শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৯:৪৯ পিএম, ২০২৬-১০-১৮
একটি গিটার কখনো কখনো শুধু বাদ্যযন্ত্র থাকে না—হয়ে ওঠে একটি সময়ের কণ্ঠস্বর। বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে সেই গিটার হাতে যে মানুষটি কয়েক প্রজন্মের হৃদয়ে ঝড় তুলেছিলেন, তিনি আইয়ুব বাচ্চু। চট্টগ্রামের মাটিতে বেড়ে ওঠা এই শিল্পী কণ্ঠ, সুর ও গিটারের অনন্য মেলবন্ধনে বদলে দিয়েছিলেন বাংলা রকসংগীতের স্বর। তাঁর কণ্ঠে প্রেম যেমন কথা বলেছে, তেমনি বিরহ, একাকিত্ব ও জীবনের অস্থিরতাও পেয়েছে নিজস্ব ভাষা। ২০১৮ সালে তাঁর শারীরিক প্রস্থান ঘটলেও ‘সেই তুমি’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘হাসতে দেখো’ কিংবা ‘রুপালি গিটার’ আজও ফিরে আসে নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে। তাই আইয়ুব বাচ্চু শুধু একজন শিল্পীর নাম নয়; তিনি বাংলাদেশের সংগীতের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের নাম।
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্ম নেন আইয়ুব বাচ্চু। তাঁর ডাকনাম ছিল রবিন। চট্টগ্রামেই কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোরের গুরুত্বপূর্ণ সময়। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ। গিটার হয়ে ওঠে তাঁর নিত্যসঙ্গী। কৈশোরেই শুরু হয় সংগীতচর্চা এবং মঞ্চে ওঠার অভিজ্ঞতা। ১৯৭৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সংগীতজীবনের পথচলা শুরু করেন তিনি। পরের বছর যুক্ত হন ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডে।
১৯৮০ সালে আইয়ুব বাচ্চু যোগ দেন ‘সোলস’-এ। প্রায় এক দশক এই ব্যান্ডের সঙ্গে কাজ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন দক্ষ গিটারবাদক হিসেবে। কিন্তু নিজের সংগীতভাবনা ও সৃষ্টিশীলতার জন্য আরও বড় পরিসর প্রয়োজন ছিল। সেই ভাবনা থেকেই ১৯৯১ সালে গড়ে তোলেন ‘এলআরবি’। ব্যান্ডটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতে তৈরি করে নতুন ধারার উন্মাদনা।
এলআরবির পাশাপাশি একক শিল্পী হিসেবেও আইয়ুব বাচ্চু অর্জন করেন ব্যাপক জনপ্রিয়তা। ‘সেই তুমি’, ‘হাসতে দেখো’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘রুপালি গিটার’সহ অসংখ্য গান মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তাঁর গানে প্রেম ও বিরহ যেমন ছিল, তেমনি ছিল জীবনের বাস্তবতা, একাকিত্ব ও আত্মঅন্বেষণ। শ্রোতারা তাঁর গানে নিজেদের গল্প খুঁজে পেয়েছেন।
তবে তাঁর জনপ্রিয়তার সবচেয়ে উজ্জ্বল জায়গাগুলোর একটি ছিল গিটার। গিটারকে তিনি কেবল বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেননি; সেটিকে পরিণত করেছিলেন আবেগ প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যমে। মঞ্চে গিটার হাতে তাঁর উপস্থিতি ছিল স্বতন্ত্র। দীর্ঘ গিটারসলো, কণ্ঠের আবেগ এবং পরিবেশনার নিজস্ব ধরন তাঁকে সমসাময়িক শিল্পীদের থেকে আলাদা করেছে। তরুণদের হাতে গিটার তুলে দেওয়ার পেছনেও তাঁর প্রভাব ছিল অসামান্য।
সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর পথেও ছিল নানা প্রতিকূলতা। ব্যান্ডসংগীতের শুরুর সময়ে সীমিত বাজার, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং অ্যালবামনির্ভর শিল্পের নানা অনিশ্চয়তা তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। পরে সংগীতের বাজার যখন ক্যাসেট-সিডি থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে চলে যায়, তখন বদলে যায় শিল্পী ও শ্রোতার সম্পর্কও। সব গান বা অ্যালবাম সমান জনপ্রিয় হয়নি। কিন্তু এসব ওঠানামা তাঁর দীর্ঘ সংগীতযাত্রার সাফল্যকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি।
আইয়ুব বাচ্চুর বড় অর্জন শুধু তাঁর নিজের জনপ্রিয়তা নয়। তিনি বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতকে মূলধারার শ্রোতার কাছে আরও শক্তভাবে পৌঁছে দিতে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর গান ও গিটারবাদন অসংখ্য তরুণকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর হাত ধরে রকসংগীত পেয়েছে দেশীয় ভাষা, আবেগ ও স্বতন্ত্র পরিচয়। ফলে তাঁর প্রভাব কেবল তাঁর সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবর রংপুরে তিনি জীবনের শেষ কনসার্টে গান করেন। মাত্র দুই দিন পর, ১৮ অক্টোবর ঢাকায় হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ৫৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন আইয়ুব বাচ্চু। আকস্মিক এই মৃত্যু সংগীতাঙ্গনে তৈরি করে গভীর শূন্যতা। চট্টগ্রামের চৈতন্য গলি কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
তাঁর মৃত্যুর পরও থামেনি মূল্যায়ন। চট্টগ্রামে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আসে ২০২৬ সালে। বাংলাদেশের সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য আইয়ুব বাচ্চুকে মরণোত্তর একুশে পদক ২০২৬ প্রদান করে সরকার। তাঁর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এই সম্মান গ্রহণ করেন। এই স্বীকৃতি শুধু একজন শিল্পীর প্রতি সম্মান নয়; বাংলাদেশের ব্যান্ড ও রকসংগীতের দীর্ঘ পথচলারও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
আইয়ুব বাচ্চুর জীবনের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা তাঁর অকালপ্রয়াণ। আরও কয়েকটি দশক বেঁচে থাকলে তাঁর সৃষ্টির ভাণ্ডারে হয়তো যোগ হতো আরও অসংখ্য গান, সুর ও গিটারের অনবদ্য মুহূর্ত। কিন্তু শিল্পীর শরীরের মৃত্যু তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু ঘটাতে পারেনি। চট্টগ্রামের যে মাটি তাঁকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল, সেই শহর থেকে উঠে এসে তিনি পৌঁছে গেছেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্মৃতির স্থায়ী ঠিকানায়। সময় তাঁকে মুছে ফেলবে না; বরং প্রতিটি নতুন গিটার যখন ‘সেই তুমি’ কিংবা ‘চলো বদলে যাই’-এর সুর তুলবে, তখনই আবার ফিরে আসবেন আইয়ুব বাচ্চু—রুপালি গিটারের ঝংকারে, অমর এক কিংবদন্তি হয়ে।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম বিনোদন সাংবাদিক সংস্থা।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : রাতের নীরবতায় একটি মুঠোফোনের পর্দায় ভেসে উঠেছিল বাবার কাছে পাঠানো মেয়ের শেষ আকুতি। নিজের অবস্থান...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : এম.কামাল উদ্দিন মাষ্টার ঐতিহ্যবাহী কাট্টলী যুগে যুগে জন্ম দিয়েছে শিক্ষা সামাজিক সাংস্কৃতিক ও à¦...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : এড. মোস্তফা নুর : রাজনীতির মৌলিক শিক্ষা যাদের নেই, তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত হচ্ছে শুধু গণতানà...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : অন্ধকারেরও একটা সীমা আছে। রাতের অন্ধকার স্বাভাবিক; কিন্তু মানুষের ঘরে যে অন্ধকার নেমে আসে, তার কার...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে দিনভর কনটেইনারের ওঠানামা। বিশাল ক্রেন, ছুটে চলা ট্রাক আর ব্যস্ত বন্দরের...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : জাতীয় পরিচয়পত্র একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান দলিল। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নাগর...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited