বাংলাদেশ   শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬  

শিরোনাম

বাংলাদেশের সবার ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট শেখা উচিত

আমাদের বাংলা ডেস্ক :    |    ০৩:৩২ পিএম, ২০২৫-১১-২৬

বাংলাদেশের সবার ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট শেখা উচিত

সাইফুল হোসেন    
বর্তমান বিশ্বে অর্থই সমাজ ও রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি। আমাদের প্রতিদিনের জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত—হোক তা শিক্ষা, পেশা, ব্যবসা, কিংবা পরিবার পরিচালনা—সব কিছুর সঙ্গেই অর্থের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমাদের সমাজে এখনো “ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট” বা অর্থ ব্যবস্থাপনা শেখাকে অপ্রয়োজনীয় বা শুধু হিসাবরক্ষকদের কাজ বলে মনে করা হয়। অথচ বাস্তবে, এটি এমন একটি দক্ষতা যা প্রত্যেক মানুষের জানা উচিত। বাংলাদেশ যেমন : একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতি, তেমনি এখানকার মানুষের আর্থিক সচেতনতা এখনো খুব সীমিত। এই সীমাবদ্ধতা দূর করা এখন সময়ের দাবি।
একজন মানুষ যতই পরিশ্রমী বা শিক্ষিত হোন না কেন, যদি তিনি অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনা না জানেন, তবে তার আয়ের যথাযথ ব্যবহার সম্ভব নয়। অনেকেই উচ্চ আয় সত্ত্বেও মাসের শেষের দিকে আর্থিক চাপে পড়ে যান, কারণ তারা জানেন না কীভাবে বাজেট তৈরি করতে হয়, কীভাবে সঞ্চয় রাখতে হয়, বা কীভাবে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থ বাড়ানো যায়। অর্থ ব্যবস্থাপনা শেখা মানে শুধু খরচ কমানো নয়, এটি একটি সচেতন জীবনধারা তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি টাকার পেছনে পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য থাকে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এখন গ্লোবাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্ট-আপ, ই-কমার্স কিংবা রিমোট চাকরির সুযোগে তাদের আয়ের উৎস আগের তুলনায় বৈচিত্র্যময়। কিন্তু এই আয়ের সঙ্গে যদি সঠিক ফাইন্যানশিয়াল প্ল্যানিং না থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এই উপার্জনের স্থায়িত্ব থাকে না। অনেক তরুণ উচ্চ আয়ের শুরুতেই অতিরিক্ত ব্যয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, যা পরে ঋণ বা আর্থিক অস্থিরতার কারণ হয়। অথচ যদি স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেই অর্থ ব্যবস্থাপনা শেখানো হতো, তাহলে তারা ছোটোবেলা থেকেই দায়িত্বশীল আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারত।
বাংলাদেশে অনেক পরিবারে অর্থের বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা এখনো অস্বস্তিকর বলে মনে করা হয়। পিতামাতারা সন্তানের সামনে আয় বা খরচের কথা বলেন না, ফলে সন্তানরা বড় হয়ে বাস্তব আর্থিক পরিকল্পনার ধারণা পায় না। সমাজে “অর্থ” বিষয়টিকে এখনো কিছুটা নিষিদ্ধ আলোচনার মতো দেখা হয়। অথচ ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট শেখানো মানে সন্তানকে শুধু টাকার হিসাব শেখানো নয়, বরং দায়িত্বশীলতা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার শিক্ষা দেওয়া। এই পরিবর্তন আমাদের পারিবারিক সংস্কৃতিতেও জরুরি।একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট শেখা রাষ্ট্রের জন্যও উপকারী। আর্থিকভাবে শিক্ষিত মানুষ কম ঋণ নেয়, বেশি সঞ্চয় করে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। যদি দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী অর্থ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হয়, তবে ব্যাংকিং সেক্টরে অনিয়ম কমবে, ব্যক্তিগত ঋণ নির্ভরতা হ্রাস পাবে এবং জাতীয় সঞ্চয়ের হার বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে প্রতি বছর বিপুল অর্থ প্রবাসী আয় হিসেবে আসে, সেখানে সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহারের জন্য ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট শিক্ষা অপরিহার্য।
অর্থ ব্যবস্থাপনা শেখার অর্থ কেবল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা বা বাজেট লেখা নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক ধারণা—যার মধ্যে সঞ্চয়, বিনিয়োগ, ঋণ ব্যবস্থাপনা, কর সচেতনতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, এমনকি অবসর পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষ এখনো জানে না কীভাবে ছোট ছোট বিনিয়োগ দিয়ে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা গড়া যায়। অনেকেই বিমা বা শেয়ারবাজারকে “ঝুঁকিপূর্ণ” ভেবে এড়িয়ে যান, অথচ সঠিক জ্ঞান থাকলে এগুলো হতে পারে আর্থিক স্বাধীনতার বড় উপায়।
ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট শেখা শুধু অর্থ উপার্জনের কৌশল নয়, এটি একটি জীবনের দর্শন। এটি শেখায় কীভাবে সীমিত সম্পদ দিয়ে সর্বোচ্চ ফলাফল পাওয়া যায়, কীভাবে পরিকল্পিতভাবে স্বপ্ন পূরণ করা যায়, এবং কীভাবে অপ্রত্যাশিত ঝুঁকির সময় স্থির থাকা যায়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তখনই আরও উজ্জ্বল হবে, যখন প্রত্যেক নাগরিক নিজের আর্থিক সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারবে—বুদ্ধি, পরিকল্পনা ও আত্মবিশ্বাস দিয়ে। তাই আজকের দিনে, বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের উচিত ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট শেখা এবং তা জীবনের অংশ করে নেওয়া। কারণ, অর্থের সঠিক ব্যবহারই পারে আমাদের জীবন ও দেশ দুটোই সমৃদ্ধ করে তুলতে।
বর্তমানে ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্স সার্ভিস (যেমন : bKash, Nagad), এবং অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম আমাদের অর্থ ব্যবস্থাপনাকে অনেক সহজ করে তুলেছে। কিন্তু এর সঙ্গে এসেছে নতুন ধরনের ঝুঁকি—যেমন : অনলাইন প্রতারণা, ইন্টারেস্ট ট্র্যাপ, বা ডিজিটাল ঋণের ফাঁদ। একজন আর্থিকভাবে সচেতন মানুষ এসব ঝুঁকি চিহ্নিত করতে পারে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে। সুতরাং, বাংলাদেশের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে নাগরিকদের ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট শেখা আর বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয়তা।
অর্থ ব্যবস্থাপনা শেখা মানে শুধু নিজের জীবনের উন্নতি নয়, বরং সমাজের উন্নতিতেও অবদান রাখা। যখন একজন ব্যক্তি সঠিকভাবে নিজের আর্থিক পরিকল্পনা করেন, তখন তিনি পরিবারকে সাহায্য করতে পারেন, ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে পারেন, এবং সমাজে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন। একজন দায়িত্বশীল আর্থিক ব্যক্তি কখনো অপ্রয়োজনীয় ভোগবাদে জড়ান না, বরং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার দিকে নজর রাখেন। এভাবেই ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট কেবল ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক উন্নয়নেরও হাতিয়ার।
বাংলাদেশে যদি শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে আগামী প্রজন্ম আর্থিকভাবে অনেক বেশি প্রস্তুত হবে। স্কুলে যেমন : আমরা বাংলা, ইংরেজি বা গণিত শিখি, তেমনি “অর্থ ব্যবস্থাপনা”ও হওয়া উচিত একটি মৌলিক জীবন দক্ষতা। এটি শেখানো হলে তরুণেরা বুঝবে কীভাবে টাকার মূল্যায়ন করতে হয়, কীভাবে ঋণ নিতে হয়, কীভাবে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করতে হয়। এই শিক্ষা দারিদ্র্য হ্রাস ও উদ্যোক্তা বিকাশেও সহায়ক হবে।
অবশেষে বলা যায়, ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট শেখা শুধু অর্থ উপার্জনের কৌশল নয়, এটি একটি জীবনের দর্শন। এটি শেখায় কীভাবে সীমিত সম্পদ দিয়ে সর্বোচ্চ ফলাফল পাওয়া যায়, কীভাবে পরিকল্পিতভাবে স্বপ্ন পূরণ করা যায়, এবং কীভাবে অপ্রত্যাশিত ঝুঁকির সময় স্থির থাকা যায়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তখনই আরও উজ্জ্বল হবে, যখন প্রত্যেক নাগরিক নিজের আর্থিক সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারবে—বুদ্ধি, পরিকল্পনা ও আত্মবিশ্বাস দিয়ে। তাই আজকের দিনে, বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের উচিত ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট শেখা এবং তা জীবনের অংশ করে নেওয়া। কারণ, অর্থের সঠিক ব্যবহারই পারে আমাদের জীবন ও দেশ দুটোই সমৃদ্ধ করে তুলতে।
লেখক : “দ্য আর্ট অব পার্সোনাল ফাইনান্স ম্যানেজমেন্ট, আমি কি এক কাপ কফিও খাবো না, দ্য সাকসেস ব্লুপ্রিন্ট ইত্যাদি বইয়ের লেখক, করপোরেট ট্রেইনার, ইউটিউবার এবং ফাইনান্স ও বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট।

রিটেলেড নিউজ

ম্যান্ডেলার শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক অনিবার্য পাঠ

ম্যান্ডেলার শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক অনিবার্য পাঠ

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র ব...বিস্তারিত


সশস্ত্র বাহিনীতে দুই দশকের নীরব অবিচার

সশস্ত্র বাহিনীতে দুই দশকের নীরব অবিচার

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে একটি নীরব যন্ত্...বিস্তারিত


বাংলাদেশের জন্য সুবর্ণ সুযোগ

বাংলাদেশের জন্য সুবর্ণ সুযোগ

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মেজর (অব.) মনজুর কাদের সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘চীনকে ঘুমাতে দাও; যখন সে জেগে উঠবে, সে বিশ্বকে কা...বিস্তারিত


বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন কৌশল

বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন কৌশল

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কাজী আব্দুল্লাহ আল বোরহান রিজভী বাংলাদেশ গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং সামাজ...বিস্তারিত


মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ! বিবেকের মৃত্যু হলে সভ্যতা শুধু নামেই টিকে থাকে

মানুষের ভিড়ে সব অমানুষ! বিবেকের মৃত্যু হলে সভ্যতা শুধু নামেই টিকে থাকে

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্ত...বিস্তারিত


চাঁদাবাজি ও বেকারত্বের ছায়ায় রাষ্ট্রের নীতিগত চ্যালেঞ্জ

চাঁদাবাজি ও বেকারত্বের ছায়ায় রাষ্ট্রের নীতিগত চ্যালেঞ্জ

আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার : শহরের ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়ানো ক্ষুদ্র দোকানি, গ্রামের হতাশ তরুণ কিংবা চাকরির আশায়...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

নোয়াখালী প্রতিনিধি : : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্তার অ...বিস্তারিত


সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : সৌদি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, স্পীড লিমিট এর চাইতে অধিক গতিতে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের উপ...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর