজনীতি মানে কি ধোঁকাবাজি? অব্যাহত বাটপারি, মিথ্যাবাদিতা ও প্রতারণা করা! আজ...বিস্তারিত
মিজানুর রহমান চৌধুরী : ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনে ছাত্র-জনতার রক্তঝরা গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ীদের বিজয় বেহাত করে মাফিয়া চক্রে...বিস্তারিত
মিজানুর রহমান চৌধুরী : “রাষ্ট্র আসলে কারা চালায়?” — এই প্রশ্নটি আজ আর কেবল কৌতূহল নয়, এটি এক তীব্র বাস্তবতা। একটি স্বা...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : ভাষাশহিদ সালামের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন পরিষদ গঠিত হয়েছে। শনিবার ঢাকার গুলশানে আয়োজিত এক বৈঠকে র...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মিজানুর রহমান চৌধুরী: আমাদের গ্রামীন জনপদে ভিলেজ পলিটিক্স নামে একটা কথা প্রচলিত আছে। যাঁরা গ্রা...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মিজানুর রহমান চৌধুরী সর্বদলীয় মাফিয়া সিন্ডিকেট প্রত্যেক সরকারের আমলে এক শ্রেণীর দূণীর্তিবাজ...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited