শিরোনাম
আমাদের বাংলা ডেস্ক : | ০৪:৪৮ পিএম, ২০২৫-১১-১০
মা’র কাছে নূর হোসেন
১৪.০২.৯৭ (রচনাকাল)
(একটি কাল্পনিক চিঠি)
স্নেহহময়ী মা- আমার,
ভালবাসা নিও। ভালবাসায় কত কষ্ট- তা আমি জানি। তারপরও তোমাকে ভালবাসা দিলাম। এই ভালবাসায় আছে শ্রদ্ধা, আছে দিতে না পারার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা। কারণ তোমরা আমার কাছে অনেক কিছু চেয়েছিলে, যা আমি দিতে পারিনি। আমি আজ রিক্ত, শূণ্য, ভালোবাসা ছাড়া আমার আর কিছু দেবার নেই। মা সত্যিই করে বলো তো- তুমি কি কখনো ধারণা করেছিলে তুমি বেঁচে থাকতে থাকতেই তোমার চোখের সামনেই তোমার ছেলে নূর হোসেন স্বর্গলোকের বাসিন্দা হয়ে যাবে? আমি জানি, মা- কান্না ছাড়া কোন উত্তরই তুমি দিতে পারবে না।
মা, তোমাকে আজ চিঠি লিখছি। কিন্তু পোস্ট করব কিনা জানি না। আর পোস্ট করেই বা কি হবে? আর ওখানে আজ কেউ যেতে চায় না। মা, তোমার কাছে কোন কিছু লেখার ইচ্ছে ছিল না, বাধ্য হয়েই তোমার কাছে লিখতে বসেছি। কেন বাধ্য হয়েছি শুনবে, মা, শুনবে? সেদিন মিলন ভাই, মানে সেই ডাক্তার আর আমি ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীর খুব কাছে চলে এসেছিলাম। সত্যিই করে বলছি, মা- তোমাকে দেখার লোভ সামলাতে পারিনি। উঁকি দিলাম পূর্বের জানালা দিয়ে। বিশ্বাস কর- অই দৃশ্য দেখতে হবে- আমি স্বপ্নেও ভাবিনি- সেই হায়েনা, সেই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী আমাদের ঘরে। মা, পৃথিবী থেকে আসার পর কাঁদতে ভুলে গিয়েছিলাম। সেই অসহনীয় দৃশ্য দেখে ডুঁকরে কেঁদে উঠেছিলাম। আমার সেই কান্নায় বাংলাদেশের বিবেক গুলোই কেবল লজ্জা পেয়েছিল। মিলন ভাইয়ার কাছে প্রশ্ন করেছিলাম- “এত দুঃসাহস ও পেল কোত্থেকে?” মিলন নির্বাক, মিলন নিরুত্তর!
মা, মাগো- তোমার মত হাজারো লক্ষ মায়ের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য তোমার বুকে কান্নার ঢেউ চেপে দিয়েছিলাম। শূণ্য করেছিলাম তোমার কোল। কান্নার ঢেউ তোমার চোখে আছড়ে পড়ে কপোল বেয়ে গড়িয়ে গেল অশ্রæ হয়ে। ওরা কেউ মুছতে আসল না। তারা তখন মসনদ নিয়ে কাড়াকাড়িতে ব্যস্ত। আর উপর থেকে আমরা দেখতে পেলাম এক ঝাঁক কুকুর হাড্ডি নিয়ে কামড়াকামড়ি করছে। উপরের মানুষেরা দ্রব্য দেখতে পায় না, দেখতে পায় তার রূপক, মানুষ দেখতে পায় না দেখতে পায় তাদের স্বভাব। মা, আমাকে ক্ষমা করে দাও আমি বুঝিনি কিংবা আমাকে বুঝতে দেয়া হয়নি- আমি গণতন্ত্রের জন্য নয়, মানুষের মুক্তির জন্যও নয়, আমি আসলে সংগ্রাম করছিলাম কিছু ক্ষমতা লিপ্সু জোঁকের জন্য। মা, এই জোঁকগুলো খুব রক্ত ভালোবাসে। এই জোঁক গুলো রক্তপান করে আর সেই রক্তেই হামাগুঁড়ি দিয়ে গিয়ে বসে মসনদে। তাই রক্তের নেশা ওদের শেষ হয় না। সত্যিই বলছি মা- তোমার হোসেন যদি এত সব বুঝতো তবে বুকে পিঠে চিকা মেরে কালো রাজপথ লাল করতে যেতো না।
মা, মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকের সাথেই আমার জানা শুনা হয়ে গেছে। আমার চেয়েও বেশী দুঃখ তাঁদের। রাজাকার যখন পুনর্বাসিত হয়, তখন তাঁদের দুঃখের সীমা- পরিসীমা যে থাকতে পারে না, সেটা তো মা তুমি নিজেই বুঝতে পারছো। তখন তাঁদের অনেকই বলতে শুনেছি, “বাংলাদেশ নামের কোন দেশকে স্বাধীন করেছিলাম- সেটা ভুলে থাকতে চাই।”
মা, তোমার ছেলের নামে গড়ে তোলে চত্বরে গিয়েছো কখনো? না গিয়ে থাকলে ভালই করেছে। অন্যদের মত তুমিও ধোকায় পড়ে যাবে। ওটা দিয়ে জীবিত মানুষদেরকে ধোঁকা দেয়া যায়। নূর হোসেনদের ধোঁকা দেয়া যায় না, মা।
মা, অনুষ্ঠান করে, আয়োজন করে- মুক্তিযোদ্ধাদের, গণতন্ত্রের শহীদদের শান্তি কামনা করা হয়। স্বর্গলোকের সবার মত আমারও হাসি পায় এসব দেখে। নূর হোসেনরা ওভাবে শান্তি পায় না, পেতে পারে না। তাদের স্বপ্নের সমাধি সৌধ যত উচু হবে, ততই অশান্তি বাড়বে তাদের।
মা, আমার মৃত্যুর পরপর তুমি কত রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছিলে- তোমার হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠা কান্নার শব্দে পুত্র হারা বুক ভাংগা কর্মক্লান্তি বাবা আমার জেগে উঠত। তোমার মাথায় বাবার সান্তনার হাত- নীরব নিস্তব্ধ রাত্রি- চারটি জলে ধোয়া চোখ আকাশে ভেসে থাকা এক ফালি চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতো। হয়তো তুমি ভাবতে- “আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা” আর ছোট বেলার সেই ছোট্ট সোনামণি নূর হোসেনকে। তারপর তো অনেক দিন গেল। সংসারে অভাবের টানা হেঁচড়া আর জীবন টেনে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে তোমরা নূর হোসেনের ভাবনা খুব কমই ভাবতে পারতে। ফলে হোসেনের অনুপস্থিতিতে আজ এক প্রকার গা- সওয়া গেছে। আমি এখনো বুঝতে পারিনি মা- দুঃখ, কষ্ট, স্বজন হারানোর বেদনা কি করে মনের মধ্যে চাপা পড়ে যায়? আমার মৃত্যুর পরপর তোমার মনে ঘটে যাওয়া যন্ত্রনাগুলি উপলব্ধি করে ইচ্ছে হতো প্রকৃতির ধারাটা পাল্টে দিই- ফিরে যাই তোমার বুকে।
ঢাকায় রাত নেমেছে ঘন হয়ে। টক টক করে কাঁপছে রাস্তায় নেমে পড়া চামড়া পেঁচানো মানুষের জীবিত কঙ্কালগুলো। একটু আগে হুমায়ুন আহমেদ চলে গেলেন। শীতের কাপড় বিলি করতে এসেছিলেন। শেষ পর্যন্ত নিজের গায়ে পরা সুয়েটারটি পর্যন্ত বিলিয়ে দিয়ে গেলেন। মা, উনি আমাকে শিক্ষা দিলেন। কিন্তু বড্ড দেরী হয়ে গেছে মা, বড্ড দেরী। এখন মনে হচ্ছে- গণতন্ত্রের জন্য জীবন না দিয়ে যদি শীতের এই রাতে নিজের গা থেকে সুয়েটার খুলে শীতে কষ্ট পাওয়া মানুষকে দিতে পারতাম অনেক ভাল হতো, অনেক মংগলময় হতো।
মা, তোমার মনে কি পড়ে বেঁচে থাকতে কতো রাত ছটফট করতে করতে পাঠিয়ে দিতাম দেশটাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে। রাতের আধারে আমার প্রিয় মাতৃভূমিকে ওরা লণ্ডভণ্ড করে দিবে। রাত যতো বাড়তো ভয় ও তত বাড়তো। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি- আমার সেই ভয় পাওয়া সেই ছটফটানি সবই অনর্থক। কারণ- ওরা দিন আর রাত উভয়কেই সমান ভাবে অপবিত্র করতে পারে।
রাত নেমেছে ঢাকায়। গভীর হয়ে। শীতল হয়ে। এই রকম নিস্তব্ধ রাতের নীরবতা যত বাড়তো, হৃদয়ের সুন্দর বুদ্ধি গুলি তত বেশী চিন্তা করার সুযোগ পেত। বিবেকগুলির আওয়াজও বাড়তে থাকতো। কোটি কোটি বিবেকবান মানুষ আমার হৃদয়ের গভীরে যাওয়া আসা করত।
মা, তোমার ঘুমন্ত চোখের পাতা দেখে বুঝতে পারছি- রাত্রির নিস্তব্ধতা তোমার কাছে কতটা প্রিয়! স্নেহমাখা মুখের ক্লান্ত ভাঁজগুলি মনে করিয়ে দিচ্ছে কতটা সংগ্রাম করে টিকে আছ তুমি! অভাবে আক্রান্ত তোমার জীবনে নূর হোসেন আজ হারিয়ে যাওয়ার বস্তুর মতোই মূল্যবান (হয়েও) মূল্যহীন।
ইতি
স্নেহসিক্ত
নূর হোসেন
স্বর্গলোক থেকে
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার : ডিজিটাল সময়ের এক বহুল উচ্চারিত প্রশ্ন—Facebook-এ কেউ কিছু লিখলেই গণমাধ্যম কেন তা ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার : চট্টগ্রামে সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে ৩১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ১৯ দিনব্যাপী স্...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার ফেব্রুয়ারি মানেই বই-এর মৌ মৌ ঘ্রাণ, গল্প-কবিতার সমাহারে মেলার ক্যানভাস। নয়ত...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : সামিয়া হোসেন মুনিয়া : নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) প্রধান ফটক দিয়ে প্...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : লেখক: মাহাবুব রহমান দুর্জয় : এক ক্লিকেই ভাঙছে সম্পর্কের নীরব বন্ধন : একটা সময় ছিল, সন্ধ্যা নামলেই ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মেহেদী হাসান : ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ— এখানে প্রতিটি ঋতু আসে নিজস্ব রূপ, রস ও গন্ধ নিয়ে। ঠিক তেমনি নো...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited