শিরোনাম
আমাদের বাংলা ডেস্ক : | ০৪:৪৭ পিএম, ২০২৫-১১-১৩
লেখক: মাহাবুব রহমান দুর্জয় :
এক ক্লিকেই ভাঙছে সম্পর্কের নীরব বন্ধন :
একটা সময় ছিল, সন্ধ্যা নামলেই স্ত্রী অপেক্ষা করতেন কখন স্বামী ফিরবে, কখন সন্তানদের সঙ্গে বসে গল্প হবে, হাসাহাসি হবে। সংসারের সেই উষ্ণতা, একে অপরের প্রতি যত্ন ও আগ্রহের ভেতরে ছিল এক ধরনের মমতা ও মানবিকতা। কিন্তু আজকের বাস্তবতা বদলে গেছে। এখন অনেক স্ত্রীর কাছে স্বামীর আগমন অপেক্ষার চেয়ে ফোনের স্ক্রিনই বেশি আকর্ষণীয়। আবার অনেক স্বামী অফিস শেষে পরিবারের সঙ্গে সময় না কাটিয়ে ফোনেই হারিয়ে যান ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এই পরিবর্তন এসেছে নিঃশব্দে, কিন্তু প্রভাব ফেলছে গভীরভাবে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনে সুবিধা ও গতি এনেছে ঠিকই, কিন্তু সেটি যখন জীবনের সহায়ক থেকে প্রধান সঙ্গী হয়ে ওঠে তখনই সঙ্কট শুরু হয়।
স্মার্টফোনের দখলে ব্যক্তিগত জীবন :
স্মার্টফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয় এটি বিনোদনের উৎস, কর্মক্ষেত্রের যন্ত্র, আত্মপ্রকাশের মঞ্চ এবং গোপন সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইনবক্স, ভিডিও কল, শর্ট ভিডিও সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ভার্চুয়াল জগত, যেখানে মানুষ বাস্তবতার চেয়ে বেশি সময় কাটায়। ফলে বাস্তব সম্পর্কের প্রতি মনোযোগ কমছে। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা-সন্তান সবাই একসঙ্গে থেকেও আলাদা জগতে বাস করছে। টেবিলে বসে খাওয়া হয়, কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না; সবাই নিমগ্ন নিজের ফোনে। এক ছাদের নিচে থেকেও মানুষ একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে সেটাই আজকের বাস্তবতা।
পরকীয়া ও ভার্চুয়াল বন্ধুত্বের ফাঁদ :
অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের একটি মারাত্মক সামাজিক পরিণতি হলো পরকীয়া সম্পর্কের বৃদ্ধি। আগের যুগে এমন সম্পর্ক গড়ে উঠতে সময় ও সাহস লাগত, এখন একটি ইনবক্স মেসেজই যথেষ্ট। বাস্তব জীবনে যখন কেউ অবহেলিত বা একাকী বোধ করে, তখন সে ভার্চুয়াল বন্ধুত্বে সান্ত্বনা খোঁজে। কোনো অপরিচিত মানুষ কয়েকটি মিষ্টি কথা বললেই সেখানে জন্ম নেয় মানসিক আকর্ষণ, যা পরবর্তীতে পরকীয়ায় রূপ নিতে দেরি হয় না। বাংলাদেশের নগরজীবনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে “সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর মানসিক দূরত্ব”। স্মার্টফোনে গোপন বার্তা আদানপ্রদান, ভিডিও চ্যাট, কিংবা অনলাইন বন্ধুত্বের ফলে ভাঙছে অসংখ্য সংসার, দূরে সরে যাচ্ছে পরিবার।
সন্তানদের মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব :
এই সমস্যার আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো সন্তানদের ওপর প্রভাব। বাবা-মা যখন সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত, সন্তানরা শেখে মানুষের সঙ্গে নয়, স্ক্রিনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে। ফলাফল হিসেবে দেখা যায়, অনেক শিশু অল্প বয়সেই গেম আসক্তি, ইউটিউব নির্ভরতা কিংবা পর্নোগ্রাফির জগতে ঢুকে পড়ছে। বাস্তব জগতের সঙ্গে তাদের সংযোগ কমছে, সামাজিক দক্ষতা হারাচ্ছে। পরিবারে ভালোবাসা ও মনোযোগের অভাব তাদের ঠেলে দিচ্ছে ভুল পথে মাদক, সহিংসতা ও মানসিক বিকারগ্রস্ততার দিকে।
সংসারের নীরব ভাঙন :
স্মার্টফোন ব্যবহার এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেকেই নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে ভুলে যাচ্ছেন। আগে যেখানে একে অপরের জীবনের খবর জানার জন্য মুখোমুখি আলাপ হতো, এখন সবকিছু সীমাবদ্ধ “স্ট্যাটাস আপডেট”-এ। একজন স্ত্রী যখন দেখেন স্বামী ফোনে ব্যস্ত, তখন মনে করেন “আমি আর গুরুত্বপূর্ণ নই।” আবার স্বামীও ভাবেন “সে আমার চেয়ে অন্যদের সঙ্গে বেশি সময় দেয়।” এই সন্দেহ, অবিশ্বাস ও মানসিক দূরত্বই অনেক সুখী সংসারকে ধীরে ধীরে ঠেলে দেয় ভাঙনের দিকে।
আসলে দোষ কার?
দোষ ফোনের নয় দোষ আমাদের ব্যবহারবোধের। কাজের প্রয়োজনে ফোন ব্যবহারে সমস্যা নেই, কিন্তু যখন বিনোদনের নামে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়, তখন সেটিই আসক্তি। সময় বণ্টনের ব্যর্থতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাবই মূল কারণ। আমরা নিজেদের জীবনে সময় দিই ফোনকে, কিন্তু প্রিয়জনকে নয়। অথচ কিছু মুহূর্তের মনোযোগ, একটি হাসি, একটি প্রশ্ন “তুমি কেমন আছো?” সম্পর্ককে অনেক বেশি দৃঢ় করে তুলতে পারে।
সমাধানের পথে: সচেতনতা ও পারিবারিক শৃঙ্খলা-
পারিবারিক নীতি: প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা নির্দিষ্ট সময়ে সবাই ফোন সরিয়ে রেখে একসঙ্গে বসার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
খাবার ও ঘুমের সময় ফোনমুক্ত পরিবেশ: পরিবারের সঙ্গে সময়ে ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা উচিত।
সন্তানদের শিক্ষা: ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে বাস্তব সম্পর্কই সত্যিকারের সম্পর্ক, ভার্চুয়াল নয়।
ডিজিটাল শৃঙ্খলা: স্কুল, অফিস, এমনকি মিডিয়াতেও প্রযুক্তি ব্যবহারের নৈতিকতা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
মানসিক যোগাযোগ: স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা-সন্তান সবাইকে একে অপরের প্রতি শ্রবণ ও বোঝাপড়ার চর্চা করতে হবে।
শেষ কথা : স্মার্টফোন আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ, একে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যেন ভুলে না যাই, প্রযুক্তি মানুষের বিকল্প নয়। ভালোবাসা, যত্ন, বোঝাপড়া এসব আসে মন থেকে, স্ক্রিন থেকে নয়। যদি আমরা ফোনের পর্দায় ডুবে থেকে প্রিয়জনের চোখের দিকে তাকানো ভুলে যাই, তাহলে প্রযুক্তি নয়, আমরা নিজেরাই নিজের সম্পর্ক ধ্বংস করছি।
তাই আজই সিদ্ধান্ত নিতে হবে-
স্মার্টফোন ব্যবহার করব প্রয়োজনে, কিন্তু কখনোই তা আমাদের জীবনের সম্পর্ক, স্নেহ ও মানবিকতাকে ছাপিয়ে যাবে না।
লেখক পরিচিতি:
মাহাবুব রহমান দুর্জয়- লেখক, সমাজ বিশ্লেষক ও কলামিস্ট। সমসাময়িক সামাজিক পরিবর্তন, প্রযুক্তি ও মানবিক সম্পর্ক নিয়ে নিয়মিত লেখেন।
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার : ডিজিটাল সময়ের এক বহুল উচ্চারিত প্রশ্ন—Facebook-এ কেউ কিছু লিখলেই গণমাধ্যম কেন তা ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার : চট্টগ্রামে সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে ৩১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ১৯ দিনব্যাপী স্...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার ফেব্রুয়ারি মানেই বই-এর মৌ মৌ ঘ্রাণ, গল্প-কবিতার সমাহারে মেলার ক্যানভাস। নয়ত...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : সামিয়া হোসেন মুনিয়া : নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) প্রধান ফটক দিয়ে প্...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মেহেদী হাসান : ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ— এখানে প্রতিটি ঋতু আসে নিজস্ব রূপ, রস ও গন্ধ নিয়ে। ঠিক তেমনি নো...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : চৌধুরী নওরাজ মাহমুদ সাদুল্লাহ, নোবিপ্রবিঃ আকাশ জুড়ে ছিল ভোরের নরম আলো। হঠাৎ করেই এক নতুন দিনের সূ...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited