শিরোনাম
মিলন লস্কর, শিলচর (ভারত) : | ০১:১১ পিএম, ২০২৬-১০-২৬
মিলন উদ্দিন লস্কর
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি রাজ্য মেঘালয়। নামের অর্থ মেঘের আবাসভূমি। এই রাজ্যের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন চেরাপুঞ্জি। পাহাড়ের গায়ে মেঘের আনাগোনা, আকাশছোঁয়া জলপ্রপাত, গভীর গিরিখাত, সবুজ বনভূমি এবং পাহাড়ি ঝরনার কলতানে মুখর এই অঞ্চল প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক স্বপ্নের জগৎ। পৃথিবীর অন্যতম বৃষ্টিবহুল অঞ্চল হিসেবে চেরাপুঞ্জির পরিচিতি দীর্ঘদিনের। স্থানীয় খাসি ভাষায় এই জনপদের নাম সোহরা। প্রকৃতির বৈচিত্র্য, খাসি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য এবং অনন্য ভূপ্রকৃতির সমন্বয়ে চেরাপুঞ্জি আজ দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
মেঘালয়ের ইস্ট খাসি হিলস জেলায় অবস্থিত চেরাপুঞ্জি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যথেষ্ট উচ্চতায়, খাসি পাহাড়ের দক্ষিণ ঢালে বিস্তৃত। শিলং থেকে এর দূরত্ব সড়কপথে প্রায় ৫৩ থেকে ৫৪ কিলোমিটার। শিলং থেকে চেরাপুঞ্জির পথে এগিয়ে চললে চোখে পড়ে পাহাড়ের পর পাহাড়, গভীর উপত্যকা, আঁকাবাঁকা রাস্তা এবং দূরে ভেসে বেড়ানো মেঘের দল। কখনও পাহাড়ের চূড়া মেঘে ঢেকে যায়, কখনও আবার মেঘের আবরণ সরতেই উন্মোচিত হয় সবুজে মোড়া উপত্যকার অপরূপ দৃশ্য। প্রকৃতি যেন প্রতিটি বাঁকে নতুন করে নিজেকে সাজিয়ে তোলে।
চেরাপুঞ্জির বিশেষ পরিচিতির অন্যতম কারণ এখানকার বিপুল বৃষ্টিপাত। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু খাসি পাহাড়ের দক্ষিণ ঢালে বাধা পেয়ে উপরের দিকে উঠে যায়। উচ্চতায় উঠে বায়ু ঠান্ডা হওয়ার ফলে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয় এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটে। এই ভৌগোলিক অবস্থানই চেরাপুঞ্জিকে পৃথিবীর অন্যতম বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে পরিণত করেছে। বর্ষাকালে পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য জলধারা নেমে আসে। শুকনো পাথুরে খাতও জলে ভরে ওঠে, আর ছোট ছোট ঝরনা পরিণত হয় প্রবল জলপ্রবাহে। তবে অতিবৃষ্টির এই অঞ্চলে জলসম্পদের প্রাচুর্য থাকলেও বছরের অন্য সময়ে পানীয় জলের সংকট দেখা দিতে পারে। প্রকৃতির এই বৈপরীত্য চেরাপুঞ্জির পরিবেশকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
চেরাপুঞ্জির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নোহকালিকাই জলপ্রপাত। পাহাড়ের খাড়া প্রান্ত থেকে বিপুল জলরাশি গভীর খাদে নেমে যাওয়ার দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। চারপাশের সবুজ পাহাড়, পাথুরে দেওয়াল এবং নিচে জলপ্রপাতের জলাধার এক অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে দূর থেকে জলপ্রপাতের পূর্ণ রূপ দেখা যায়। এই জলপ্রপাতকে ঘিরে স্থানীয় খাসি সমাজে একটি করুণ লোককাহিনিও প্রচলিত রয়েছে, যা প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে স্থানীয় লোকবিশ্বাসের যোগসূত্র তৈরি করেছে।
চেরাপুঞ্জির আরেকটি উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ সেভেন সিস্টার্স জলপ্রপাত, যার স্থানীয় নাম নোহস্নগিথিয়াং জলপ্রপাত। পাহাড়ের দীর্ঘ খাড়া দেওয়াল বেয়ে সাতটি পৃথক ধারায় জল নিচে নেমে আসে বলে এর নাম হয়েছে সেভেন সিস্টার্স। বিশেষ করে বর্ষাকালে জলপ্রপাতটি পূর্ণ রূপ ধারণ করে। আকাশ থেকে নেমে আসা মেঘ, পাহাড়ের সবুজ আচ্ছাদন এবং একসঙ্গে প্রবাহিত সাতটি জলধারা মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। প্রকৃতির এই অপূর্ব সৃষ্টি চেরাপুঞ্জির সৌন্দর্যকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি দিয়েছে।
এ ছাড়া ডেইনথলেন জলপ্রপাতও এই অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণ। পাথুরে ভূখণ্ডের উপর দিয়ে প্রবাহিত জল এখানে এসে জলপ্রপাতের সৃষ্টি করেছে। এই স্থানকে ঘিরেও খাসি লোককথায় নানা কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। পাহাড়ি জনজীবনে প্রকৃতি, লোকবিশ্বাস এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা মৌখিক ঐতিহ্য যে কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে, এই ধরনের কাহিনি তারই পরিচয় বহন করে।
চেরাপুঞ্জির প্রাকৃতিক বিস্ময়ের তালিকায় মাওসমাই গুহার নামও উল্লেখযোগ্য। চুনাপাথরের স্তরে দীর্ঘ সময় ধরে প্রাকৃতিক ক্ষয় ও অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফলে এই গুহার সৃষ্টি হয়েছে। গুহার ভিতরে সরু পথ, পাথুরে দেওয়াল এবং নানা আকৃতির প্রাকৃতিক শিলাগঠন দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। গুহার অন্ধকার পরিবেশের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেলে ভূপ্রকৃতির এক ভিন্ন জগতের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়। প্রকৃতির নীরব হাতে হাজার হাজার বছর ধরে কীভাবে পাথরের আকৃতি বদলে যায়, মাওসমাই গুহা তারই এক বাস্তব নিদর্শন।
তবে চেরাপুঞ্জির সবচেয়ে বিস্ময়কর সম্পদগুলির মধ্যে অন্যতম হলো জীবন্ত শিকড়ের সেতু। প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর খুব বেশি অঞ্চলে দেখা যায় না। স্থানীয় খাসি জনগোষ্ঠী বিশেষ প্রজাতির রাবার গাছের বায়বীয় শিকড়কে নির্দিষ্ট পথে পরিচালিত করে নদী বা ঝরনার উপর সেতু তৈরি করেন। শিকড়গুলি ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে, পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যায় এবং সময়ের সঙ্গে শক্ত কাঠামো গড়ে তোলে। এই সেতু তৈরির জন্য দীর্ঘ সময় ধরে ধৈর্য ও পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। একবার তৈরি হয়ে গেলে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এগুলি বহু বছর ব্যবহার করা সম্ভব।
চেরাপুঞ্জির কাছে নংরিয়াত গ্রামে অবস্থিত বিখ্যাত ডাবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ এই ঐতিহ্যের এক অসাধারণ নিদর্শন। নাম থেকেই বোঝা যায়, এখানে শিকড়ের তৈরি দুটি সেতু দুটি স্তরে বিস্তৃত। পাহাড়ি পথ ধরে দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার পর এই সেতুতে পৌঁছাতে হয়। যাত্রাপথ কিছুটা কষ্টসাধ্য হলেও চারপাশের সবুজ বনভূমি, পাহাড়ি ঝরনা এবং প্রকৃতির নিস্তব্ধতা সেই পরিশ্রমকে সার্থক করে তোলে। এই সেতু শুধু পর্যটকদের আকর্ষণ নয়, স্থানীয় মানুষের প্রকৃতিনির্ভর জ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতারও অনন্য উদাহরণ।
চেরাপুঞ্জির প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে খাসি জনগোষ্ঠী। এখানকার ভাষা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, লোকসংগীত, উৎসব এবং সামাজিক রীতিনীতি এই অঞ্চলের স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। খাসি সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো মাতৃসূত্রীয় ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় বংশপরিচয় সাধারণত মায়ের সূত্রে নির্ধারিত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্পত্তির উত্তরাধিকারও মাতৃবংশের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গড়ে ওঠা তাঁদের জীবনযাত্রা ও ঐতিহ্য চেরাপুঞ্জির পর্যটনকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।
চেরাপুঞ্জি ভ্রমণের জন্য বর্ষাকাল যেমন জলপ্রপাতের পূর্ণ সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ দেয়, তেমনই প্রবল বৃষ্টি, পিচ্ছিল রাস্তা এবং দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ার কারণে ভ্রমণে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে সাধারণত আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে অনুকূল থাকে। এই সময় পাহাড়ি পথ, গুহা এবং বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার সুবিধা বেশি। তবে আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে বলে যাত্রার আগে স্থানীয় আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে নেওয়া উচিত।
শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য নয়, প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে নতুন করে ভাবার জন্যও চেরাপুঞ্জি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বিপুল বৃষ্টিপাত সত্ত্বেও পানীয় জলের সংকট, পাহাড়ি পরিবেশের ভঙ্গুরতা এবং প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির সম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবহার ও রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে জীবন্ত শিকড়ের সেতুর মতো ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা মানে শুধু একটি দর্শনীয় স্থানকে বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রজন্মলব্ধ জ্ঞান ও সংস্কৃতিকেও সম্মান জানানো।
সব মিলিয়ে চেরাপুঞ্জি এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে মেঘ ও পাহাড়ের মিলন, জলপ্রপাতের গর্জন, ঝরনার কলতান এবং সবুজ অরণ্যের নীরবতা এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এখানে প্রকৃতি কখনও প্রবল বৃষ্টির রুদ্ররূপে, কখনও মেঘে ঢাকা পাহাড়ের কোমল সৌন্দর্যে, আবার কখনও জীবন্ত শিকড়ের সেতুর বিস্ময়কর সৃষ্টিতে নিজেকে প্রকাশ করে। মেঘালয়ের এই অপরূপ জনপদ তাই শুধু পর্যটনের ঠিকানা নয়; এটি প্রকৃতির অফুরন্ত শক্তি, মানুষের সৃজনশীলতা এবং পরিবেশের সঙ্গে সহাবস্থানের এক জীবন্ত পাঠশালা।
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কলকাতা প্রতিনিধি : কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ঘটনার পর পুরো এলাকা এখনো থমথমে। চিকà...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তরের লক্ষ্যে জাপানের সার্বিক সহযোগিতা চেয়েছে সরকার।...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ‘খুব উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’ রয়েছে বলে অভিমত ব্যক্à...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : শিলচর, ( আসাম) : কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে প্রতিবেশী রাস্ট্র ভারতের অসম রাজ্যের  ...বিস্তারিত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : ভারতের মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ১১ কোটি রুপি মূল্যের ৬ দশà...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর জানিয়েছে, বা...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited