শিরোনাম
আমাদের বাংলা ডেস্ক : | ০৫:৩১ পিএম, ২০২৬-১০-১৯
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দীন (এম.এ কামিল)
প্রতিষ্টাতা: কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা
লেখক: হাফেজ মোহাম্মদ সেলিম উদ্দীন (এম.এ কামিল)
প্রধান শিক্ষক, কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা হেফজ বিভাগ, চট্টগ্রাম।
ভূমিকা:
আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা মৃত্যুর পরও অমর ও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন। মানুষের অন্তর থেকে যুগের পর যুগ তাদের নাম কখনো মোছে না। মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যায়, কিন্তু তার সৎকর্ম তাকে মৃত্যুর পরেও অমর করে মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় করে রাখে।
তেমনই একজন ব্যক্তি, যিনি মরে গিয়েও অমর হয়ে রইলেন — তিনি হলেন বহু প্রতিভার অধিকারী, কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানার প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (রহ.)।
আসুন জেনে আসি তার জম্ম ও কর্মময় জীবন
জন্ম:
তিনি ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ২২ আগস্ট চট্টগ্রামের তৎকালীন পটিয়া (বর্তমান চন্দনাইশ) উপজেলার বরমা-আড়লিয়ার চর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর লাগানো বাগান:
একজন বাগানের রূপকার চলে যান, কিন্তু তাঁর সাজানো বাগান রয়ে যায়। বাগানে ফুল ফোটে, সুবাস ছড়ায়, পথিক সেই সুবাসে মুগ্ধ হয়।
মরহুম মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (রহ.) ছিলেন এমনই একজন মহান বাগানের রূপকার। আজ থেকে প্রায় ৯৫ বছর পূর্বে, ১৯৩০ সালে তিনি নিজ হাতে ছোট্ট পরিসরে গড়ে গিয়েছিলেন দ্বীনের এক সুবাসিত বাগান, যে বাগানের নাম হলো কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা, যা আজ দ্বীনের আলোকবর্তিকা হয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন পথে আলোর দিশারী হিসেবে সুবাতাস ছড়াচ্ছে।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর লাগানো বাগানের ফুলে আজও সুবাসিত আমরা।
৭৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণ:
তাঁর সমাধির গায়ে লেখা আছে তাঁর নিজের রচিত একটি ফারসি কবিতা, যার বাংলা অনুবাদ হলো—
হে পথিক! ক্ষণেকের তরে বস মোর শিয়রে,
ফাতেহা পড়িয়া যাও নিজ নিজ ঘরে।
যে জন আসিবে মোর সমাধির পাশে,
ফাতেহা পড়ে যাবে মম মুক্তির আশে।
অধম মনিরুজ্জামান নাম আমার,
ইসলামাবাদী বলে সর্বত্র প্রচার।
ভূমিকা:
আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা মৃত্যুর পরও অমর ও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন। মানুষের অন্তর থেকে যুগের পর যুগ তাদের নাম কখনো মোছে না।
মানবতা এমন একটি বিষয় যা মানুষকে অমর করে রাখে, আর এই সৌভাগ্য সকলের নসিবে জোটে না।
তেমনই একজন ব্যক্তি, যিনি মরে গিয়েও অমর হয়ে রইলেন — তিনি হলেন বহু প্রতিভার অধিকারী, কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানার প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (রহ.)।
মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যায়, কিন্তু তার সৎকর্ম তাকে মৃত্যুর পরেও অমর করে মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় করে রাখে। মরহুম মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (রহ.) ছিলেন এমনই একজন চিরস্মরণীয় মনীষী, যিনি ইসলামী শিক্ষার প্রচার, এতিম-অসহায়দের সেবা এবং দ্বীনের খেদমতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
আসুন, জেনে আসি এই মহান মনীষী কী কী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন
মরহুম মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (রহ.) ছিলেন এমনই একজন চিরস্মরণীয় মনীষী। ইসলামী শিক্ষার প্রচার, এতিম-অসহায়দের সেবা এবং দ্বীনের খেদমতে তিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন।
আসুন জেনে আসি এই মহান মনিষী কি কি প্রতিভার অধিকারী ছিলেন,।
শিক্ষা জীবন
মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০) ছিলেন ইসলামী চিন্তাবিদ, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও সাংবাদিক। তিনি ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ২২ আগস্ট চট্টগ্রামের তৎকালীন পটিয়া (বর্তমান চন্দনাইশ) উপজেলার বরমা-আড়ালিয়ার চর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষক পিতা পণ্ডিত মোহাম্মদ মতিউল্লাহ মুন্সীর তত্ত্বাবধানে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতা গমন করেন। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি সরকারি মাদ্রাসা থেকে ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে উচ্চতর ডিগ্রি এবং কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে টাইটেল পাস করেন। আরবি, উর্দু, ফারসি ভাষায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করলেও বাংলা ভাষা চর্চায় ছিল তাঁর বিশেষ মনোযোগ। প্রাচীন চট্টগ্রামের নাম ইসলামাবাদের অনুসারে তিনি নামের শেষে ‘ইসলামাবাদী’ শব্দ গ্রহণ করেন।
কর্মজীবন ও শিক্ষা বিস্তার:
তিনি রংপুরের হারাগাছ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে মাদ্রাসা অধ্যক্ষ হিসেবে কিছুদিন চাকরি করেন। কলকাতায় থাকাকালীন মাওলানা জৈনপুরীর আদর্শে ইসলাম প্রচার, স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের আদর্শে মুসলিম জাগরণ, নওয়াব আব্দুল লতিফের আদর্শে শিক্ষা বিস্তার ও জামাল উদ্দিন আফগানির ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধে প্রভাবিত হন। অবিভক্ত বাংলার মুসলিম জনগণের অন্ধত্ব, অশিক্ষা, গোঁড়ামি ও দারিদ্র্য দূর করতে তিনি শিক্ষাকেই বেছে নেন। তাঁর প্রচেষ্টায় উত্তরবঙ্গে বহু স্কুল, মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং চট্টগ্রামে কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা, কদম মোবারক এম.ওয়াই উচ্চ বিদ্যালয় ও বরকল এস.জেড উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
সাংবাদিকও লেখক হিসাবে
ইসলামাবাদী:
একটি জাতির জাগরণের ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিসীম এবং অনস্বীকার্য। সংবাদপত্র ব্যতীত কোনো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ ও অগ্রসর করানো যায় না। এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই তিনি সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেন।
'কিমিয়ায়ে সায়াদাত'-এর বাংলা অনুবাদক মির্জা ইউসুফ আলী ১৯০৩ সালে কলকাতা থেকে সাপ্তাহিক 'সোলতান' প্রকাশ করেন। মাওলানা ইসলামাবাদী এ পত্রিকায় কাজ শুরু করেন এবং ছয় মাস পর ১৯০৪ সালে এর সম্পাদনা ও পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯২৬ সালে কলকাতায় দাঙ্গার সময় তিনি সাপ্তাহিক 'সোলতান'কে দৈনিকে রূপান্তরিত করেন। মুসলমানদের মধ্যে তিনিই প্রথম বাংলা দৈনিক পত্রিকা সম্পাদনার গৌরব অর্জন করেন। তিনি সোলতান (১৯০১), হাবলুল মতিন (১৯১২), মোহাম্মদী (১৯০৩), কোহিনূর (১৯১১), বাসনা (১৯০৪) ও আল-এসলাম (১৯১৩) পত্রিকার সম্পাদনা ও প্রকাশের দায়িত্ব পালন করেন। প্যান-ইসলাম মতাদর্শের প্রবক্তা সৈয়দ জামালউদ্দিন আফগানীর শিষ্য আগা মঈদুল ইসলামের দৈনিক 'হাবলুল মতিন' এর বাংলা সংস্করণের সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯২৯ সালে তিনি নিজ দায়িত্বে দৈনিক 'আমীর' পত্রিকা প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক ব্যাক্তি।
রাজনৈতিক জীবন ও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন:
তিনি প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সদস্য (১৯০৬) ও ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্টের অন্যতম স্থপতি ছিলেন। ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম কনফারেন্সের আয়োজন করেন। ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর প্রচেষ্টায় আঞ্জুমানে উলামায়ে বাংলা প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তিনি ছিলেন এর যুগ্ম সম্পাদক। তিনি ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ-এর বঙ্গীয় প্রাদেশিক শাখার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। পরবর্তীতে কংগ্রেসের রাজনীতি ছেড়ে কৃষক প্রজা পার্টিতে যোগদান করেন এবং ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন।
ব্রিটিশ উপনিবেশে চট্টগ্রাম থেকে যারা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, অনন্ত সিং, গণেশ ঘোষ, যাত্রা মোহন সেনগুপ্ত। আর এই তালিকায় আলেম সমাজের শিরোমণি ও গর্ব ছিলেন মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী।
তিনি নিজের পৈতৃক সম্পত্তি হস্তান্তর করে সীতাকুণ্ডে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের গোপন দুর্গ হিসেবে খামারবাড়ি স্থাপন করেন। তিনি ১৯৪২-৪৩ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের ইস্টার্ন জোনের প্রধান সংগঠক ও সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত হন। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য মহাত্মা গান্ধী, জওয়াহেরলাল নেহরু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে তিনিও দিল্লির লালকেল্লায় বন্দি ছিলেন।
মৃত্যুর প্রায় ছয় বছর পুর্বে
১৯৪৪ সালের ১৩ অক্টোবর ৭০ বছর বয়সে তাঁকে গ্রেপ্তার করে দিল্লির লালকেল্লায় এবং পরে পাঞ্জাবের মিয়ানওয়ালী জেলে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। এই বৃদ্ধ বয়সে তাঁর ওপর যে অত্যাচার হয়েছিল, তা হানাফি মাযহাবের ইমাম, ইমাম আবু হানিফা রাঃ এর নির্যাতন কে ও হার মানাই।যে নির্যাতন এর বিষয়ে
তিনি বলে গেছেন এক অমর বাণী:
বৃদ্ধ বয়সে আমার ওপর যেভাবে অত্যাচার ও নির্যাতন ব্রিটিশ সরকার করেছে, পৃথিবীর কোনো সভ্য জাতির ইতিহাসে এরকম ঘটনা ঘটতে পারে না, কিন্তু তারা আমার দেশকে লুটে খাওয়ার জন্য আমাদের দেশের মানুষের ওপর নির্মম অত্যাচার করে চলেছে। এই অত্যাচারের একদিন শেষ হবে, আমরা স্বাধীন হবো এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সেই স্বাধীনতা ভোগ করবে- এটি আমার বিশ্বাস।
তাঁর স্বপ্ন ও অবদান:
চট্টগ্রামের দক্ষিণ মহকুমার কর্ণফুলীর তীরবর্তী দেয়াং পাহাড়ে জাতীয় আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ছিল তাঁর আজীবন। ১৯১৫ সালে তিনি সেই লক্ষ্যে সরকার থেকে ৬০০ বিঘা জমি ও ওই এলাকার জমিদার আলী খান থেকে ৫০০ কানি ভূমি রেজিস্ট্রি মূলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গ্রহণ করেছিলেন। মুসলিম রাজনীতিক ও শিক্ষাবিদ মাওলানা শওকত আলী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি স্থাপন করেন।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে মাওলানা ইসলামাবাদী বাংলা ভাষার পক্ষে জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেন, যা পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়েছিল।
মানুষ জন্মেছে যখন মৃত্যু তার হবেই, কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু মরেও অমর, তার উজ্জ্বল উদাহরণ মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী। আজ যদি ছাত্র-শিক্ষকদের নিকট প্রশ্ন করা হয়, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় অল ইন্ডিয়া পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের নাম কী? কেউ বলতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে যদি প্রশ্ন করা হয় ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী আলেমের নাম কী? সবাই এক বাক্যে বলবে, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী।
আমরা বুঝি আলেমদেরকে অনেকে মোল্লা নামে টিটকারি করে সম্বোধন করে। তারা হয়তো জানে না আলেমদের ভূমিকা কী ছিল, এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পিছনে তাঁর ভূমিকা কী ছিল?
কোরআন ও হাদীসের আলোকে আলেমের মর্যাদা: আল্লাহ তায়ালা বলেন: বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? [সূরা যুমার: ৯]। আরও বলেন: "তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উঁচু করে দেবেন। [সূরা মুজাদালা: ১১]। রাসূল (সা.) বলেছেন:নিশ্চয়ই আলেমগণ নবীদের ওয়ারিস।[আবু দাউদ]।
তিনি শুধু একজন আলেম ছিলেন না। একজন আলেম হওয়ার মাঝেই তিনি নিজেকে দমিয়ে রাখেননি। তিনি একজন ভালো লেখক হিসেবেও নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছেন, যাঁর লেখনীর মাধ্যমে স্বাধীন একটি দেশের স্বপ্ন রচয়িত হয়েছে।
#কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট
যখন তিনি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করলেন, চর্মচক্ষুতে অবলোকন করলেন এবং অন্তর দিয়ে অনুভব করলেন যে, সমাজের অবহেলিত, অনাথ, এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা নিদারুণ অর্থকষ্টের কারণে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদেরকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য, তাদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য সমাজের বিত্তবান ও এলিট শ্রেণির মানুষ এগিয়ে আসছে না, তাদের নিয়ে কাজ করার কোনো আগ্রহই কারো নেই।
ঠিক তখনই তিনি এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মুঘল আমলে নির্মিত ঐতিহ্যবাহী কদম মোবারক
শাহী জামে মসজিদের পাশে,অতি
ক্ষুদ্র পরিসরে, আজ থেকে প্রায় ৯৫ বছর পূর্বে, তাঁর ওফাতের প্রায় বিশ বছর আগে ১৯৩০ সালে আল্লাহর নামে মুসলিম মিশন' নাম দিয়ে আজকের
এই কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা এতিম ও অসহায় ছেলেদের আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
তখন না ছিল কোনো অর্থ-বিত্ত, না ছিল কোনো দালানকোঠা, না ছিল কোনো আহারের সুব্যবস্থা। ছিল কেবল
একমাত্র আল্লাহর উপর অগাধ ভরসা
ও তাওয়াক্কুল।
আর সেই ভরসাকে প্রধান অবলম্বন করে তিনি এতিম ও অসহায় ছাত্রদের কে নিয়ে ফজরের নামাজের পর কুরআনুল কারীমের একটি আয়াতকে ওজিফা হিসেবে বেছে নিলেন, যে আয়াতটি
দোয়ায়ে ইউনুস'নামে সর্বজনবিদিত।
দোয়ায়ে ইউনুস হলো:
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আনতা
সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমীন।
দোয়ায়ে ইউনুসের ফজিলতসমূহ
১. বিপদ থেকে মুক্তি:হযরত ইউনুস (আ.) যখন মাছের উদরে বন্দী ছিলেন, তখন এই দোয়ার বদৌলতেই আল্লাহ তা'আলা তাঁকে মুক্তি দান করেন। তাই যে কোনো বিপদ-আপদ, দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি থেকে পরিত্রাণের জন্য এটি সর্বাধিক পরীক্ষিত ও অব্যর্থ দোয়া।
২. গুনাহ মাফ:রাসুলুল্লাহ (সা.)
ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি একাগ্রচিত্তে এই দোয়া পাঠ করবে, আল্লাহ তা'আলা তার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।
৩. দোয়া কবুল:
হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, কোনো মুসলমান যদি এই দোয়ার ওসিলায় আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করে, আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন। [তিরমিযী]
৪.আজও সেই ধারা বলবৎ আছে। প্রতিদিন ফজর ও মাগরিবের নামাজের পর তিন শতাধিক এতিম ছাত্র ও সকল শিক্ষকের উপস্থিতিতে দেশ, জাতি ও মানবতার কল্যাণে এই খতম ও বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
সেই ছোট্ট পরিসরে তার হাতে গড়া এতিমখানাটি আজ দেশসেরা এতিমখানা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
আজ তোমারই রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান
মানুষ পৃথিবীতে কষ্ট করে পরিবারকে সুখে রাখার জন্য প্রবাস জীবনকে সঙ্গী করে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেয়, একটু সুখের আশায়। দেশে ডিপিএস করে, জমি ক্রয় করে। মন্ত্রী-এমপিরা তাদের উত্তর-প্রজন্মের জন্য সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে।
কিন্তু মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীরও তো পরিবার ছিল, সংসার ছিল। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন কী? তেমন কোনো সহায়-সম্পত্তির ইতিহাস নেই, নেই কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স। ব্যাংক বলতে, সঞ্চয় বলতে তিনি রেখে গেছেন চট্টগ্রামের সুনামধন্য, চট্টগ্রামের সর্ববৃহৎ একটি প্রতিষ্ঠান, যার নাম কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা।
তোমারই রেখে যাওয়া, তোমারই হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা আজ সারাদেশে সুপ্রসিদ্ধ ও সমাদৃত হয়ে শিক্ষার আলোয় সুবাতাস ছড়াচ্ছে।
তোমার রেখে যাওয়া সেই ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানটি আজ সকাল-বিকাল, দিন-রাত সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সন্তানদের জন্য একটি উন্মুক্ত দস্তরখানা ও নিয়ামতের মেজবান। যে প্রতিষ্ঠান তিনি রেখে গেছেন, তা আজ তিন শতাধিক অনাথ শিশুর নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
কে দেবে, কে খাওয়াবে, কোথা থেকে আসবে আহার— এ নিয়ে কখনো তিনি চিন্তা করেননি। তিনি কেমন হৃদয়ের আলেম ছিলেন! আল্লাহ তা'আলা কীভাবে তাঁর দোয়াকে কবুল করেছেন, তার রহস্য আজও অজানা।
তিনি কুরআন ও হাদিসের সেই আয়াত ও বাণীকে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে গেছেন। যখন তিনি দেখলেন আহার নেই, এতিম অসহায়রা হয়তো আজ উপবাস থাকবে, তখন তিনি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করলেন— রিজিকের মালিক তো আল্লাহ। বান্দার কাজ হলো চেষ্টা করা।
সেই চেষ্টা হিসেবে সকালের আহারের জন্য তিনি বেছে নিলেন ফজরের নামাজের পর এতিমদেরকে নিয়ে দোয়ায়ে ইউনুস পাঠ, আর রাতের আহারের জন্য বেছে নিলেন মাগরিবের নামাজের পর এতিম-অসহায়দের নিয়ে দোয়ায়ে ইউনুস ও মোনাজাত। সেই থেকে চলে আসা দোয়ায়ে ইউনুসের আমল আজও অব্যাহত আছে।
যে দোয়ায়ে ইউনুস পাঠের বরকতে হযরত ইউনুস (আ.)-কে আল্লাহ তা'আলা মাছের উদরে হেফাজত করেছিলেন, সেই দোয়ার বরকতে তার হাতে গড়া এই প্রতিষ্ঠানের দ্বীনি কার্যক্রম দেখে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ উদার মনে এই অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত, এতিম-অনাথদের জন্য সাহায্য-সহযোগিতার হাত প্রসারিত করছেন। দৈনিক দান-সদকা, যাকাত, কোরবানির চামড়াসহ সাধ্যমতো সহায়তায় এগিয়ে আসার ফলেই এই প্রতিষ্ঠান আজ বৃহৎ আকার ধারণ করেছে।
তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান আজ এইচএসসি, হিফজ বিভাগ, নাজেরা বিভাগ, নূরানী বিভাগ, কম্পিউটার ল্যাব, কারিগরি প্রশিক্ষণ, আলিম পর্যন্ত বিনামূল্যে পড়ালেখার সুযোগ দিয়ে ছাত্রদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পুলিশ, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে গড়ে তুলে দেশের আনাচে-কানাচে দেশসেবায় নিয়োজিত করছে।
প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা
প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয় তাঁর রেখে যাওয়া সাংগঠনিক ও আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে। আজ সমাজে এমন প্রতিষ্ঠানের সদস্য ও সভাপতি হওয়ার জন্য খুনোখুনি পর্যন্ত আমরা দেখতে পাচ্ছি। অথচ তিনি এমন ব্যবস্থা রেখে গেছেন যাতে পরিবারের কোনো সদস্য এই পদ-পরিচয় বহন করতে না পারে— যা তাঁর নির্লোভ মানসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বর্তমানে তাঁরাই দৌহিত্র জনাব এম. এম. ইসলামাবাদী এই প্রতিষ্ঠানের আইনি কাঠামোর মাধ্যমে গঠিত কমিটির একজন সাধারণ সদস্য মাত্র।
প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয় এডিসি (এল.এ) পদাধিকার বলে সভাপতি এবং সুনামধন্য বর্তমান সেক্রেটারি জনাব ডা. পারভেজ ইকবাল শরীফ ও তাঁর সাথে নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের ২১ জন সদস্যের মাধ্যমে।
তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে জনাব আলহাজ্ব আবুল কাশেম স্যারের সুদক্ষ পরিচালনায় এতিমখানা টি বর্তমানে উন্নতির শিখরে অবস্থান করছে। ১৯৮০ সালে যখন তিনি তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তখন এতিমখানার আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। একবেলা ভাত জুটলে আরেকবেলা রুটি, শিক্ষক স্বল্পতা সহ বহু সমস্যায় জর্জরিত ছিল প্রতিষ্ঠানটি। তাঁর দক্ষ পরিচালনা এবং পরিচালনা পর্ষদের একান্ত সহযোগিতায় আজ স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে এতিমদের থাকা-খাওয়া, দেখাশোনা ও পড়ালেখার জন্য প্রায় ২২ জন চৌকস মেধাবী শিক্ষক ও অফিস স্টাফ এবং ৪ জন বাবুর্চি নিয়োজিত রয়েছেন।
প্রতিষ্ঠাতার স্মরণসভা
আজ ২৪শে অক্টোবর প্রতিষ্ঠাতার স্মরণসভা উপলক্ষে বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রদের মিলনমেলা। সারা বছর সবাই এই মিলনমেলার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে। সবার মাঝে এক ধরনের আনন্দ ও বেদনা উভয়ই কাজ করে। শত ব্যস্ততা উপেক্ষা করে প্রাক্তনরা উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করে।
ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় তোমারই কবর। শান্তির সুবাস নিচ্ছে ছোট্ট অনাথ শিশুরা। রাত জেগে নিজেরাই ক্লাস অনুযায়ী তোমার স্মরণে সমাধিস্থলে বসে ফাতেহা পাঠ করে ও বাহারি ফুলে তোমার সমাধিস্থলকে ফুলের বাগানে পরিণত করে।
আজ এই ২৪শে অক্টোবর মহান মনীষীর স্মরণসভা উপলক্ষে আমরা আপনাকে স্মরণ করছি, যিনি শায়িত আছেন তাঁরই প্রতিষ্ঠান যেন কবর থেকে দেখতে পায়।
কদম মোবারক শাহী কবরস্থানে।
লেখক হিসেবে অবদান
লেখক হিসেবেও তিনি সুপ্রসিদ্ধ। একজন আলেম হয়ে তিনি শুধু এতিমখানা খুলে দ্বীনের খেদমত করেছেন তা নয়, বরং দ্বীন প্রচারে লেখনীকেও তিনি একটি সফল হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে:
১. ভারতে মুসলিম সভ্যতা
২. সমাজ সংস্কার
৩. ভূগোল শাস্ত্রে মুসলমান
৪. ইসলাম জগতের অভ্যুত্থান
৫. ভারতে ইসলাম প্রচার
৬. সুদ সমস্যা
৭. ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানদের অবদান (৩ খণ্ডে)
৮. ইসলামী শিক্ষা
৯. কোরআন ও বিজ্ঞান
১০. আত্মজীবনী ইত্যাদি। তিনি প্রায় ৪২টি গ্রন্থ রচনা করেন।
আমরা গর্ব করে বলতে পারি, আমরা তোমারই ফুলের বাগানে ফুল ফোটাচ্ছি। যে ফুলের সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে আজ দেশব্যাপী, এমন ফুল যা কখনো শুকায় না। যে ফুলের সুবাসে দেশ ও জাতি উপকৃত হচ্ছে, সেই সুবাসিত ফুলগুলো হলো
হাফেজ হয়ে ইমাম-মুয়াজ্জিন, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পুলিশ, সরকারি আমলা ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেক্টরে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালনকারী আমাদেরই ভাইয়েরা।
আজ এই মহান মহীয়সী বীরপুরুষের সাথে সাথে আমরা সেসব ব্যক্তিবর্গকেও স্মরণ করছি, যারা এই প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করে ইন্তেকাল করেছেন, যেসব শিক্ষক, পরিচালনা পর্ষদের সেক্রেটারি ও সদস্য, আজীবন সদস্য, দাতা সদস্য, যাদের আর্থিক, শারীরিক, দক্ষ পরিচালনা, তত্ত্বাবধায়ক, বাবুর্চি সকলের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
এই মহান বীরপুরুষ ১৯৫০ সালের ২৪শে অক্টোবর ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা কার্যকরী পরিষদের পক্ষ হতে দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
সকাল পর্ব -
কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদে:
ফজরের নামাজের পর সকল ছাত্র, শিক্ষক ও প্রাক্তন ছাত্রদের নিয়ে খতমে ইউনুস, খতমে কুরআন, খতমে গাউছিয়া, মিলাদ-মোনাজাত, কবর জিয়ারত ও পুষ্পস্তবক অর্পণ,
মিষ্টি বিতরণ এবং সকালে উন্নতমানের নাস্তা।
বিকাল পর্ব -
চট্টগ্রাম কদম মোবারক এম ওয়াই উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গনে আলোচনা সভা
(বিকাল ৩টা থেকে):মরহুমের জীবনী নিয়ে মুক্ত আলোচনা ও স্মরণসভা, হামদ-নাত, কেরাত ও রচনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ, ও হেফজ সমাপ্ত কারি ছাত্র দের মাঝে পাগড়ি প্রদান
সমাপ্তি:
পরিশেষে মিলাদ-কিয়াম ও তাবারুক বিতরণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হবে।
আল্লাহ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন। আমিন।
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মাহাবুব রহমান দুর্জয় : মানুষের জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী। অথচ এই অল্প সময়ের জীবনেই আমরা কত সম্পর্ক গড়ে à...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মাহাবুব রহমান দুর্জয় : সমাজে কিছু আচরণ আছে, যেগুলোকে আমরা এতদিন ধরে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে নিতে à...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র বà...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে একটি নীরব যন্ত্à...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মেজর (অব.) মনজুর কাদের সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘চীনকে ঘুমাতে দাও; যখন সে জেগে উঠবে, সে বিশ্বকে কাà¦...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কাজী আব্দুল্লাহ আল বোরহান রিজভী বাংলাদেশ গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং সামাজà...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited