শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৭:৫৮ পিএম, ২০২৬-০৯-২২
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি খাতের বড় অংশজুড়েই রয়েছে মৌলিক বা ‘বেসিক’ পণ্য। টি-শার্ট, প্যান্ট, সোয়েটার, আন্ডারগার্মেন্টস ও শিশুদের পোশাকের মতো পণ্যের ওপরই দেশের পোশাক রফতানি অনেক বেশি নির্ভরশীল। বিপরীতে বিশ্ববাজারে তুলনামূলক বেশি চাহিদার উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাক— যেমন আউটারওয়্যার, ড্রেস, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যার ও স্যুট— রফতানিতে বাংলাদেশের অংশ এখনও বেশ কম।
ক্যালেন্ডার বছর ২০২৫-এর পোশাক রফতানির তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৩৮ দশমিক ৮২৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করেছে। একই সময়ে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের (আইটিসি) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে পোশাক রফতানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪২৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি) ইপিবি ও আইটিসি ট্রেড ম্যাপের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই তুলনা করেছে।
বেসিক পোশাকেই বাংলাদেশের বড় নির্ভরতা
তথ্য বলছে, বাংলাদেশ থেকে রফতানি হওয়া পোশাকের ৭৬ দশমিক ৯৪ শতাংশই বেসিক ক্যাটাগরির পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে বটমওয়্যার বা প্যান্টজাতীয় পোশাক, টি-শার্ট, সোয়েটার, ইননারওয়্যার, শিশুদের পোশাক এবং ছোটখাটো অ্যাকসেসরিজ।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী মোট পোশাক বাণিজ্যে এসব মৌলিক পণ্যের অংশ ৬১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্ববাজারের তুলনায় বাংলাদেশের পোশাক রফতানি বেসিক পণ্যের ওপর প্রায় ১৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি নির্ভরশীল।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ বটমওয়্যারের। বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির ৩৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ আসে এই শ্রেণির পণ্য থেকে। বিশ্ববাজারে বটমওয়্যারের অংশ ২১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্ববাজারের তুলনায় বাংলাদেশের রফতানি ঝুড়িতে প্যান্ট ও অনুরূপ পোশাকের নির্ভরতা অনেক বেশি।
টি-শার্টের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। বাংলাদেশের পোশাক রফতানির ১৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ টি-শার্ট থেকে আসে। বিশ্ববাজারে এই হার ১০ দশমিক ০৯ শতাংশ।
ছোট অ্যাকসেসরিজে বড় ঘাটতি
তবে বেসিক ক্যাটাগরির সব পণ্যে বাংলাদেশ এগিয়ে নেই। বরং ছোট অ্যাকসেসরিজের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান বেশ পিছিয়ে। বিশ্বের পোশাক বাণিজ্যে ছোট অ্যাকসেসরিজের অংশ প্রায় ৭ দশমিক ৫২ শতাংশ হলেও বাংলাদেশের রফতানি ঝুড়িতে এর অংশ মাত্র শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ এই খাতে বাংলাদেশের অংশ বিশ্ববাজারের তুলনায় প্রায় ২১ গুণ কম। এটি পোশাক খাতের পণ্য বৈচিত্র্যের একটি বড় সীমাবদ্ধতার দিকও তুলে ধরে। পোশাক তৈরির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক পণ্য উৎপাদন ও রফতানিতে বাংলাদেশ এখনও তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয়।
শার্ট-ব্লাউজে কিছুটা ভারসাম্য
বেসিক ও উচ্চমূল্যের পণ্যের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে শার্ট ও ব্লাউজ। এই ‘সেমি-বেসিক’ ক্যাটাগরির পণ্য বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির ১০ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বিশ্ববাজারে এর অংশ ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ এই শ্রেণির পণ্যে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারের তুলনায় কিছুটা বেশি নির্ভরশীল। তবে এই অংশটি বেসিক পণ্যের তুলনায় অনেক ছোট। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “বাংলাদেশের পোশাক রফতানি দীর্ঘদিন ধরেই মূলত বেসিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। টি-শার্ট, প্যান্ট, সোয়েটারসহ এসব পণ্যে আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। কিন্তু বিশ্ববাজারের চাহিদা এখন দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে শুধু একই ধরনের পণ্যের পরিমাণ বাড়িয়ে রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে।” তিনি বলেন, “বিশ্ববাজারে আউটারওয়্যার, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যার, ড্রেস ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের পণ্যের বড় বাজার রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের রফতানি ঝুড়িতে এসব পণ্যের অংশ এখনও তুলনামূলকভাবে কম। এর অর্থ হলো, আমাদের সামনে শুধু চ্যালেঞ্জ নয়, বড় একটি সুযোগও রয়েছে। বিশ্ববাজারে যে জায়গাটি আমরা এখনও দখল করতে পারিনি, সেটিই ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির অন্যতম ক্ষেত্র হতে পারে।” মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “এখন আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বেশি পরিমাণ পোশাক রফতানি করা নয়, বরং বেশি মূল্য সংযোজন করা। এজন্য পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি সিনথেটিক ও নন-কটন পোশাক, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, স্পোর্টসওয়্যার ও অন্যান্য বিশেষায়িত পণ্যের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এসব ক্ষেত্রে শুধু পোশাক তৈরির সক্ষমতা থাকলেই হবে না; কাপড় তৈরি, ডাইং, ফিনিশিং, ডিজাইন ও পণ্য উন্নয়ন— পুরো সরবরাহব্যবস্থায় বিনিয়োগ প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের বড় শক্তি হচ্ছে বেসিক পোশাকে আমাদের দীর্ঘদিনের দক্ষতা, বড় উৎপাদন সক্ষমতা এবং ক্রেতাদের সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্ক। এই শক্তিকে ধরে রেখেই আমাদের পরবর্তী ধাপে যেতে হবে। বেসিক পণ্য বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং এর পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পণ্যের অংশ দ্রুত বাড়াতে হবে।” রুবেলের মতে, “শুধু কম দামের পোশাকের প্রতিযোগিতায় থাকলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য চাপ বাড়বে। উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি, অর্থায়ন, লিড টাইম এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। তাই পণ্যের বৈচিত্র্যের সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, দ্রুত পণ্য সরবরাহ এবং ক্রেতার পরিবর্তিত চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে হবে।” তিনি বলেন, “বাংলাদেশ যদি বেসিক পণ্যের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের পোশাকের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে, তাহলে একই পরিমাণ পণ্য রফতানি করেও বেশি রফতানি আয় করা সম্ভব হবে। তাই এখন পোশাক খাতের কৌশল হওয়া উচিত ‘ভলিউম’ থেকে ‘ভ্যালু’-এর দিকে যাওয়া।”
উচ্চমূল্যের পোশাকে বড় ব্যবধান
বাংলাদেশের পোশাক রফতানির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দেখা যায় উন্নত বা উচ্চমূল্যের পোশাকের ক্ষেত্রে। আউটারওয়্যার, ড্রেস, টেকনিক্যাল ওয়্যার, স্পোর্টসওয়্যার ও স্যুট— এই পাঁচ ধরনের পণ্যকে উন্নত বা ‘অ্যাডভান্সড’ ক্যাটাগরিতে ধরা হয়েছে। এই পণ্যগুলোর সম্মিলিত অংশ বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে মাত্র ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অথচ বিশ্ব পোশাক বাণিজ্যে এসব পণ্যের অংশ ৩০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাকের যে গুরুত্ব, বাংলাদেশের রফতানি ঝুড়িতে তার উপস্থিতি অনেক কম। সবচেয়ে বড় ব্যবধান আউটারওয়্যারে। বিশ্ববাজারে মোট পোশাক রফতানির ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ আসে আউটারওয়্যার থেকে। বাংলাদেশে এই হার মাত্র ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক ক্যাটাগরিগুলোর একটি বাংলাদেশে এখনও তুলনামূলক ছোট।
প্রবৃদ্ধির জন্য পণ্য বৈচিত্র্য জরুরি
এই তথ্য বাংলাদেশের পোশাক খাতের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরছে— রফতানি বাড়াতে কি শুধু আরও বেশি টি-শার্ট, প্যান্ট বা সোয়েটার উৎপাদনের ওপর নির্ভর করা হবে, নাকি উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাকের দিকে যেতে হবে?
বিশ্ববাজারের কাঠামো বলছে, দ্বিতীয় পথটির গুরুত্ব বাড়ছে। কারণ বাংলাদেশের বর্তমান রফতানি ঝুড়িতে বেসিক পণ্যের আধিক্য রয়েছে, অথচ বিশ্ববাজারে আউটারওয়্যার, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যার, ড্রেস ও স্যুটের মতো পণ্যের বড় বাজার রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির প্রবৃদ্ধির একটি বড় সুযোগ হতে পারে পণ্য বৈচিত্র্য ও উচ্চমূল্যের পোশাকে সক্ষমতা বাড়ানো। শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর পরিবর্তে ডিজাইন, প্রযুক্তি, মান, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং বিশেষায়িত উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে রফতানি ঝুড়িতে উচ্চমূল্যের পণ্যের অংশ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে একটি বিষয়ও বিবেচনায় রাখা দরকার। বাংলাদেশের মোট রফতানি ও বিভিন্ন এইচএস-৬ পণ্যের হিসাবের মধ্যে ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ বা প্রায় ১ দশমিক ৩১৩ বিলিয়ন ডলারের একটি অংশের পূর্ণ মিল পাওয়া যায়নি। বিএভির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি ইপিবির ২-ডিজিট ও ৬-ডিজিট হিসাবের মধ্যকার একটি পরিচিত ব্যবধান। বিশ্ববাজারের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান প্রায় শূন্য দশমিক ৫৯ শতাংশ, যা মূলত রাউন্ডিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের তথ্য বাংলাদেশের পোশাক খাতের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশের রফতানি ঝুড়ি এখনও মূলত বেসিক পোশাকনির্ভর; অথচ বিশ্ববাজার তুলনামূলক বেশি বৈচিত্র্যময় এবং উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে বিস্তৃত। তাই ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রশ্নটি শুধু কত বেশি পোশাক রফতানি করা যাবে— তা নয়; বরং কী ধরনের পোশাক রফতানি করা যাবে এবং সেই পোশাকের মূল্য কত বেশি হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক : চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের ফলে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় এবং নতুন কাজের আদেশ কমে যাওয়ায় এর নেতিবাচ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে নতুন গাড়ি কেনা, সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি ঋণ বিতরণ, থোক বরাদ্দ থেকে ব্যয় বন্ধসহ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সৌহার্দ্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার পরিবেশ ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ছয় বছরের মধ্যে আসল টাকা বা মুনাফা দাবি না করলে তা তামাদি (Time-barred) হিসেব...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : বুধবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে রাজউক ও রিহ্যাবের উচ্চ পর্যায়ের মতবিনিময়সভা হ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনা-রুপার (পাকা সোনা) দাম কমার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বাজারে সোনা- রুপার দাম ...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited