শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৪:৩৮ পিএম, ২০২৬-০৬-১৬
নদীর বুক চিরে একসময় পালতোলা নৌকা, পণ্যবাহী বড় বড় জাহাজ আর মানুষের জীবিকার গল্প এগিয়ে যেত বাংলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। নদী ছিল এই ভূখণ্ডের প্রাণ, অর্থনীতির স্পন্দন এবং যোগাযোগের প্রধান ভরসা। কালের প্রবাহে সেই নদীগুলোর অনেকেই হারিয়েছে নাব্যতা, হারিয়েছে অর্থনৈতিক গুরুত্বের একটি বড় অংশ। তবু বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা এখনো বলে—নদীই এ দেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক শক্তি। সেই শক্তিকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার প্রত্যয় নিয়েই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নৌ-পরিবহন খাতের উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে।
সরকার ব্যয়-সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও দক্ষ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ নৌপথের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর আধুনিকায়ন এবং নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রম জোরদারের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের পরিবহন ব্যয় কমবে, পণ্য পরিবহনের গতি বাড়বে এবং সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত চাপও হ্রাস পাবে। উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ পরিবহন ব্যয় কমলে উৎপাদন খরচও কমে আসে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথ একসময় দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল। কিন্তু নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক নৌরুট কার্যকারিতা হারিয়েছে। ফলে পরিবহন ব্যবস্থায় ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে এবং সড়কপথের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এ অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিয়মিত ড্রেজিং ও খনন কার্যক্রম পরিচালনার সরকারি পরিকল্পনা সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে, শুধু প্রকল্প গ্রহণ নয়; এর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণই হবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।
বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনেকাংশে তার বন্দর ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। এ কারণে কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনাকে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি জাতীয় অর্থনীতির প্রতিযোগিতামূলক শক্তি বৃদ্ধিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পণ্য খালাসে বিলম্ব, জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় এবং লজিস্টিক ব্যয় কমাতে আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই।
বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প। এটি শুধু একটি বন্দর নির্মাণ প্রকল্প নয়; বরং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোয় একটি কৌশলগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা বহন করছে। গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে বৃহৎ জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশে নোঙর করতে পারবে, যা আমদানি-রপ্তানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ট্রান্সশিপমেন্ট-নির্ভরতা হ্রাস করবে। ফলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে আরও শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
একই সঙ্গে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে বে-টার্মিনাল, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ও লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের সমুদ্রবন্দরভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার হবে এবং শিল্প ও রপ্তানি খাত আরও শক্তিশালী ভিত্তি লাভ করবে।
তবে উন্নয়নের এ মহাপরিকল্পনার সামনে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিভিন্ন মহলে অভিযোগ রয়েছে, অতীতের সুবিধাভোগী ফ্যাসিবাদী দোসর ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর একটি অংশ এখনো বিভিন্ন খাতে সিন্ডিকেটভিত্তিক ব্যবসা ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। এ ধরনের গোষ্ঠী স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা ও সুশাসনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে বন্দর, সরবরাহব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সেবা খাতে অস্বচ্ছতা বজায় থাকলে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে বিলম্ব হতে পারে।
এ কারণে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সুশাসন, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন প্রকল্পকে রাজনৈতিক প্রভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা সিন্ডিকেটনির্ভর স্বার্থগোষ্ঠীর কবল থেকে মুক্ত রাখতে না পারলে বিপুল বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন, ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
বাংলার নদীগুলো কেবল জলধারা নয়, এগুলো সম্ভাবনারও প্রবাহ। সমুদ্রবন্দরগুলো কেবল বাণিজ্যের অবকাঠামো নয়, এগুলো একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বপ্নপূরণের প্রবেশদ্বার। তাই নৌপথ ও বন্দর উন্নয়নের এই উদ্যোগকে শুধু একটি বাজেট প্রস্তাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির রূপরেখার অংশ। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে হলে প্রয়োজন সুশাসন, স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। নদীর স্রোত যেমন আপন গতিতে গন্তব্য খুঁজে নেয়, তেমনি সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে নৌপথ ও বন্দর উন্নয়নও বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির নতুন তীরে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে।
লেখক : সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : জাতীয় পরিচয়পত্র একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান দলিল। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নাগর...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ভাত আমাদের খুব আপন। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় তার উপস্থিতি এত স্বাভাবিক যে, ভাত নিয়ে আলাদা করে ভা...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার রাত গভীর। চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ঘুম ভেঙে দরজা খুললেন মা। ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট। ঢাকার মাটিতে থেমে গেল কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের পথচলা। যে কবি একদিন অন্যায়ের ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : কোনো কোনো কণ্ঠ শুধু গান গায় না, একটি সময়কে ধারণ করে। আবদুর রহমান বয়াতীর কণ্ঠ ছিল তেমনই—মাটির গন্ধ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ফল প্রকাশের পর মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে কয়েকটি সংখ্যা। কারও জন্য সেই সংখ্যা আনন্দের, কারও জন্য হতা...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited