শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৮:০৯ পিএম, ২০২৬-১০-২৬
আবদুল্লাহ মজুমদার
চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তায় প্রতিদিনের যানজট, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, বর্জ্যের স্তূপ আর নাগরিক দুর্ভোগের মধ্যেই নগর সরকার নিয়ে নতুন এক প্রশ্ন সামনে এসেছে—নগরবাসীর নির্বাচিত মেয়র, নাকি সরকার-নিযুক্ত প্রশাসক? চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর প্রশ্নটি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কারণ, এই পরিবর্তন শুধু একটি পদবির পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ, আদালতের রায়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া নানা জিজ্ঞাসা। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ব্যক্তিগত বা দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে দেখতে হবে—আইন কী বলছে, নথিতে কী রয়েছে এবং নগরবাসীর স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে।
পরিষদের মেয়াদ শেষ, নিয়োগে ২৪৪ দিনের ব্যবধান
সরকারি নথির বরাতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ২০২১ সালে নির্বাচিত চসিক পরিষদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি। পাঁচ বছরের মেয়াদ হিসাব করলে পরিষদটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। অন্যদিকে, ডা. শাহাদাত হোসেনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হয় ২৫ অক্টোবর। অর্থাৎ, পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রশাসক নিয়োগের মধ্যে ২৪৪ দিনের ব্যবধান রয়েছে। এই হিসাবটি দুই তারিখের মধ্যবর্তী অতিবাহিত দিনের ভিত্তিতে করা হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং মেয়র হিসেবে কোনো ব্যক্তির দায়িত্বের মেয়াদ—দুটি বিষয় আইনগতভাবে সম্পর্কিত হলেও একেবারে একই প্রশ্ন নয়। তাই পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার তথ্য থেকে এককভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না যে, এর পরের পুরো সময় মেয়রের দায়িত্ব পালন অবৈধ ছিল। বিষয়টি নির্ধারণ করতে প্রযোজ্য আইন, আদালতের আদেশ, সরকারি প্রজ্ঞাপন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি একসঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তবে পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নির্বাচন কিংবা পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিষয়ে স্পষ্টতা না থাকলে নগরবাসীর মনে প্রশ্ন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
আদালতের রায় ও মেয়াদের প্রশ্ন
২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত চসিক নির্বাচনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন বিএনপির প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল তাঁকে নির্বাচিত মেয়র ঘোষণা করেন। পরে ৮ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করে এবং ৩ নভেম্বর তিনি মেয়র হিসেবে শপথ নেন।
এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে শাহাদাত হোসেন মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে তাঁর দায়িত্বের মেয়াদ নিয়ে পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে আসে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাহাদাত হোসেনের বক্তব্য ছিল, আদালতের আদেশ অনুযায়ী তাঁর মেয়াদের ধারাবাহিকতা ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার বিভাগের নথির বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালত তাঁকে মেয়র ঘোষণা করলেও তাঁর দায়িত্বের মেয়াদ কত দিন হবে, সে বিষয়ে আলাদা কোনো নির্দেশনা ছিল না।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আদালতের রায়ে ঠিক কী বলা হয়েছে এবং রায়ের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের গেজেটে কী উল্লেখ রয়েছে। মূল রায়, সংশোধিত গেজেট ও সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি প্রকাশ্যে এনে বিষয়টি পরিষ্কার করা হলে বিতর্কের অবকাশ কমবে। শুধু একটি পক্ষের বক্তব্য কিংবা অসম্পূর্ণ নথির ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
প্রশাসক নিয়োগের আইনি ভিত্তি
২৫ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনে ডা. শাহাদাত হোসেনকে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর বিধান অনুযায়ী প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন সিটি করপোরেশন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত অথবা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করবেন। এ সময়ে তিনি মেয়রের ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন এবং বিধি অনুযায়ী সম্মানী ও অন্যান্য ভাতা পাবেন।
অতএব, এখন তাঁর আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব প্রশাসকের। তবে প্রশাসক হিসেবে মেয়রের ক্ষমতা প্রয়োগের বিধান থাকায় দৈনন্দিন নাগরিক সেবা, উন্নয়ন কার্যক্রম কিংবা করপোরেশনের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সুযোগ রয়েছে।
তবু আইনগতভাবে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা থাকা আর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন এক নয়। প্রশাসক নিয়োগের আইনি ভিত্তি থাকলেও নির্বাচিত প্রতিনিধির বিকল্প হিসেবে দীর্ঘ সময় প্রশাসকনির্ভর ব্যবস্থা কাম্য কি না, তা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। কারণ সিটি করপোরেশন কেবল একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি নগরবাসীর ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব কার?
চসিকের নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা পরিষ্কারভাবে জানানো জরুরি। নির্বাচনের সময়সূচি, প্রস্তুতি, আইনি জটিলতা কিংবা প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত সেগুলো ব্যাখ্যা করা।
নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের হলেও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরও রয়েছে। তাই নির্বাচন কবে হতে পারে, কোন পর্যায়ে প্রস্তুতি রয়েছে এবং বিলম্বের কারণ কী—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। অস্পষ্টতা দীর্ঘ হলে গুজব, অনুমান ও রাজনৈতিক বিতর্ক বাড়ে; ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনআস্থা।
মেয়র না প্রশাসক—মূল বিবেচনা নাগরিক সেবা
মেয়র নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি; প্রশাসক সরকার-নিযুক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। দুজনের দায়িত্ব পালনের আইনি কাঠামো ও গণতান্ত্রিক ভিত্তি এক নয়। তবে নগরবাসীর দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—নগরীর জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক, পরিচ্ছন্নতা, জনস্বাস্থ্য ও অন্যান্য নাগরিক সেবায় কতটা অগ্রগতি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সড়ক অবকাঠামোর নানা সমস্যায় ভুগছে। এসব সমস্যার সমাধানে সিটি করপোরেশনের কার্যকর নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রয়োজন। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন হোক কিংবা প্রশাসক হিসেবে—নগরবাসীর কাছে কাজের হিসাব দেওয়ার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
একই সঙ্গে প্রশাসক নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত সম্মান, দলীয় পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে মূল আলোচনায় আনা উচিত নয়। দায়িত্বের পদবির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই দায়িত্ব কীভাবে পালন করা হচ্ছে এবং নাগরিকেরা তার সুফল পাচ্ছেন কি না।
প্রয়োজন নথির স্বচ্ছতা ও নির্দিষ্ট সময়সীমা
চসিকের বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত। প্রথমত, আদালতের রায়ে মেয়রের দায়িত্বের মেয়াদ সম্পর্কে কী নির্দেশনা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্বের কারণ কী। তৃতীয়ত, পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি ও সম্ভাব্য সময়সীমা কী।
এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ, আইনগত ব্যাখ্যা এবং দায়িত্বশীল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। মূল আদালতের রায়, নির্বাচন কমিশনের গেজেট ও নিয়োগসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জনসমক্ষে সহজে যাচাই করার সুযোগ থাকলে বিতর্কের অনেকটাই নিরসন সম্ভব।
চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নগরী। এই নগরের স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হওয়া উচিত নয়। প্রশাসক হিসেবে ডা. শাহাদাত হোসেনের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরবর্তী নির্বাচনের পথও পরিষ্কার করা জরুরি। কারণ নগরবাসী শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা চান না; তাঁরা চান নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।
নগরীর ব্যস্ত সড়কে ছুটে চলা মানুষ, বৃষ্টির পানিতে আটকে পড়া পথচারী কিংবা প্রতিদিনের নাগরিক সেবা পেতে অপেক্ষায় থাকা বাসিন্দাদের কাছে মেয়র ও প্রশাসকের পার্থক্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় কাজের ফল দিয়ে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শুধু কাজের ফলই যথেষ্ট নয়; দায়িত্বের বৈধ ভিত্তি, সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজন কাউকে আগেভাগে দোষী বা নির্দোষ ঘোষণা করা নয়, বরং আদালতের রায় ও সরকারি নথির ভিত্তিতে মেয়াদের প্রশ্ন পরিষ্কার করা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়া এবং পরবর্তী নির্বাচনের বিষয়ে নির্দিষ্ট রূপরেখা প্রকাশ করা। চট্টগ্রামবাসী জানতে চান—তাঁদের নগর সরকার কোন আইনি ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে, আর নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব ফিরে পাওয়ার পথ কতটা স্পষ্ট।
লেখক: লাভ বাংলাদেশ পার্টির মহানগর সভাপতি ও প্রেসিডিয়াম সদস্য।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : সকালে সংবাদ সংগ্রহে বের হন একজন সাংবাদিক। মানুষের কথা, সমাজের সংকট আর অনিয়ম-অসংগতি তুলে ধরাই তাঁর à¦...বিস্তারিত
মো. আরফান উদ্দীন : পৃথিবীর আর কোন দেশে বাংলাদেশের মতো প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় এত মানুষের প্রাণহানি ঘটে কি না, তা আমার...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : একটি গিটার কখনো কখনো শুধু বাদ্যযন্ত্র থাকে না—হয়ে ওঠে একটি সময়ের কণ্ঠস্বর। বাংলাদেশের ব্যান্ডস...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : রাতের নীরবতায় একটি মুঠোফোনের পর্দায় ভেসে উঠেছিল বাবার কাছে পাঠানো মেয়ের শেষ আকুতি। নিজের অবস্থান...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : এম.কামাল উদ্দিন মাষ্টার ঐতিহ্যবাহী কাট্টলী যুগে যুগে জন্ম দিয়েছে শিক্ষা সামাজিক সাংস্কৃতিক ও à¦...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : এড. মোস্তফা নুর : রাজনীতির মৌলিক শিক্ষা যাদের নেই, তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত হচ্ছে শুধু গণতানà...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited