শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৩:৫৯ পিএম, ২০২৬-১০-৩১
মাসের শেষ দিকে সংসারের খরচ মেলাতে গিয়ে অনেক সরকারি কর্মচারীকেই হিমশিম খেতে হয়। বাড়িভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় মেটাতে বেতনের বড় অংশই শেষ হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতিতে এমন বাস্তবতা অনেক পরিবারের নিত্যদিনের সঙ্গী। তাই নতুন বেতনস্কেলের ঘোষণা তাঁদের মনে স্বস্তির প্রত্যাশা তৈরি করেছে। কিন্তু কর্মচারীদের এই স্বস্তি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে, তা নতুন আর্থিক চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। বেতন বাড়ানো যেমন সময়ের দাবি, তেমনি সেই ব্যয় বহনের সক্ষমতা অর্জনও সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।
সরকার নবম জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুমোদন করেছে। নতুন কাঠামোয় ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন ১০০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। অর্থাৎ নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধিতে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা ও বেতনবৈষম্য কমানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ।
নতুন বেতনস্কেল একবারে কার্যকর হচ্ছে না; মূল বেতন বাড়বে তিন ধাপে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মচারীরা বর্ধিত মূল বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ পাবেন। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত এই হার হবে যথাক্রমে ৭০ ও ৭৫ শতাংশ। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে পূর্ণ বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর হবে। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ অন্যান্য ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এতে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং পেনশনসহ অন্যান্য সুবিধাভোগী প্রায় সোয়া ৯ লাখ মানুষ উপকৃত হবেন। বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনযাত্রায় এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে প্রতিবছর অতিরিক্ত এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা সরকারের জন্য সহজ হবে না। এর প্রভাব ভবিষ্যতের বাজেটেও পড়বে।
সরকার জানিয়েছে, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে। তাই অর্থের সংস্থান নেই—এমন দাবি করা ঠিক হবে না। তবে বাজেটে বরাদ্দের পরিকল্পনা থাকা আর দীর্ঘ মেয়াদে সেই ব্যয় নির্বিঘ্নে বহন করা এক বিষয় নয়। রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং উন্নয়ন ও জনসেবামূলক খাতের বরাদ্দ অক্ষুণ্ন রাখাই হবে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণের বাস্তবতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কর-জিডিপি অনুপাত এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই। কর ফাঁকি, সীমিত করজাল, অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তৃতি এবং রাজস্ব প্রশাসনের দুর্বলতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। শিল্প উৎপাদন, আমদানি-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মন্থরতা থাকলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও কঠিন হয়। ফলে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি রাজস্ব আহরণে সক্ষমতা না বাড়লে বাজেটের ওপর চাপ তৈরি হবে। সেই চাপ সামলাতে ঋণনির্ভরতা বাড়লে ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়বে।
আরেকটি বিষয় বিবেচনায় রাখা জরুরি। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও দেশের সব কর্মজীবী মানুষের আয় একই হারে বাড়ছে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর ও স্বল্প আয়ের মানুষও মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছেন। তাঁদের আয় ও জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে আয়বৈষম্য আরও প্রকট হতে পারে। সরকারি চাকরিজীবীদের ন্যায্য বেতনের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায্য মজুরি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষাও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কর্মচারীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ গেলে বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়তে পারে। কিন্তু সেই অনুপাতে উৎপাদন ও সরবরাহ না বাড়লে পণ্যমূল্যের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে বেতন বৃদ্ধিই মূল্যস্ফীতির একমাত্র কারণ নয়। আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ, বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহব্যবস্থা এবং মুদ্রানীতিসহ নানা বিষয় পণ্যমূল্যকে প্রভাবিত করে। তাই নতুন বেতনস্কেলের প্রভাব মূল্যায়নে এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
নতুন বেতনকাঠামোয় পেনশনব্যবস্থার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অবসরপ্রাপ্তদের নিট পেনশন নির্দিষ্ট স্ল্যাব অনুযায়ী ৫৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর অবসরপ্রাপ্ত মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে পেনশন ও অবসরকালীন সুবিধার ব্যয়ও সরকারের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়। তাই বর্তমান বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি ভবিষ্যতের পেনশন ব্যয় সামাল দেওয়ার পরিকল্পনাও জরুরি।
সরকারের সামনে তাই দুটি দায়িত্ব—সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা। বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি সেবার মানও বাড়াতে হবে। নাগরিকেরা যেন দ্রুত, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত সেবা পান, সরকারি দপ্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত হয় এবং কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবহার হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। বেতন বাড়বে, অথচ সেবার মান ও কর্মদক্ষতা বাড়বে না—এমন পরিস্থিতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এ জন্য করব্যবস্থার সংস্কার, কর ফাঁকি রোধ, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের বরাদ্দ যেন বেতন-ভাতার বাড়তি চাপে কমে না যায়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। নতুন বেতনস্কেলের ব্যয় ও রাজস্ব আয়ের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করলে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি অযৌক্তিক নয়; বরং বর্তমান বাস্তবতায় প্রয়োজনীয়। কিন্তু শুধু বেতন বাড়ালেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয় না। বর্ধিত ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে, রাজস্ব আয় কীভাবে বাড়বে, ঋণের চাপ কীভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক বোঝা পড়বে কি না—এসব প্রশ্নেরও জবাব দিতে হবে।
একজন সরকারি কর্মচারী চান সম্মানজনক বেতনে নিশ্চিন্তে সংসার চালাতে, একজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষ চান জীবনের শেষ অধ্যায়ে আর্থিক নিরাপত্তা। আর সাধারণ নাগরিকের প্রত্যাশা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও করের বিনিময়ে তিনি যেন পান মানসম্মত সেবা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপদ জীবন। এই প্রত্যাশাগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সরকারের প্রকৃত দায়িত্ব। বেতন বৃদ্ধি তখনই সার্থক হবে, যখন তা কর্মচারীদের জীবনমান উন্নত করার পাশাপাশি সরকারি সেবার মান বাড়াবে এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা অক্ষুণ্ন রাখবে। রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু বেতন কত বাড়ল, তাতে নয়; সেই সিদ্ধান্তের সুফল কতটা মানুষের জীবনে পৌঁছাল, তার মধ্যেই নিহিত।
লেখক: সাহিত্য ও মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তায় প্রতিদিনের যানজট, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, বর্জ্যের স্তূপ আà...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : সকালে সংবাদ সংগ্রহে বের হন একজন সাংবাদিক। মানুষের কথা, সমাজের সংকট আর অনিয়ম-অসংগতি তুলে ধরাই তাঁর à¦...বিস্তারিত
মো. আরফান উদ্দীন : পৃথিবীর আর কোন দেশে বাংলাদেশের মতো প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় এত মানুষের প্রাণহানি ঘটে কি না, তা আমার...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : একটি গিটার কখনো কখনো শুধু বাদ্যযন্ত্র থাকে না—হয়ে ওঠে একটি সময়ের কণ্ঠস্বর। বাংলাদেশের ব্যান্ডস...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : রাতের নীরবতায় একটি মুঠোফোনের পর্দায় ভেসে উঠেছিল বাবার কাছে পাঠানো মেয়ের শেষ আকুতি। নিজের অবস্থান...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : এম.কামাল উদ্দিন মাষ্টার ঐতিহ্যবাহী কাট্টলী যুগে যুগে জন্ম দিয়েছে শিক্ষা সামাজিক সাংস্কৃতিক ও à¦...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited