শিরোনাম
আমাদের বাংলা ডেস্ক : | ০৩:৩৩ পিএম, ২০২৫-১১-২২
মুজাহিদ অনীক
এই তো সেদিন মেট্রো রেলের বিয়ারিং প্যাডের নিচে চাপায় পড়ে একজন পথচারীর মৃত্যু হলো। এ ঘটনা বলে দেয়, রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী একজন নাগরিকের স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা কতখানি। এ ঘটনা থেকে প্রশ্ন ওঠে এভাবেও কারো মৃত্যু হতে পারে? হ্যাঁ পারে, বাংলাদেশের রাজধানী শহরে মৃত্যু এতটাই সহজ। নির্মাণাধীন ভবনের ওপর থেকে ইট পড়া, নির্মাণাধীন ভবন থেকে ছিটকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু, কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিকের মৃত্যু, বেপরোয়া গাড়ির ধাক্কায় মৃত্যু—এসব প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া একেকটি অপমৃত্যুর গল্প।
এ শহরে মানুষের জীবনকে দুই হাতে স্বাগত জানায় নরকের দুয়ার। ঢাকাকে কেন্দ্র করে এসব অপমৃত্যুর বারোয়ারি আয়োজনের ষোলো কলা পূর্ণ করতে পারে একটা ভূমিকম্প। গতকাল শুক্রবার সকালে যে ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল ঢাকা শহর, ভূমিকম্পের তীব্রতার মাপকাঠিতে একটু এদিক-সেদিক হলে এ কম্পনের অভিঘাত কতটা মারাত্মক হতে পারত, সেই নারকীয় পরিস্থিতি কল্পনা করা যায় সহজেই। স্মরণকালের মধ্যে ঢাকায় এত তীব্র ঝাঁকুনির ভূকম্পন দেখা যায়নি।
দোলকের মতো দুলতে থাকা রাজধানী শহরের ভবনগুলোর প্রতিচ্ছবি কল্পনা করতে করতে মনে হলো, ঢাকায় নগরবাসীর জীবন, ঢাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শত শত বছরের সভ্যতা, এত এত উঁচু দালানকোঠা; বস্তুত সবই যেন আসলে সুতার ওপরে ঝুলছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানী ঢাকাকে কাঁপিয়ে দেওয়া আকস্মিক ভূমিকম্পের পর সুতায় ঝুলে থাকার অনুভূতিটাই একমাত্র সত্য মনে হচ্ছে। আরো সত্য মনে হচ্ছে, ঢাকায় স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নেই। অপঘাতে মৃত্যুর বিপদঘণ্টা নিয়ে এখানে যতদূত বসে থাকে।
২০১৫ সালে ‘দ্য ওয়েভ’ শিরোনামে নরওয়েজিয়ান ভাষায় একটি সিরিজ নির্মিত হয়েছিল। সেখানে নির্মাতা একটি ভূতত্ত্ববিদের পরিবারকে কেন্দ্র করে নরওয়ের একটি দুর্যোগকবলিত শহরের দুর্দশার গল্প তুলে ধরেন। তবে সেই সিরিজের পরের পর্বটি আরো জমজমাট, রোমহর্ষক ও চিন্তাজাগানিয়া। বিশেষত সবুজ অরণ্য, প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে অপরিকল্পিত নগরসভ্যতার জন্য আমাদের জিহ্বা যে রকম লকলক করে, সিরিজের ওই পর্বটি তাদের জন্য। ২০১৮ সালে ‘দ্য কোয়াক’ শিরোনামের সেই পর্বে নির্মাতা জন আন্দ্রিয়াস অ্যান্ডারসন দেখিয়েছেন, দুর্যোগের পূর্বমুহূর্তে দীর্ঘকাল ধরে মানুষ দুর্যোগের ভয়াবহতাকে অগ্রাহ্য করে অন্তিম পরিণতি ভোগ করে।
একই সঙ্গে সিরিজটিতে পরিবার ও মানবিক সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে, সংকটের সময়ে ভালোবাসা, সাহস ও আত্মত্যাগই মানুষকে টিকিয়ে রাখে। সিরিজটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্য, বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করলে বিপদ আরো ভয়াবহ হয়। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও উন্নয়নের আড়ালে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়িত্বশীলতা ছাড়া নিরাপত্তা সম্ভব নয়।
দেশে-বিদেশে যেকোনো ভূমিকম্পের পর রাজধানী ঢাকা শহরের সম্ভাব্য পরিণাম অনুধাবন করে দ্য কোয়াকের নায়ক ক্রিস্টিয়ানের কথা মনে পড়ে যায়। তিনি তাঁর বিজ্ঞানী বন্ধুর কাছ থেকে বেশ কিছু তথ্য পান সম্ভাব্য দুর্যোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে। ক্রিস্টিয়ানের ভূতত্ত্ববিদ বন্ধুর আকস্মিক মৃত্যুর পর তিনি বাসিন্দাদের সতর্ক করেন। তিনি লক্ষ করেন, ভূগর্ভে চাপ দ্রুত বাড়ছে এবং শহরের সেন্সরগুলো অস্বাভাবিক রকমের সংকেত দিচ্ছে। কিন্তু ক্রিস্টিয়ানের এ সতর্কবার্তা নিজ পরিবার, শহরের হর্তাকর্তা এবং বাসিন্দা কেউই ঠিকঠাকভাবে গ্রহণ করেনি। দেখা যায়, তার সতর্কসংকেত একদিন সত্যিই হয়।
রাজধানী ঢাকা দ্য কোয়াকের সেই শহরের মতো একদিন নরকে পরিণত হতে পারে। বিশাল বিশাল অট্টালিকাগুলো দুমড়ে-মুচড়ে যাবে, ইট-সুরকির স্তূপ জমে থাকবে রাস্তায় রাস্তায়; আর কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে থাকবে হাজার হাজার বা লাখ লাখ জীবন। এসব অনুমান করা কঠিন কিছু নয়। মাথার ওপর দিয়ে যাওয়া ফ্লাইওভার, মেট্রো রেল, নালা-নর্দমা ভরাট করে দালান তৈরি এবং একটার পর গা ঘেঁষে তৈরি হওয়া অট্টালিকা—সব কিছু মিলিয়ে ঢাকাকে কেন্দ্র করে আমাদের যত উন্নয়ন আয়োজন, তা কি আমাদের একবারও ভাবায়। আরেকটু শক্তিশালী ভূমিকম্প আমাদের সাধের নগরসভ্যতাকে কোথায় নিয়ে যাবে? স্পষ্ট উত্তর, ‘না’। আমাদের রাষ্ট্র, নীতিনির্ধারক, আমলা থেকে রাজনীতিকের কেউই তা ভাবেন না। ভিনদেশে আশ্রয় তৈরি করা আমাদের শাসকদের এ নিয়ে ভাবার সময়ও নেই। এবং আমরা যারা নগরবাসী, তারাও প্রতিদিন রঙিন বাক্সের জারিজুরিমার্কা টক শো এবং ক্ষুদ্র পরিচয়বাদিতার গরম স্লোগানে মোহমুগ্ধ। আমাদের সামনে সাক্ষাৎ যম অপেক্ষা করছে, অথচ আমরা নিদারুণভাবে ভাবলেশহীন।
২০২৩ সালে তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের আঘাতে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। ৭.৭ ও ৭.৮ মাত্রার উপর্যুপরি কম্পনে দুই লাখেরও বেশি ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভূমিকম্পকবলিত অঞ্চলগুলো এখনো সেই প্রভাব থেকে বের হতে পারেনি। ঢাকায় শুক্রবারের ভূমিকম্পটি ছিল ৫.৭ মাত্রার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৬ মাত্রার ভূকম্পনেই ঢাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। বিশেষত ঢাকায় খালবিল, নদী, জলাশয় ভরাট করে যেভাবে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, তাতে গোটা নগরের ধ্বংসাত্মক চিত্রটা চোখের সামনে স্পষ্ট হয়।
ভূমিকম্পের পর মানুষের আতঙ্ক রয়েছে। বলাবাহুল্য, সামাজিক মাধ্যমে ভূকম্পন নিয়ে মানুষের উদ্বেগও চোখে পড়ার মতো। সরকারি তরফে ভূমিকম্পকে কেন্দ্র করে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার লেশমাত্র নেই। ঢাকাকে ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বাঁচানোর প্রধান উপায় হলো রাজধানীকে যথাসম্ভব চাপমুক্ত করা। অথচ ঢাকায় সব সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, সেনাব্যারাক, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসাসুবিধা ও কলকারখানাসহ যাবতীয় অবকাঠামোকে অন্যত্র নেওয়ার উদ্যোগ নেই।
শুক্রবার ঢাকায় ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আগামী তিন-চার দিন নানা বক্তৃতা-বিবৃতি চলবে। টিভি-টক শোগুলোতে খই ফুটবে। বিশেষজ্ঞদের মতামতে ছেয়ে যাবে পত্র-পত্রিকা। তিন-চার দিনের মাথায় সব আলোচনা উবে যাবে। কারণ ভূমিকম্পের ঝুঁকি প্রশমনের জন্য যে যে জায়গাগুলো হাত দেওয়া অনিবার্য, সেগুলোর অনেক কিছুই শাসকের ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশের ক্ষমতা কাঠামোর সর্বদা মধু খাওয়া সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, মুনাফাসর্বস্ব শিল্পায়নের দাপাদাপি এবং সুবিধাভোগী রাজনীতিক শ্রেণির ত্রয়ী রাজধানীকে বারুদের বিস্ফোরণের ওপর দাঁড় করিয়ে রেখেছে। এখানে বসবাসকারী দেড় কোটি মানুষের জীবন এই বিস্ফোরণের অপেক্ষায়। ভূমিকম্পের মধ্য দিয়ে আমরা একটি ধ্বংস প্রকল্পের দোরগোড়ায়। আমরা বরং প্রহর গুনি, কত বিচিত্র উপায়ে আমাদের মৃত্যু হবে।
লেখক : অনুবাদক ও লেখক
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র ব...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে একটি নীরব যন্ত্...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মেজর (অব.) মনজুর কাদের সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘চীনকে ঘুমাতে দাও; যখন সে জেগে উঠবে, সে বিশ্বকে কা...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কাজী আব্দুল্লাহ আল বোরহান রিজভী বাংলাদেশ গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং সামাজ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্ত...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার : শহরের ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়ানো ক্ষুদ্র দোকানি, গ্রামের হতাশ তরুণ কিংবা চাকরির আশায়...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited