শিরোনাম
আমাদের বাংলা ডেস্ক : | ০৩:২০ পিএম, ২০২৫-১১-২৬
ব্রি. জে. (অব.) আলী আহমেদ খান
আমরা সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প অনুভব করেছি। আমাদের ফল্ট লাইন যেগুলো আছে, এই লাইনগুলো অ্যাকটিভ মনে হচ্ছে এবং এখন বার্মার উপর হচ্ছে, ভারতের উপর হচ্ছে। এসব ছোট ছোট শেকিং বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কাই প্রকাশ করছে। ভূমিকম্প যেহেতু প্রাকৃতিক বিপর্যয়, তাই এটা কোনো আগাম সংকেত দেয় না। বাংলাদেশের অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিজ্ঞতা থাকলেও ভূমিকম্পের ব্যাপারে এখনো সেরকম কোনো অভিজ্ঞতা নেই। এক্ষেত্রে শুধু পূর্বপ্রস্তুতিই আমাদের ভূমিকম্প ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারে। ভূমিকম্পের কারণে দুর্যোগ বেড়ে যাওয়ার যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, এর কারণ হচ্ছে আমাদের অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন, এগুলো কোড অনুসরণ করেনি। মানুষ সেফটি কোডগুলো অনুসরণ করছে কিনা, সেটা দেখভাল করার জন্যও আমাদের রেগুলেটরি বোর্ড শক্তিশালী নয়। তাদের গাফিলতি আছে এবং তারা ওয়েল ম্যানেজেবল নয় আসলে। সেখানে দুর্নীতিও হয়ে থাকে। এ কারণে পুরো ইকো-সিস্টেমটাই একটা ঝুঁকির মধ্যে আছে। কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় ঢাকা ও এর আশপাশে একসময় সমীক্ষা হয়েছিল প্রায় ১০ বছর আগে। সে সময়ে দেখা গেছে, কোনো বিপর্যয় হলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই বিপর্যয় যদি রাতে হয়, তাহলে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ লোক মারা যাবে শুধু ভুল ডিজাইনের কারণে।
রাজধানীর অনেক ভবন নির্মাণ হয়েছে রাজউকের অধীনে, সেগুলোর স্ট্রাকচারাল ডিজাইন সংরক্ষণ করা হয় না, শুধু আর্কিটেকচারাল ডিজাইনের মাধ্যমে বিল্ডিংগুলোকে অ্যাপ্রুভ করা হয়েছে। সুতরাং এসব ভবনের অনেকাংশই দুর্বলভাবে গড়ে উঠেছে। এবং এসব দুর্বল স্থাপনাই আমাদের জন্য বড় রকমের বিপদ ডেকে এনেছে। আমাদের এখন উচিত কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায় সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া, যাতে এসব দুর্বল স্থাপনাকে আমরা ঠিক করতে পারি। আর এই মুহূর্তে যেটা প্রয়োজন, সেটা হলো এই দুর্বল ভবনগুলোকে চিহ্নিত করা। কোন কোন স্থাপনা দুর্বল, তা চিহ্নিত করে যেগুলো ঠিক করা সম্ভব, করতে হবে। আর যেসব দুর্বল ভবন ঠিক করা সম্ভব নয়, সেসব স্থাপনা ভেঙে ফেলতে হবে। এর আগে রাজউকের অধীনে আরবান রেসিলিয়েন্ট প্রজেক্ট নামে একটা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। সেটির কাজও অর্ধেক হয়ে থেমে গেছে। কারণ এই প্রজেক্টটাও সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করার কথা ছিল রাজউকের; কিন্তু সেটা তারা করতে পারেনি। প্রকল্পে কিছু সরঞ্জাম কেনা হয়েছিল, একটা টেকনিক্যাল টিমও তৈরি করা হয়েছিল তখন, পরে সেটা রাজউক তৈরি করেনি। সেসব সরঞ্জাম দিয়ে স্থাপনাগুলো ভূমিকম্প সহনশীল কিনা, তা নিরূপণ করা যেত। প্রায় শত কোটি টাকার সরঞ্জাম, যেগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় এখনো পড়ে রয়েছে, সেগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। স্থাপনার গুণগতমান নিশ্চিতের জন্য রাষ্ট্রে গৃহায়ণ মন্ত্রণালয় আছে, যার অধীনে রাজউক। আমি মনে করি, এখানে গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়ের একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। এজন্য রাজউকের আরবান রেসিলিয়েন্ট প্রজেক্টকে কন্টিনিউ করে এখানকার টেকনিক্যাল টিমকে ডেভেলপ করে যেসব ইক্যুইপমেন্ট আছে সেগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। কারিগরি সমর্থন দিয়ে বিভিন্ন ভবনকে যাচাই করতে হবে সেগুলো কতটুকু ভূমিকম্প সহনীয়।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, ভূমিকম্প হলে নগরে তেমন খোলা জায়গা নেই, যেখানে মানুষ আশ্রয় নেবে। সেক্ষেত্রে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, কমিউনিটি সেন্টারগুলোকে ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে আশ্রয়ের জন্য উপযুক্ত করতে হবে। যেহেতু আমাদের জন্য ভূমিকম্প এখন বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে, সেহেতু বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিশেষ পদক্ষেপ নিয়ে ঝুঁকির মাত্রা কমাতে দ্রুত সরকারের বিভাগগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। সব সংস্থাকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে। শুধু রাজউক কাজ করলে হবে না, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, ডেসকো, তিতাস গ্যাস-সবাইকে মানুষের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
এছাড়া ভূমিকম্প হলে কীভাবে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে হবে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। নিতে হবে আগাম উদ্যোগ। পূর্বপ্রস্তুতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জনসচেতনতা সৃষ্টির কর্মসূচি হাতে নিতে হবে, যাতে দুর্যোগের সময় মানুষ আতঙ্কিত না হয়। কারণ এই আতঙ্ক থেকে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। দুর্যোগের সময় মানুষ কোথায় আশ্রয় নেবে, দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে আমাদের কী করতে হবে, সে ব্যাপারে প্রচার ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। সেজন্য কমিউনিটিভিত্তিক অ্যাওয়ারনেস ও প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম থাকতে হবে। সেখানে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সঙ্গে সিটি করপোরেশন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারে। পরবর্তী সময়ে যত ভবন নির্মাণ হবে, প্রতিটির বিষয়ে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে রিস্ক ম্যাপিং বা হ্যাজার্ড ম্যাপিং করা-কোন কোন এলাকার মাটির গুণগত মান কেমন, ভবনের অবস্থান, গ্যাস-পানি, টেলিফোনের মতো ইউটিলিটি লাইন কোথায় রয়েছে, কোথা দিয়ে গেছে, তা নিরূপণ করতে হবে। দুর্বলতাগুলো খতিয়ে দেখে উত্তরণে কাজ করতে হবে। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের সময় বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সরবরাহ যেন দ্রুত শাটডাউন বা বন্ধ করা যায়, সেদিকটাও দেখতে হবে এবং ব্যবস্থা নিতে হবে।
ইমারজেন্সি রেসপন্স প্ল্যানের বিষয়টিতেও গুরুত্ব দিতে হবে। দুর্যোগের পর দ্রুত রেসপন্স বা উদ্ধার অভিযানের জন্য সাধারণ স্বেচ্ছাসেবক, এরপর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, পুলিশ, আর্মড ফোর্সেস, হেলথ ডিপার্টমেন্টকে প্রস্তুত করতে হবে। হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে দুর্যোগের মধ্যেও দ্রুত আহতদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া যায়। সেজন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি আগেই নিতে হবে। এগুলো হচ্ছে আপৎকালীন পরিকল্পনা। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও হাতে নিতে হবে। দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করা, সবাইকে প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ অ্যাপস তৈরি করা, নিয়মিত মহড়ার আয়োজন করার মতো উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের যেহেতু রিসোর্স কম, তাই ইমারজেন্সি রেসপন্স প্ল্যান নিয়ে কাজ করতে হবে, যাতে সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করা যায়। বড় দুর্যোগে সব মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাবে স্বাভাবিকভাবেই, তাই কীভাবে একটা রোবাস্ট কমিউনিকেশন স্টাবলিশ করা যায়, যেখানে বিভিন্ন সংস্থা কমিউনিকেশনের মাধ্যমে উদ্ধার পরিচালনা করবে, সেটা নিয়ে কাজ করতে হবে। এই কাজগুলো সরকার করবে।
বিপর্যয়ের পর যেন কোনো অবস্থাতেই সময় নষ্ট না হয়, সেজন্য আমাদের মহড়া করার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। যেহেতু বিপর্যয়ের সময় রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যাবে, স্বাভাবিকভাবেই চলাচল করা কঠিন হবে। সুতরাং, ব্রিজ-কালভার্টের মতো স্থাপনা ঠিক আছে কিনা, সেগুলো দেখতে হবে। দুর্যোগের পর বিদেশের উদ্ধারকারী দল আসতে পারে, সেজন্য বিমানবন্দরগুলোকে চালু রাখতে হবে। এ দেশ নদীমাতৃক দেশ, সেখান দিয়েও অন্য জায়গার সাপোর্ট আসতে যেন সমস্যা না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
সব মিলিয়ে ইমারজেন্সি রেসপন্সটা কী, ডিজাস্টার হলে আমরা কীভাবে একজন আরেকজনের সাহায্য করব, সেদিকটি বিবেচনায় রাখতে হবে। আমাদের ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল প্রস্তুত রাখতে হবে, যেখানে ব্লাড ব্যাংক থাকবে এবং অন্তত অপারেশন করার মতো অভিজ্ঞ ডাক্তারদের তৈরি থাকতে হবে। আমি মনে করি, আমাদের এই প্রস্তুতিগুলো যদি না থাকে, তাহলে আমরা বড় বিপর্যয় মোকাবিলা করতে পারব না।
ব্রি. জে. (অব.) আলী আহমেদ খান : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি দেশকে বদলে দিতে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ও আদর্শ দিয়ে সমগ্র ব...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে একটি নীরব যন্ত্...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : মেজর (অব.) মনজুর কাদের সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘চীনকে ঘুমাতে দাও; যখন সে জেগে উঠবে, সে বিশ্বকে কা...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : কাজী আব্দুল্লাহ আল বোরহান রিজভী বাংলাদেশ গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং সামাজ...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্ত...বিস্তারিত
আমাদের বাংলা ডেস্ক : : আবদুল্লাহ মজুমদার : শহরের ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়ানো ক্ষুদ্র দোকানি, গ্রামের হতাশ তরুণ কিংবা চাকরির আশায়...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited