শিরোনাম
আমাদের বাংলা ডেস্ক : | ০৪:২১ পিএম, ২০২৫-১১-১৫
সামিউল আজাদ শামীম :
শিশুদের পৃথিবী রঙে রঙে ভরা। তারা রঙ পছন্দ করে, তারা উজ্জ্বলতা ভালোবাসে, তারা চায় জীবন হোক আনন্দে ভরা। কিন্তু সেই রঙের জগৎ যখন খাবারের সঙ্গে মিশে যায়, তখন সেটি আনন্দ নয়Ñবরং এক অদৃশ্য বিপদ হয়ে দেখা দেয়। আজকের শিশুদের খাবারের তালিকায় যত রঙিন ও আকর্ষণীয় পণ্য যুক্ত হচ্ছে, ততই তাদের শরীরে জমছে ধীরে ধীরে নীরব বিষ। টেলিভিশন, ইউটিউব, দোকানের তাক কিংবা স্কুলের টিফিনÑযেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই রঙিন চিপস, চকচকে টফি, জেলি, কোমল পানীয়, কেক, বিস্কুট, নুডলস কিংবা আইসক্রিম। এইসব খাবার দেখতে সুন্দর, খেতে মজাদার, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি, যার প্রভাব পড়ছে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে। আজকের শিশু আগের প্রজন্মের মতো মাঠে খেলাধুলা করে না, ঘরে বসেই টেলিভিশন বা মোবাইলের পর্দায় কার্টুন দেখে। বিজ্ঞাপনগুলো এত চতুরতার সঙ্গে তৈরি করা হয় যে, শিশুদের মনে সেই খাবারের প্রতি তীব্র আকর্ষণ তৈরি হয়। কোনো কার্টুন চরিত্র যখন বলে “এই চিপস খেলে তুমি হবে শক্তিশালী”, তখন শিশু সেটি বিশ্বাস করে। অভিভাবকেরাও ব্যস্ত জীবনের চাপে সন্তানকে খুশি রাখতে কিংবা চুপ করাতে সহজ পথ বেছে নেনÑএকটি ক্যান্ডি, একটি প্যাকেট চিপস কিংবা ঠান্ডা পানীয়। সন্তান খুশি, তারা নিশ্চিন্তÑকিন্তু আসলে তারা জানেন না, সন্তানের শরীরে ঢুকছে ধীরে ধীরে এমন সব উপাদান যা ভবিষ্যতে ভয়াবহ রোগের কারণ হতে পারে। রঙিন খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত হয় সিনথেটিক ফুড কালার, প্রিজারভেটিভ, আর্টিফিশিয়াল ফ্লেভার, ট্রান্সফ্যাট, অতিরিক্ত চিনি ও সোডিয়াম। এগুলোর বেশিরভাগই শিশুদের দেহের জন্য বিষের সমান ক্ষতিকর। যেমন টারট্রাজিন (ঊ১০২), সানসেট ইয়েলো (ঊ১১০), কারমোয়াইন (ঊ১২২), পনসো ৪জ (ঊ১২৪)Ñএসব খাদ্যরং অনেক দেশে নিষিদ্ধ। কারণ এগুলো শিশুদের মধ্যে অ্যালার্জি, অ্যাজমা, ত্বকের প্রদাহ, মস্তিষ্কের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা, অতিসক্রিয়তা ও মনোযোগহীনতা তৈরি করে। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে এসব ক্ষতিকর রং এখনো অবাধে ব্যবহৃত হচ্ছে। ছোট ছোট স্থানীয় কারখানায় তৈরি এসব খাদ্যে মান নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই, এমনকি কোনো অনুমোদন ছাড়াই দেশের প্রতিটি দোকানে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন একটি শিশু গড়ে ৩ থেকে ৫ ধরনের প্রক্রিয়াজাত রঙিন খাবার খায়Ñযেমন টফি, চিপস, জেলি, কোমল পানীয়, চকলেট, বা রঙিন বিস্কুট। এগুলোর মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে রাসায়নিক রং ও সংরক্ষণকারী পদার্থ। শিশুদের শরীরের ওজন কম হওয়ায় এসব রাসায়নিক দ্রুত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। প্রথম দিকে হয়তো বাহ্যিকভাবে বোঝা যায় না, কিন্তু ধীরে ধীরে এর প্রভাব দেখা দেয় পাচনতন্ত্রে, ত্বকে, এমনকি মস্তিষ্কে। শিশুরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে, মনোযোগ হারায়, স্কুলের পড়ায় আগ্রহ কমে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, তারা সহজে রেগে যায়, চিৎকার করে, অস্থির আচরণ করেÑযা আসলে রাসায়নিক রঙের স্নায়ুপ্রভাবের ফলাফল।
অভিভাবকেরা অনেক সময় মনে করেন, এসব খাবার সামান্য খাওয়ায় কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, ক্ষতি তাৎক্ষণিক না হলেও দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ। কৃত্রিম রং ও সংরক্ষণকারী পদার্থ শরীরে জমতে জমতে লিভার, কিডনি ও হার্টে প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত চিনি ও ট্রান্সফ্যাট শিশুর শরীরে চর্বি জমায়, রক্তে ইনসুলিনের ভারসাম্য নষ্ট করে, এবং শিশুদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। একসময় যে ডায়াবেটিস ছিল প্রাপ্তবয়স্কদের রোগ, তা আজ শিশুদের মধ্যেও দেখা দিচ্ছে। এটি শুধু একটি খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন নয়Ñএটি একটি সামাজিক বিপর্যয়। বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে আইন, কিন্তু তার প্রয়োগ সীমিত। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (ইঝঞও) কিছু রংয়ের ব্যবহার সীমিত করেছে, কিন্তু অনেক ক্ষুদ্র কারখানা এই নিয়ম মানে না। তারা ব্যবহার করে সবচেয়ে সস্তা শিল্পজাত রং, যা মূলত বস্ত্র বা প্লাস্টিক শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী। এই রংগুলো খাবারের সঙ্গে মিশে যায়, এবং শিশুদের শরীরে প্রবেশ করে বিষের মতো কাজ করে। মাঝে মাঝে প্রশাসনিক অভিযান হয়, কিছু পণ্য জব্দ হয়, খবরের কাগজে শিরোনাম হয়, কিন্তু কয়েকদিন পরই সব আগের মতো হয়ে যায়। কারণ তদারকির ধারাবাহিকতা নেই, আর ব্যবসায়ীদের প্রভাব অনেক। অন্যদিকে, বিজ্ঞাপন ও বিপণন কৌশল রঙিন খাবারের চাহিদাকে বাড়িয়ে তুলছে। শিশুদের লক্ষ্য করে তৈরি বিজ্ঞাপনগুলো একধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতারণা। সেখানে দেখানো হয়, যারা এই খাবার খায় তারা বেশি আনন্দে থাকে, বেশি বুদ্ধিমান, বেশি জনপ্রিয়। ফলে শিশুর মনে জন্ম নেয় একধরনের বিভ্রমÑএই খাবার মানেই আধুনিকতা, আনন্দ আর সাফল্য। এমনকি গ্রামীণ এলাকাতেও এই প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে। এখন গ্রামের হাটে হাটে, স্কুলের গেটের পাশে দেখা যায় একই দৃশ্যÑদোকানের সামনে সারি সারি রঙিন প্যাকেট, হাতে হাতে শিশুর টফি ও জেলি। তারা জানে না, সেই মিষ্টি স্বাদের ভেতরে কী বিষ লুকিয়ে আছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশুদের খাদ্য শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব। আমাদের স্কুলগুলোতে শিশুরা শেখে না কোন খাবার স্বাস্থ্যকর, কোনটি ক্ষতিকর। টিফিনের সময় দেখা যায়, সবাই হাতে করে নিয়ে এসেছে প্যাকেটজাত খাবার। ঘরে বানানো টিফিন এখন পুরনো দিনের গল্প। বিদ্যালয়ে যদি নিয়মিতভাবে স্বাস্থ্য শিক্ষা বা পুষ্টিবিদ্যা শেখানো হতো, যদি শিক্ষকরা টিফিনে ঘরে বানানো খাবার আনতে উৎসাহ দিতেন, তবে অনেক শিশু হয়তো রঙিন খাবারের এই ফাঁদ থেকে বাঁচতে পারত। অভিভাবকেরাও সচেতনতার ঘাটতিতে ভোগেন। সন্তান স্কুলে যাচ্ছে, খালি হাতে যেন না যায়Ñএই চিন্তা থেকেই তাঁরা দোকান থেকে কিছু কিনে দেন। কিন্তু তারা জানেন না, সেই “সন্তানের হাসি ফোটানোর খাবার” ধীরে ধীরে তার শরীরে অসুখের বীজ বপন করছে। অনেক বাবা-মা নিজেরাও ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবারে অভ্যস্ত। ফলে সন্তান তাদের অনুসরণ করে একই অভ্যাস গড়ে তোলে। শিশুরা যা দেখে তাই শেখেÑতাই প্রথম পাঠ হতে হবে ঘর থেকেই। রঙিন খাবারের এই প্রলোভন কেবল স্বাস্থ্য নয়, সংস্কৃতির ওপরও প্রভাব ফেলছে। একসময় আমাদের শিশুরা দুপুরে ফল খেত, মায়ের হাতে তৈরি পিঠা, দুধ, ডিম, ভাতÑএগুলোই ছিল তাদের খাদ্যতালিকা। এখন সেসব জায়গায় এসেছে প্যাকেটবন্দি খাবার। শিশুরা এখন প্রাকৃতিক স্বাদ ভুলে যাচ্ছে। তারা চায় ঝাঁজালো, কৃত্রিম, চটকদার স্বাদ। এই প্রবণতা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও দুর্বল করে তুলছে। তারা ধৈর্য হারাচ্ছে, মনোযোগ হারাচ্ছে, এবং প্রাকৃতিক জীবনধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
অর্থনৈতিকভাবে চিন্তা করলে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে খাদ্যশিল্পের বাজার দিন দিন বড় হচ্ছে। বড় কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, নতুন নতুন রঙিন খাবার বাজারে আনছে। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই শিশুদের পুষ্টি নয়, ব্যবসার মুনাফাকে লক্ষ্য করে তৈরি। সরকার যদি এখনই কঠোর নীতিমালা না নেয়, তবে কয়েক বছরের মধ্যে এই রঙিন খাবারের ক্ষতি জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে। হাসপাতালগুলোতে শিশুদের স্থূলতা, ডায়াবেটিস, অ্যালার্জি, হজম সমস্যা, এমনকি ক্যান্সারের হার বেড়ে যাবেÑযার বোঝা বহন করতে হবে পুরো জাতিকে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ একটাইÑসচেতনতা। প্রথমত, অভিভাবক ও শিক্ষকেরা যদি শিশুদের সঠিক খাবারের গুরুত্ব শেখান, যদি ঘরে তৈরি খাবার ও ফলমূলকে উৎসাহিত করেন, তাহলে শিশুরা ধীরে ধীরে রঙিন খাবারের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসবে। দ্বিতীয়ত, সরকারকে শিশু খাদ্যে ক্ষতিকর রং ও রাসায়নিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। প্রতিটি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণন প্রক্রিয়ায় কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। ছোট কারখানাগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে, আর অনুমোদন ছাড়া কোনো শিশু খাদ্য বিক্রি বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, টেলিভিশন ও অনলাইন মাধ্যমে শিশুদের লক্ষ্য করে তৈরি করা বিজ্ঞাপনগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কাজটি করতে হবে সমাজের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা। আমাদের জানতে হবে, শিশুদের আনন্দ রঙিন প্যাকেটে নয়, প্রকৃতির রঙে। তাদের হাসি কেনা যায় না কোনো চিপস বা কোমল পানীয় দিয়ে। তাদের শরীর যেমন ভালোবাসা চায়, তেমনি চায় পুষ্টিকর খাদ্য। মায়েরা যদি ঘরে তৈরি খাবারকে আবার পরিবারের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনেন, তবে শিশুদের স্বাস্থ্য আবারও নিরাপদ হতে পারে। আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই সরল, স্বাস্থ্যকর খাদ্য সংস্কৃতিতে, যেখানে খাবার ছিল ভালোবাসার প্রতীক, কৃত্রিমতার নয়। রঙিন খাবারের ফাঁদ থেকে শিশুদের মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের ওপর। যদি তারা অসুস্থ হয়, দুর্বল হয়, অমনোযোগী হয়Ñতবে সেই জাতির মেরুদ- কখনো শক্ত হতে পারে না। তাই আজই সময় এই বিপদের বিরুদ্ধে একজোট হওয়ার। অভিভাবক, শিক্ষক, প্রশাসন, নীতি-নির্ধারক, গণমাধ্যমÑসবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। খাদ্যে রঙ নয়, জীবনে রঙ ফিরিয়ে দিতে হবে। আমাদের শিশুদের মুখে হাসি থাকবে, কিন্তু সেই হাসির পেছনে থাকবে স্বাস্থ্য, শক্তি ও আনন্দÑকৃত্রিম রঙ নয়। কারণ, শিশুর রঙিন পৃথিবী হোক প্রকৃতির রঙে ভরা, না যে বিষাক্ত রঙে। শিশুরা যেন খায় ভালোবাসার খাবার, নয় বিষের মতো মিষ্টি খাদ্য। আজ যদি আমরা সচেতন হই, আগামীকাল হয়তো আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ হবে সুস্থ, সুন্দর এবং সত্যিকার অর্থে রঙিন।
সামিউল আজাদ শামীম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ফুলছড়ি সদর, গাইবান্ধা।
ঝযধসরঁষধলধফংযধসরস@মসধরষ.পড়স
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আলেয়া মান্নান প্রিয়, তুমি একটি বার ভালোবেসে যেও। ব্যস্ততার পরে একবার অবসর করে আসিও...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার ডিজিটাল যুগে একটি ভিডিও কখনো কখনো হাজার বক্তৃতার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। কয়...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : সমকালীন বাংলা কবিতায় এমন কিছু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যেগুলো কেবল কবিতার সংকলন নয়; বরং সময়, স...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র ব...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : একসময় একটি চাকরি মানেই ছিল একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, স্বস্তি ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। মাস ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে যেমন প্রকাশ করে, তেমনি মানুষের মানবিকতা, রাষ্ট্...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited