বাংলাদেশ   রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬  

শিরোনাম

অপুষ্টি, ব্যাধি ও দুর্যোগের ফাঁদে রোহিঙ্গা শিশুদের শৈশব

নিজস্ব প্রতিবেদক    |    ০৫:১৯ পিএম, ২০২৬-১০-১০

অপুষ্টি, ব্যাধি ও দুর্যোগের ফাঁদে রোহিঙ্গা শিশুদের শৈশব

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নির্যাতন থেকে বাঁচতে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ ও ভাসানচরের ঘিঞ্জি শিবিরে আশ্রয় নেওয়া ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শিশু। খোলা আকাশে মাথার ওপর ত্রিপল আর বাঁশের বেড়ায় ঘেরা এই অস্থায়ী জীবন কেবল তাদের আশ্রয়হীন করেনি; কেড়ে নিয়েছে তাদের স্বাভাবিক বাড়ন্ত শৈশবও। আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি, পুষ্টির সংকট, সংক্রামক রোগের দাপট, শিক্ষার অপ্রতুলতা এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক সহিংসতায় রোহিঙ্গা শিশুরা আজ এক অনিশ্চিত চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে। তাদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত সংকট এবং তার বিপরীতে তৈরি হওয়া সম্ভাবনার নানা দিক নিয়ে দুই পর্বের বিশেষ প্রতিবেদনের আজ থাকছে প্রথমটি।

১৫ মাসের ছোট্ট রিফাত আরার এখন দুরন্ত পায়ে হেঁটে বেড়ানোর কথা, আধো-আধো বোলে ঘর মাতানোর কথা। মায়ের হাত ধরে মিষ্টি সকালে অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠার কথা। কিন্তু তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত রিফাত তখন ঠিক মতো বসতেও পারছিল না, হাঁটতে পারা তো বহু দূরের কথা; চেনা মুখগুলো চিনতে পারলেও ফুটছিল না কোনো বুলি।

মেয়েকে কোলে চেপে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং-বালুখালী ১২ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঘুরছিলেন মা নয়নতারা। চিকিৎসা আর পুষ্টিকর্মীদের নিবিড় পরামর্শে ধীরে ধীরে রিফাতের সেবা চলছিল। নয়নতারার একটাই আকুতি— তার খুকি যেন অন্য শিশুদের মতো হাসতে, হাঁটতে আর কথা বলতে পারে।

শিশু রিফাত আরার এই করুণ চিত্র রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হাজারও অসম্পূর্ণ শৈশবের এক ছোট্ট প্রতিচ্ছবি মাত্র। পাহাড়ে ঘেরা উখিয়া-টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে ভোর আসে এক ভিন্ন রকম বিষণ্নতায়। বাঁশ আর ত্রিপলের ঘরের ফাঁক গলে শিশুরা বের হয়ে পড়ে— কেউ একটুখানি খাবারের প্রত্যাশায়, কেউ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দীর্ঘ লাইনে, আবার কেউ বা ছুটে যায় ছোট্ট লার্নিং সেন্টারের (শিক্ষাকেন্দ্র) দিকে। কিন্তু একই বয়সের আরেকটি দল তখনও বন্দি ঘরের অন্ধকূপে। তাদের কেউ অপুষ্টিতে নিস্তেজ, কেউ বা রোগের সঙ্গে লড়ে শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছে, আর কেউ হারিয়েছে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ। তদুপরি বর্ষা নামলেই ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ, পাহাড়ি ঢল আর ভূমিধসের আতঙ্ক তাদের জীবনকে ফেলে দেয় চরম অনিশ্চয়তায়।

কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা শিবিরে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার অভাবে তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের শুরুতেই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মুমূর্ষু শিশুর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কলেরা, ডেঙ্গু ও হামের মতো প্রাণঘাতী সংক্রামক ব্যাধির মারাত্মক প্রাদুর্ভাব
২০২৬ সালের জুনের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার ও ভাসানচরের ঘিঞ্জি শিবিরে আশ্রয় নেওয়া ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার খাদ্য, স্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, শিক্ষা ও শিশুসুরক্ষার পুরোটাই মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। 

জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ), ইউএনএইচসিআর এবং মানবিক অংশীদার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ক্যাম্পগুলোতে অন্তত ৬ লাখ ২৪ হাজার শিশুর জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। আর এই শিশুদের জীবনের সবচেয়ে প্রকট তিনটি সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে— তীব্র অপুষ্টি, সংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি এবং শিক্ষার তীব্র অনিশ্চয়তা।

অপুষ্টির শরীরে থমকে যাওয়া শৈশব
২০২৫ সালের শুরুতেই রোহিঙ্গা শিবিরের শিশুদের পুষ্টিপরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছিল ইউনিসেফ। জাতিসংঘের এই শিশু সংস্থার হিসাবে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেড়ে যায়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে যেখানে ৮৩৬ জন শিশু ভর্তি হয়েছিল, ২০২৫ সালের একই সময়ে সে সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৬২ জনে। এর আগে জানুয়ারি মাসেও বাড়ার হার ছিল ২৫ শতাংশ। বছরের শুরুতেই ইউনিসেফ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে, ২০২৫ সালজুড়ে প্রায় ১৪ হাজার ২০০ শিশু চরম অপুষ্টির শিকার হতে পারে।

অপুষ্টির ঝুঁকি শনাক্তে নিয়মিত স্ক্রিনিং কার্যক্রম; সংকটাপন্ন রোহিঙ্গা শিশুদের দ্রুত দেওয়া হচ্ছে জরুরি নিবিড় চিকিৎসা / ছবি- ইউনিসেফ
নিয়ম অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী রোহিঙ্গা শিশুরা পুষ্টিকেন্দ্রে গিয়ে নিয়মিত ওজন ও উচ্চতা মাপা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পুষ্টি বিষয়ক পরামর্শ পেয়ে থাকে। চিকিৎসকদের মতে, তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শিশু সময়মতো চিকিৎসা না পেলে সাধারণ শিশুর তুলনায় তার মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু শিবিরের চাহিদার তুলনায় সেবার পরিধি এতটাই সীমিত যে, প্রতিটি অসুস্থ শিশুর কাছে সময়মতো পৌঁছানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৫-২৬ সালের ‘পাবলিক হেলথ নিডস অ্যাসেসমেন্ট’-এ ২ হাজার ১৪টি রোহিঙ্গা পরিবারের ওপর পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা যায়, ক্যাম্পের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে চর্মরোগ ও ডায়রিয়ার মতো ব্যাধিতে ভুগছেন। পাশাপাশি তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং ডেঙ্গুর প্রকোপও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

এই মূল্যায়নে আরও দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত পরিবারের হার ২০২৪ সালের ১৯.২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৩২.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অবনতি ঘটেছে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সূচকেও; গর্ভকালীন সেবা গ্রহণের হার কমে নেমেছে ৩৫ শতাংশে এবং শিশুদের অসম্পূর্ণ টিকাদানের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭.৮ শতাংশে।

বর্তমানে এই স্বাস্থ্যসেবা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র অর্থসংকট। ২০২৬ সালের জুনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, কক্সবাজারের স্বাস্থ্যখাত সমন্বয় ও নেতৃত্বের জন্য তাদের চাহিদার ৬৪ শতাংশ অর্থ ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতির কারণে সংক্রামক রোগ নজরদারি, প্রাদুর্ভাব শনাক্তকরণ ও জরুরি চিকিৎসা জোরদার করার প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা সেপ্টেম্বর নাগাদ পুরো সমন্বয় ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে তুলতে পারে।

অপুষ্টির চিকিৎসা অনেক সময় ওষুধ দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় আন্তরিক কথোপকথন আর বোঝানোর মধ্য দিয়ে। গুরুতর অপুষ্টিতে থাকা কোনো শিশুর ক্ষুধা ফিরে পাওয়া ও ওজন বাড়তে দেখা সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
— সাদিয়া আরাফিন, পুষ্টি পরামর্শক, কুতুপালং ক্যাম্প
সহজ কথায়, এই অর্থসংকটের অর্থ হলো— ক্যাম্পগুলোতে হঠাৎ কোনো মহামারি বা প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে তা দ্রুত শনাক্তকরণ, তথ্য বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা এবং জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়া।

ইউনিসেফের ২০২৬ সালের মধ্যবর্ষের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কক্সবাজার ও ভাসানচরে সেবা চালু থাকলেও অর্থের অভাবে তার পরিধি বাড়ানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে আবার যুক্ত হয়েছে সামাজিক ও পারিবারিক নির্যাতন, শিক্ষার অপ্রতুলতা এবং বাধ্যগত শিশুশ্রম, যার ফলে গভীর মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ‘ট্রমাটাইজড’ শিশুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

তবে, এই সংকট কেবল কোনো শুষ্ক পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি জীবিত শিশু, একটি অসহায় পরিবার এবং এক বিষাদময় শৈশব। যেখানে শৈশবের ভোরেই অনেক শিশু লড়ছে অপুষ্টি এবং শারীরিক-মানসিক নানা জটিলতার বিরুদ্ধে।

এমনই এক মানবিক বাস্তবতার শিকার দুই বছরের শিশু সোফিবা। জন্মের পরপরই তার শরীর চেপে ধরে জ্বর আর দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া। বারবার অসুস্থ হয়ে শুকিয়ে হাড্ডিসার হতে থাকে শিশুটি। একপর্যায়ে ক্যাম্পের পুষ্টিকর্মী বাড়িতে গিয়ে পরীক্ষা করে জানান, সোফিবা তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।

ত্রাণসংকট ও মারণব্যাধির কবলে ৬ লাখ রোহিঙ্গা শিশু / এআই-জেনারেটেড ছবি
মা রুবেদার চোখে তখন ফুটফুটে মেয়েটিকে হারানোর তীব্র আতঙ্ক। সোফিবা এতটাই নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল যে, স্বাভাবিক খেলাধুলা তো দূরের কথা, দাঁড়াতেও পারছিল না। পরে নিবিড় পুষ্টি চিকিৎসার আওতায় এনে তাকে সুস্থ করার চেষ্টা শুরু হয়।

২০২৫ সালে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালসহ ১৪টি দেশি-বিদেশি সংস্থা যৌথ হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিল, অর্থসংকটের কারণে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার শিশু শিক্ষা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। তারা স্পষ্ট জানিয়েছিল, খাদ্য সহায়তা কমে গেলে পুষ্টিহীনতায় ভোগা শিশুদের অবস্থা আরও করুণ হয়ে উঠবে।

ইউনিসেফের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কক্সবাজার ও ভাসানচরে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৭০০ শিশুকে অপুষ্টির জন্য স্ক্রিনিং করা হয়েছে। এর মধ্যে তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা ৬ হাজার ৮০০ শিশুকে জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ৮৭ হাজার ৩০০ অভিভাবককে শিশু ও নবজাতকের সঠিক খাদ্যাভ্যাস নিয়ে পরামর্শ দেওয়া হয় এবং ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭০০ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়েছে।

এত কিছুর পরও ঝুঁকি কমেনি, বরং দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ। ২০২৬ সালের শুরু থেকে চিকিৎসাজনিত জটিলতাসহ চরম অপুষ্টির চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাটি বিশেষায়িত পুষ্টি খাত থেকে সরিয়ে সাধারণ ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা’ ব্যবস্থার অধীনে স্থানান্তর করা হয়। 

ইউনিসেফের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, এই প্রশাসনিক রদবদলের পর জটিল অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের হাসপাতালে ভর্তির হার হঠাৎ কমে গেছে। এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, জটিল রোগে ভোগা শিশুরা হয়তো ঠিকমতো শনাক্ত হচ্ছে না কিংবা উপযুক্ত হাসপাতালে রেফার করা যাচ্ছে না।

মানবিক সহায়তায় চরম অর্থসংকটের কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বাধীন স্বাস্থ্য খাতে চাহিদার ৬৪ শতাংশ ফান্ড ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে সংক্রামক ব্যাধি দ্রুত শনাক্তকরণ, জরুরি মহামারি প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর মধ্যকার সার্বিক সমন্বয় ব্যাহত হওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা পুরো স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে ধসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে
এই ঝুঁকি এড়াতে বর্তমানে রেফারেল ব্যবস্থা জোরদার এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের পুনর্দফা প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, কেন্দ্র আছে, কর্মসূচিও চলছে, স্ক্রিনিংও হচ্ছে— কিন্তু সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মুমূর্ষু শিশুটিকে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা কেন্দ্রের টেবিলে পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে বড় লড়াই।

‘পুষ্টি আপা’-তেই ভরসা খুঁজছেন অভিভাবকরা

২০২৬ সালে নিউট্রিশন সেক্টরের অধীনে ৭টি অংশীদার সংস্থা যৌথভাবে কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে ‘ইন্টিগ্রেটেড নিউট্রিশন ফ্যাসিলিটি’ (আইএনএফ) পরিচালনা করছে। এই কার্যক্রমে যারা শিশুখাদ্য ও পুষ্টি পরামর্শক (আইওয়াইসিএফ কাউন্সিলর) হিসেবে সেবা দেন, ক্যাম্পের সাধারণ মানুষ ভালোবেসে সেই নারীকর্মীদের ডাকেন ‘পুষ্টি আপা’ নামে।


কুতুপালং শিবিরের এমনই এক পুষ্টি পরামর্শক সাদিয়া আরাফিন। গত দুই বছর ধরে রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন তিনি। অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সাদিয়া বলেন, ‘অপুষ্টির চিকিৎসা অনেক সময় ওষুধ দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় আন্তরিক কথোপকথন আর বোঝানোর মধ্য দিয়ে।’ 

নিজের অভিজ্ঞতায় দেখা ইউসুফ নামের এক শিশুর সুস্থ হয়ে ওঠার গল্প শুনিয়ে তিনি বলেন, ‘শিশুটির অবস্থা ছিল অত্যন্ত আশঙ্কাজনক, ছিল তীব্র অপুষ্টি। তবে, নিয়মিত চিকিৎসা আর সঠিক খাদ্য-পরামর্শের পর তা মাঝারি মাত্রার অপুষ্টিতে নেমে আসে, যা পূর্ণ সুস্থতার পথে এক বড় অগ্রগতি। অপুষ্টিতে নিস্তেজ হয়ে পড়া কোনো শিশুর মুখে ক্ষুধা ফিরে আসা আর ওজন বাড়তে দেখার চেয়ে বড় কোনো প্রাপ্তি হতে পারে না।’

তবে, এই ছোট ছোট সাফল্যের পেছনের বাস্তবতা বেশ কঠিন। শিশু স্বাস্থ্য ও মনস্তত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, শরণার্থী শিবিরে শিশুদের বাঁচানোর সংগ্রামটি কেবল ত্রাণ পৌঁছানোর মধ্য দিয়েই শেষ হয় না। সঠিক সময়ে অপুষ্টির শিকার শিশুকে খুঁজে বের করা, উপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়া এবং জটিল পরিস্থিতি হলে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানোর সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করে তাদের জীবন।

এর ওপর রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর কোনো স্বাধীন আয়-রোজগারের সুযোগ নেই বললেই চলে। বিশুদ্ধ পানি, খাবার, স্যানিটেশন থেকে শুরু করে চিকিৎসা সেবা— সবকিছুর জন্যই তারা শতভাগ আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ফলে খাদ্য সহায়তায় সামান্য কাটছাঁট করা হলেও তার প্রভাব কেবল ক্ষণিকের ক্ষুধায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা একটু একটু করে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সার্বিক ভবিষ্যতের মূল ভিত ধ্বংস করে দেয়।

এই প্রাদুর্ভাব থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— সংকট দরজায় কড়া নাড়া পর্যন্ত হাত গুটিয়ে বসে থাকা যাবে না। যেকোনো মহামারি বা সংক্রামক প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার প্রস্তুতি আগে থেকেই রাখতে হবে।
— ডা. মোহাম্মদ ছাবের, সিভিল সার্জন, কক্সবাজার
কলেরার আতঙ্ক, টিকায় ফিরছে স্বস্তি

কক্সবাজারের ৯ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা ১৪ বছরের কিশোরী আসমাউল হোসনা। হঠাৎ করেই শুরু হয় পানির মতো পাতলা পায়খানা। সময়ের ব্যবধানে দ্রুত নিস্তেজ হয়ে পড়তে থাকে সে। চোখের সামনে মেয়ের এমন আকস্মিক অবনতি দেখে ভয় পেয়ে যান মা আলমসাইর। দ্রুত তাকে নেওয়া হয় স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। চিকিৎসকদের জরুরি সেবা ও প্রয়োজনীয় সহায়তায় অবশেষে বিপদ কেটে যায় আসমাউলের।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় শুরু হওয়া বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি ক্যাম্পের এই পরিবারগুলোকে নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে।  ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত রোহিঙ্গা শিবিরে কলেরার বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হুমকি হয়ে উঠেছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে ক্যাম্পে মোট ৫৮১ জন কলেরা আক্রান্ত রোগী ল্যাব-পরীক্ষায় শনাক্ত হন, যার প্রায় ৪০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

সংক্রমণের ভয়াবহতা রুখতে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডব্লিউএইচও-এর উদ্যোগে মুখে খাওয়ার বিশেষ কলেরা টিকাদান অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় ক্যাম্পের প্রায় ৯ লাখ ৭৭ হাজার মানুষকে এই টিকার আওতায় আনা হয়, যার মধ্যে শিশুর সংখ্যাই ছিল ৪ লাখ ১০ হাজারের বেশি। পরবর্তীতে একই বছরের এপ্রিল মাসে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী আরও ১ লাখ ৭৭ হাজার ২২২ জন শিশুকে দেওয়া হয় টিকার দ্বিতীয় ডোজ।

ক্যাম্পের এই সংকটজনক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, ‘এই প্রাদুর্ভাব থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— সংকট দরজায় কড়া নাড়া পর্যন্ত হাত গুটিয়ে বসে থাকা যাবে না। মহামারি বা প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হবে আগে থেকেই।’ 

একই প্রসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কক্সবাজার কার্যালয়ের প্রধান ডা. জর্জ মার্টিনেজ জোর দিয়ে বলেন, ‘পূর্বপ্রস্তুতি থাকলে যেকোনো জরুরি মুহূর্তে মানুষের অমূল্য জীবন রক্ষা করা অনেক সহজ হয়ে যায়। আর এই আগাম প্রস্তুতির মূল ভিত্তি হলো সাধারণ মানুষের আস্থা এবং স্থানীয় কমিউনিটিকে সক্ষম করে তোলা।’

হাম, ডেঙ্গু ও ডায়রিয়ায় বাড়ছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি
কয়েক বছর আগেও তিন বছরের ছোট্ট শরীফের চেনা জগৎ ছিল তাদের ছোট্ট ঘর আর আশপাশের ক্যাম্প। কিন্তু এক দিন দূষিত পানি ও নোংরা পরিবেশের কারণে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। পরিস্থিতি এতটাই সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে যে, তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে দু’দিন জরুরি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। 

একপর্যায়ে শরীফ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। চিকিৎসকদের চেষ্টায় তার জীবন বাঁচলেও হু হু করে কমতে থাকে শরীরের ওজন। পরবর্তীতে তাকে কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি সমন্বিত পুষ্টিকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে তার ওজন ও উচ্চতা মেপে শুরু হয় নিবিড় পুষ্টি চিকিৎসা। এটি এমন এক নির্ভেজাল সত্যের প্রতিচ্ছবি— যেখানে রোহিঙ্গা শিশুদের অসুস্থতার নেপথ্যে দূষিত পানি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অপুষ্টি ও অপর্যাপ্ত চিকিৎসা যৌথভাবে কাজ করে।

সংকটের চরম বাস্তবতার মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছে সেভ দ্য চিলড্রেন ও ইউনিসেফের বিশেষায়িত মাতৃ ও শিশু হাসপাতাল এবং ‘স্ক্যানু’ (SCANU) সুবিধা। ক্যাম্পের একেবারেই কাছে জরুরি প্রসূতি সেবা ও প্রাক-উৎপাদনকালীন নিবিড় চিকিৎসার ব্যবস্থা করায় হাজার হাজার মা ও নবজাতকের অকাল প্রাণহানির ঝুঁকি সফলভাবে কমানো সম্ভব হচ্ছে
শরীফের ঘটনাটি দেখায়, কীভাবে একটি সংক্রামক ব্যাধি শেষ পর্যন্ত একটি শিশুকে ঠেলে দেয় পুষ্টি চিকিৎসাকেন্দ্রের টেবিলে।

রোহিঙ্গা শিবিরে স্বাস্থ্যঝুঁকি কোনো নির্দিষ্ট একটি রোগে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৫–২৬ সালের স্বাস্থ্য মূল্যায়নে চর্মরোগ ও ডায়রিয়ার পাশাপাশি শ্বাসতন্ত্রের তীব্র সংক্রমণ এবং ডেঙ্গুর মারাত্মক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ধরা পড়েছে।

উখিয়ার ৪ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিকের আট বছরের ছেলে আমানুল্লাহ দুই মাস আগে হামে আক্রান্ত হয়। রফিক বলেন, ‘ছেলের শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরই হাসপাতালে নিয়ে যাই। চিকিৎসার একপর্যায়ে তার শারীরিক অবস্থার খুব অবনতি হয়েছিল। আল্লাহর অশেষ রহমতে ছেলেটি বেঁচে গেছে, তবে অন্য সন্তানদের নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকি।’

একইভাবে গত বছর (২০২৫) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় উখিয়ার ৫ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা ছৈয়দ উল্লার নয় বছরের কন্যাসন্তান জামিরা। শোকাহত বাবা ছৈয়দ উল্লা বলেন, ‘এক দিন হঠাৎ মেয়ের তীব্র জ্বর আসে। তিন-চার দিন পার হলেও জ্বর না কমায় হাসপাতালে নিই। সেখানেই মারা যায় আমার খুকি। চিকিৎসকরা জানান, সে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫-২৬ সালের জনস্বাস্থ্য চাহিদা মূল্যায়নে ২ হাজার ১৪টি রোহিঙ্গা পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সমীক্ষায় দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক ব্যাধিতে আক্রান্ত পরিবারের হার ২০২৪ সালের ১৯.২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৩২.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, শিশুদের নিয়মিত টিকাদান অসম্পূর্ণ থাকার হার দাঁড়িয়েছে ২৭.৮ শতাংশে এবং গর্ভবতী নারীদের গর্ভকালীন সেবা গ্রহণের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে নেমে এসেছে ৩৫ শতাংশে।

২০২৫ ও ২০২৬ সালেও ডেঙ্গু ও হাম ছিল স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ক্যাম্পগুলোতে মোট ২ হাজার ২৪২টি হামের প্রাদুর্ভাব রেকর্ড করা হয়েছে, যাতে প্রাণ গেছে ১০ জন রোহিঙ্গা শিশুর। 

হামের পরিস্থিতি সামলাতে কক্সবাজার জেলা হাসপাতালে একটি ২০ শয্যার বিশেষায়িত আইসোলেশন ও ট্রিটমেন্ট ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে, যেখানে ১,৯৪৬ জন সন্দেহভাজন হাম আক্রান্ত রোগীকে নিবিড় সেবা দেওয়া হয়।

ক্যাম্প-২৫ ছাড়া ভাসানচরসহ প্রায় সব ক্যাম্পেই ল্যাব-পরীক্ষিত হামের প্রাদুর্ভাব শনাক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিশেষ টিকাদান অভিযানের পর রোগী ও হাসপাতালে ভর্তির হার কিছুটা কমতে শুরু করে। 

অন্যদিকে, ডেঙ্গু পরিস্থিতিও বেশ ভয়াবহ। ডব্লিউএইচও-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের কেবল জুলাই মাসেই ৭৫০টি ‘RDT-পজিটিভ’ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়, যা জুন মাসের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত মোট আরডিটি-পজিটিভ ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৩৬৪ জনে।

পূর্বপ্রস্তুতি থাকলে যেকোনো জরুরি মুহূর্তে মানুষের অমূল্য জীবন রক্ষা করা অনেক সহজ হয়ে যায়। আর এই ধরনের আগাম প্রস্তুতির মূল ভিত্তি হলো সাধারণ মানুষের আস্থা এবং স্থানীয় কমিউনিটিকে সক্ষম করে তোলা।
— ডা. জর্জ মার্টিনেজ, প্রধান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (কক্সবাজার কার্যালয়)
বর্তমানে ডেঙ্গু, হাম, নিয়মিত টিকাদান এবং বর্ষাকালীন স্বাস্থ্য প্রস্তুতিই মানবিক সংস্থাগুলোর প্রধান অগ্রাধিকার। চলতি বছরে ০ থেকে ১১ মাস বয়সী ৬৫ হাজার ৮০০ শিশুকে নিয়মিত রুটিন ইমিউনাইজেশনের আওতায় পেন্টাভ্যালেন্ট-৩ টিকা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্যাম্পের ৬৭ হাজার শিশুকে জরুরি হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়া হয়।

কক্সবাজারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ও প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা কার্যক্রমের প্রধান ডা. নু নগুয়েন ট্রান মিন বলেন, ‘রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে অনেক মানুষকে অত্যন্ত ঘিঞ্জি পরিবেশে বসবাস করতে হয়। এর ওপর এক শিবির থেকে অন্য শিবিরে মানুষের অবারিত চলাচল রয়েছে। ফলে হামসহ যেকোনো সংক্রামক ব্যাধি অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তদুপরি অনেক শিশুর শরীরে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধক্ষমতার তীব্র ঘাটতি রয়েছে। সবমিলিয়ে সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা এখানে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোনো শিশু সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়া মাত্রই তা দ্রুত শনাক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোকে রোগীর চাপ সামলাতে প্রস্তুত রাখতে হবে এবং টিকাদানের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে শিশুদের নিরাপত্তা বলয় যেমন বাড়বে, তেমনি অন্যের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে আসবে।’

শিশুর নিরাপদ জন্মে আশা জাগাচ্ছে মাতৃ ও শিশু হাসপাতাল

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের শিশুদের জীবন কেবল রোগব্যাধি কিংবা অকাল মৃত্যুর আশঙ্কায় বন্দি নয়; সেবা ব্যবস্থার ইতিবাচক অগ্রগতিতে উঁকি দিচ্ছে নতুন আশার আলোও। 

এমনই এক দৃষ্টান্ত শিরিন নামের এক রোহিঙ্গা তরুণী। সন্তান প্রসবের সময় মারাত্মক জটিলতার মুখোমুখি হন তিনি। দীর্ঘ প্রসবযন্ত্রণার একপর্যায়ে গর্ভস্থ শিশুর হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে পড়ে, অ্যামনিওটিক তরল বিপজ্জনকভাবে কমে যায় এবং শিরিনের রক্তচাপ হু হু করে বাড়তে থাকে। চরম আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি বিবেচনা করে চিকিৎসকেরা দ্রুত সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।

২০২৬ সালের জুনে সেভ দ্য চিলড্রেন পরিচালিত নতুন মাতৃ ও শিশু হাসপাতালে সফল এই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেয় ফুটফুটে এক নবজাতক। বিশেষায়িত ৫৯ শয্যার এই আধুনিক হাসপাতালে জরুরি প্রসূতি সেবা, নবজাতকের নিবিড় চিকিৎসা, স্বাস্থ্য স্থিতিশীলকরণ ইউনিট (Stabilization Unit), প্রসবপূর্ব সেবা, পুষ্টি সহায়তা এবং সহিংসতার শিকার নারী-শিশুদের বিশেষ মানসিক সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

শিরিনের কোলে জন্ম নেওয়া এই শিশুটি কেবল একটি পরিবারের নতুন সদস্য নয়; এটি প্রমাণ করে দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটের মতো বাস্তবতায়ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্য পরিকাঠামো গড়ে তোলা গেলে শিশুদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
— গোলাম মোস্তফা, কক্সবাজার এরিয়া ডিরেক্টর, সেভ দ্য চিলড্রেন
সেভ দ্য চিলড্রেনের কক্সবাজার এরিয়া ডিরেক্টর গোলাম মোস্তফা জানান, ক্যাম্পের একেবারেই কাছে বিশ্বমানের বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে জটিল প্রসবের সময় মা ও শিশুর প্রাণহানির ঝুঁকি বহুগুণ কমিয়ে আনা যায়। তিনি বলেন, ‘শিরিনের কোলে জন্ম নেওয়া এই শিশুটি কেবল একটি পরিবারের নতুন সদস্য নয়; এটি প্রমাণ করে দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটের মতো বাস্তবতায়ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্য পরিকাঠামো গড়ে তোলা গেলে কোমলমতি শিশুদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।’

ইউনিসেফের ২০২৬ সালের অর্ধবার্ষিকীর (বাংলাদেশ মানবিক পরিস্থিতি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের সমর্থিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ৪ হাজারের বেশি শিশুর নিরাপদ প্রসব সম্পন্ন হয়েছে, যা মা ও নবজাতকের সুস্থতা ও সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখছে।

প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বলছে, মোট ৪ হাজার ১৭৮টি নিরাপদ প্রসবের মধ্যে রোহিঙ্গা শিবিরে ১,৬৭৩টি (৮০৯ কন্যা ও ৮৬৪ পুত্র) এবং আশপাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর (হোস্ট কমিউনিটি) মধ্যে ২,৫০৫টি (১,২৪০ কন্যা ও ১,২৬৫ পুত্র) শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিরাপদে জন্ম নিয়েছে। এর বাইরে ক্যাম্পের ৩২৫ জন মুমূর্ষু নবজাতককে বিশেষায়িত সেবা ইউনিট বা ‘স্ক্যানু’ (SCANU - Special Care Newborn Unit)-তে রেখে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

একই সময়ে মেয়াদের আগেই জন্ম নেওয়া (preterm), কম ওজনের এবং গুরুতর অসুস্থ ৫৩০ জন নবজাতককে বিশেষায়িত ‘নিউবর্ন স্ট্যাবিলাইজেশন ইউনিট’-এ নিবিড় চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলা হয়েছে।

রিটেলেড নিউজ

যশোরে স্বামী বিদেশে থাকার সুযোগে গৃহবধূকে ধর্ষনের চেষ্টা,লম্পট আটক

যশোরে স্বামী বিদেশে থাকার সুযোগে গৃহবধূকে ধর্ষনের চেষ্টা,লম্পট আটক

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : যশোর ব্যুরো : এক গৃহবধূ (৪০) এর স্বামী বিদেশে থাকার সুযোগে বিল্লাল হোসেন নামে এক লম্পট মোবাইলে ফোন কà...বিস্তারিত


পর্তুগালে পাঠানোর নামে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

পর্তুগালে পাঠানোর নামে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : যশোর ব্যুরো : ইউরোপের দেশ পর্তুগালে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার নামে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের মà...বিস্তারিত


হোমনায় মাহবুব আসলাম কাঞ্চনের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন

হোমনায় মাহবুব আসলাম কাঞ্চনের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : হোমনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি: কুমিল্লার হোমনা উপজেলার দূর্গাপুর গ্রামের বাসিন্দা মাহবুব আসলাম কাঞà§...বিস্তারিত


কুড়িগ্রামে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ 

কুড়িগ্রামে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ 

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মো:মিজানুর রহমান, কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার উমর মজিদ ইউনিয়নের রাজমাল্লী তালুয়à...বিস্তারিত


কেপিএম কে লাভজনক করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার: বিসিআইসি চেয়ারম্যান

কেপিএম কে লাভজনক করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার: বিসিআইসি চেয়ারম্যান

মাহাদী বিন সুলতান, রাঙ্গামাটি: : রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনায় অবস্থিত কর্ণফুলী পেপার মিলস লিমিটেড (কেপিএম)সহ দেশের সব রু...বিস্তারিত


ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে হাটহাজারী উপজেলায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও র‌্যালিতে জেলা প্রশাসক জাহিদ

ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে হাটহাজারী উপজেলায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও র‌্যালিতে জেলা প্রশাসক জাহিদ

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মোঃ নাজিম উদ্দীন হাটহাজারী : চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে বিভিন্ন উপজেলায় ছুটছেন চট্টগ্রাম জà§...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

নোয়াখালী প্রতিনিধি : : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্তার অà¦...বিস্তারিত


সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : সৌদি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, স্পীড লিমিট এর চাইতে অধিক গতিতে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের উপà¦...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর