শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৭:০৯ পিএম, ২০২৬-০৭-২৮
রাজধানীর পথে রওনা হলে প্রতিবারই মনে হয়, আমি যেন কোনো শহরের দিকে নয়, মানুষের দিকে যাত্রা করছি। এই শহরের যানজট, কংক্রিটের অট্টালিকা কিংবা ব্যস্ততার চেয়ে আমাকে বেশি টানে কিছু প্রিয় মুখ, কিছু অসমাপ্ত আড্ডা, কিছু অমলিন সম্পর্ক আর কিছু অকৃত্রিম ভালোবাসা। ঈদুল আজহার আগ থেকেই অফিসে কাজের চাপ বলতে গেলে ছিল না। একঘেয়েমিকে সঙ্গী করেই হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম—চোখ বন্ধ করে রাজধানীর পথে। তখনও জানতাম না, এই সফর শেষে ফিরে আসব প্রাপ্তি ও অপূর্ণতার এক রঙিন ঝাঁপি নিয়ে।
যাত্রার আগে ফোনে কথা হলো সামিরা নিপার সঙ্গে। জানাল, সে রাজধানীতে নেই। আজিজাপু—কবি আজিজা সোপানও তখন ঢাকার বাইরে। জানি, বললে হয়তো চলে আসতেন; কিন্তু শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ না থাকায় তাঁকে আর বিরক্ত করিনি। কিছু না-দেখা মানুষও কখনো কখনো সফরের অংশ হয়ে থাকে; এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপে যখন প্রতিদিনই মৃত্যুর খবর আসছে, তখন ডেঙ্গু আক্রান্ত বন্ধু তানজিম তামান্না হিমুর খোঁজ নেওয়াটা আমার কাছে জরুরি মনে হয়েছে। তাই আজিমপুরে গিয়ে অন্তত এই প্রাণবন্ত, রোমান্টিক বন্ধুটির সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর চেষ্টা করেছি। এমন সময়ে বন্ধুর পাশে দাঁড়াতে পারাটাও এক ধরনের মানবিক দায়িত্ব।
অনেক চেষ্টা করেও দেখা হয়নি জিনিয়াস কবিবন্ধু সুমনা সাহার সঙ্গে। ফোনে যোগাযোগ করেও তাঁকে পাইনি। এই আক্ষেপ সফরের শেষ দিন পর্যন্ত সঙ্গী হয়েছে।
রাজধানী সফরের নিয়মিত কর্মসূচির অংশ ছিল দৈনিক আমাদের বাংলা পত্রিকার কার্যালয় পরিদর্শন। সহকর্মীদের সঙ্গে কিছু সময় কাটানো, সম্পাদকীয় পরিবেশে ফিরে যাওয়া এবং পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গে কুশল বিনিময়—সব মিলিয়ে সময়টা ছিল আনন্দময়। অন্যদিকে লেখক সোনিয়া তাসনিম খানের সঙ্গে বারবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ স্থাপন করতে পারিনি। ফলে বহুদিনের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নব ভাবনা কার্যালয় পরিদর্শনের পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়েছে। সফরের অপূর্ণতার তালিকায় এটিও যোগ হলো।
এই সফরের অন্যতম বড় প্রাপ্তি ছিল লেখক-গবেষক বন্ধু, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচির পরিচালক (প্রশিক্ষণ) এবং চট্টগ্রাম বিভাগের উপবৃত্তি কার্যক্রমের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাইফুর রহমান চৌধুরীর অকৃত্রিম আন্তরিকতা। ব্যস্ত কর্মসূচির মাঝেও তিনি আমাকে সময় দিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব রুচিসম্পন্ন গাড়িতে করে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরিয়েছেন, তাঁর কর্মস্থল ঘুরে দেখিয়েছেন এবং দীর্ঘ সময় প্রাণবন্ত আড্ডা দিয়েছেন। সাত মসজিদ রোডের ধানমন্ডি কাবাবে একসঙ্গে সকালের নাস্তা করার স্মৃতিটিও ছিল অনন্য। সেখানে মন্ত্রণালয়ের গাড়ির ভদ্র, আন্তরিক চালকও আমাদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ করেছিলেন। আরও একটি ছোট অথচ হৃদয়স্পর্শী ঘটনা মনে থাকবে—চট্টগ্রামের চকবাজারের সাদিয়া কিচেনে একসময় কর্মরত একজন ওয়েটারের সঙ্গে সেখানে হঠাৎ দেখা। নিজ শহরের একজন মানুষ হিসেবে তাঁর আন্তরিক ব্যবহার আমাদের দুজনকেই গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। এসব ছোট ছোট মুহূর্তই সফরের সৌন্দর্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
রাজধানী সফরের আরেকটি উজ্জ্বল প্রাপ্তি সাইটেক প্রপার্টিজের এমডি বড়ভাই সাইফুল ইসলাম মজুমদারের আন্তরিক ভালোবাসা। আমার রাজধানীতে আসার খবর পেয়ে তিনি নিজের ব্যস্ত সময়সূচিকে পাশ কাটিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে চলে আসেন। শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎই নয়, রাজধানীর একটি স্বনামধন্য রেস্তোরাঁয় আন্তরিক আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে তাঁর ভ্রাতৃসুলভ স্নেহের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর সৌজন্যেই দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান উত্তরা গ্রুপের চেয়ারম্যান মতিউর রহমানের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। সফরের অন্যতম মূল্যবান প্রাপ্তি হয়ে থাকবে এই পরিচয়।
সবচেয়ে আনন্দঘন মুহূর্তটি ছিল দেশসেরা রম্যলেখক শফিক হাসানের সঙ্গে সাক্ষাৎ। ফোনে যোগাযোগ করতেই তিনি সানন্দে আমাকে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানান। নির্ধারিত সময়ে তাঁর সঙ্গে প্রাণখোলা আড্ডা, আন্তরিক আপ্যায়ন, তাঁর নিজের হাতে তৈরি এক কাপ কফির স্বাদ এবং তাঁর বইয়ের সৌজন্য কপি হাতে তুলে দেওয়ার মুহূর্ত—সব মিলিয়ে এটি আমার রাজধানী সফরের সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। একজন প্রিয় লেখকের এমন অকৃত্রিম আন্তরিকতা সহজে ভোলার নয়। শফিক ভাই, কথা দিচ্ছি—আপনার এই ভালোবাসার মূল্যায়ন আজীবন হৃদয়ে বহন করব।
রাজধানীতে গিয়ে জনপ্রিয় লেখক রহিমা আক্তার মৌয়ের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রায় ভেস্তে যেতে বসেছিল। মনে হচ্ছিল, এবারও হয়তো দেখা হবে না। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই আক্ষেপ মিলিয়ে গেল। হঠাৎই দেখা হয়ে গেল রহিমা আক্তার মৌয়ের সঙ্গে। সেই আনন্দকে আরও পূর্ণতা দিলেন আরেক মেধাবী গল্পকার মাসুমা রুমা। মজার বিষয় হলো, সফরের আগে বহুবার চেষ্টা করেও ফোনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। মনে হয়, নম্বরটি আবারও মিলিয়ে দেখা দরকার।
সফরজুড়ে আরও অনেক গুণী মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ হয়েছে। সাংবাদিক কাজী হুমায়ুন কবির, সাংবাদিক বেঞ্জামিন রফিকসহ আরও অনেক সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা কিংবা ফোনে কথা হয়েছে নানা বিষয়ে। প্রতিটি আলাপই ছিল আন্তরিকতা, সৌহার্দ্য এবং পেশাগত অভিজ্ঞতা বিনিময়ের এক অনন্য উপলক্ষ।
একইভাবে ফোনে কথা হয়েছে প্রতিবাদী লেখক জুলফিকার শাহাদাতের সঙ্গেও। আন্তরিকতার কোনো কমতি ছিল না, কিন্তু দুজনের ব্যস্ততার কারণে আর মুখোমুখি বসা হয়ে ওঠেনি। মনে হয়েছে, দেখা হলে আড্ডাটা আরও প্রাণবন্ত হতো, আর রাজধানী সফরের স্মৃতির ঝুলিতে যুক্ত হতো আরও একটি উজ্জ্বল অধ্যায়।
রাজধানী সফরকালে প্রয়োজনের তাগিদে অনেকের সঙ্গেই ফোনে কথা হয়েছে। তবে বিশেষভাবে মনে থাকবে জাতকবি সারাফ নাওয়ারের সঙ্গে লেখালেখি নিয়ে দীর্ঘ আলাপ। কথার একপর্যায়ে দুষ্টুমি করে বলেছিলাম, ‘চট্টগ্রামে ফেরার টিকিটটা করে দিন না!’ তিনি সেটিকে নিছক রসিকতা হিসেবে উড়িয়ে না দিয়ে মুহূর্তেই ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। আমাকে বিস্মিত করে বিকাশে টিকিটের টাকা পাঠিয়ে দিলেন। এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা, উদারতা এবং বন্ধুত্বের প্রকাশ মানুষকে আজীবন ঋণী করে রাখে।
ব্যস্ত রাজধানীর আরেকটি আনন্দময় অভিজ্ঞতা ছিল মেট্রোরেলে যাতায়াত। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলা সেই আধুনিক বাহনে চড়ে মনে হয়েছে, ঢাকাকে যেন নতুন এক দৃষ্টিতে দেখছি। জানালার বাইরে দ্রুত বদলে যাওয়া শহরের দৃশ্য, স্টেশনগুলোর প্রাণচাঞ্চল্য আর যাত্রীদের ব্যস্ত পদচারণা—সব মিলিয়ে অল্প সময়ের সেই ভ্রমণও সফরে যোগ করেছে ভিন্ন এক আনন্দের মাত্রা।
এই সফরে যতটা না জায়গা ঘোরা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি ঘোরা হয়েছে মানুষের হৃদয়ে। কোথাও আন্তরিক আপ্যায়ন, কোথাও দীর্ঘ আড্ডা, কোথাও নতুন পরিচয়, আবার কোথাও কেবল একটি ফোনকলেই ধরা দিয়েছে অগাধ ভালোবাসা। কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হয়নি, কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি—তবু অপূর্ণতার চেয়ে প্রাপ্তির পাল্লাই ছিল অনেক ভারী।
রাজধানী থেকে ফিরে উপলব্ধি করেছি, একটি সফরের প্রকৃত সার্থকতা কিলোমিটারে মাপা যায় না; মাপা যায় মানুষের ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও সম্পর্কের গভীরতায়। এই সফরে আমি যতটা পথ হেঁটেছি, তার চেয়ে অনেক বেশি হেঁটেছি মানুষের মমতার ভেতর দিয়ে। রাজধানীর সবচেয়ে বড় পরিচয় তার উঁচু অট্টালিকা নয়, তার মানুষ। সেই মানুষগুলোর অকৃত্রিম ভালোবাসা, নিঃস্বার্থ আতিথেয়তা, বন্ধুত্বের হাত আর আন্তরিক আচরণই আমার এই সফরকে একটি সাধারণ ভ্রমণ থেকে আজীবন মনে রাখার মতো এক অনন্য স্মৃতিচারণে পরিণত করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো অনেক দৃশ্য ঝাপসা হয়ে যাবে, কিন্তু মানুষের দেওয়া ভালোবাসার ঋণ কখনো মুছে যাবে না। রাজধানী থেকে ফিরেছি ঠিকই, কিন্তু হৃদয়ের এক টুকরো যেন সেখানেই রেখে এসেছি।
লেখক : নন্দিত সংগঠক ও প্রতিবাদী লেখক।
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র দাখিলের ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : চট্টগ্রামের কিশোরী সুপর্বা সুধা বিশ্বাস। ১৩ বছর বয়সী অষ্টম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর ঝুলিতে ইতোমধ্...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : বাংলাদেশ এডিটরস্ ফোরাম গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে যে, সম্প্রতি চট্টগ্রামের একটি দৈনিক পত্রি...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : নোবিপ্রবি প্রতিনিধি : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি ও শহীদদের স্মরণে বাংলাদেশ ইসলাম...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু পুরুষের শাস্তির বিধান কেন অবৈধ নয়, তা জানতে ...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর বিচার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এগোচ্...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited