শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৭:৫৬ পিএম, ২০২৬-০৬-২২
ঢাকার এক ব্যাংক শাখায় এক মধ্যবিত্ত গ্রাহক তার ডিপিএসের মেয়াদ শেষে টাকা তুলতে এসে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর তাকে জানানো হয়—পুরো অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে প্রদান করা সম্ভব নয়। একই দিনে আরেকজন গ্রাহক মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপে ব্যালেন্স দেখে বিস্মিত হন—কারণ নিয়মিত চার্জ কেটে নেওয়া হলেও সেবা পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না।
এই দুইটি ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যতিক্রম নয়; বরং এগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরে জমে ওঠা এক গভীর আস্থার সংকটের দৈনন্দিন বাস্তব চিত্র। যেখানে অর্থ আছে, কিন্তু নিশ্চয়তা নেই; সেবা আছে, কিন্তু স্থায়িত্ব অনিশ্চিত।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন আর বিচ্ছিন্ন সমস্যার সমষ্টি নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা, সুশাসনের ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার সম্মিলিত চাপের ফলাফল। ফলে সংকটটি কেবল আর্থিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নেই; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সিস্টেমিক আস্থার সংকট-এ রূপ নিয়েছে।
খেলাপি ঋণ: কাঠামোগত ব্যর্থতার কেন্দ্রবিন্দু
খেলাপি ঋণ এখন ব্যাংকিং খাতের কেন্দ্রীয় ব্যর্থতার প্রতীক। তবে এর প্রকৃতি কেবল ঋণ ফেরত না আসার সমস্যা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত বিকৃতি।
এর পেছনে রয়েছে—
ঝুঁকি-ভিত্তিক ঋণ মূল্যায়নের ঘাটতি
প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের চাপ ও প্রভাব
দুর্বল পুনরুদ্ধার ও আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা
দীর্ঘদিনের নীতিগত শিথিলতা ও ছাড়
ফলে খেলাপি ঋণ কেবল আর্থিক ফলাফল নয়; এটি একটি গভীর সুশাসনগত ব্যর্থতার প্রতিফলন।
তারল্য সংকট: বাস্তব অর্থনৈতিক চাপের দৃশ্যমান রূপ
ব্যাংকের সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্যাংকে এই চাপ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
ফলে দেখা যায়—
এটিএম থেকে চাহিদামতো নগদ অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না
শাখায় উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে
বড় লেনদেনে অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে
এটি কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়; বরং আর্থিক কাঠামোর ভারসাম্যহীনতার বহিঃপ্রকাশ, যা ধীরে ধীরে আস্থার সংকটে রূপ নিচ্ছে।
সুশাসনের ঘাটতি: ব্যাংকিং কাঠামোর দুর্বল ভিত
ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার অন্যতম মূল কারণ হলো সুশাসনের ঘাটতি। এখানে সমস্যা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়; বরং কাঠামোগত।
প্রধান দুর্বলতাগুলো হলো—
বোর্ড পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব
ঋণ অনুমোদনে প্রভাবশালী হস্তক্ষেপ
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্বের ঘাটতি
নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সীমিত কার্যকারিতা
ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঝুঁকি জমা হলেও তা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা সংশোধন করা সম্ভব হয়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং নেতৃত্ব: এক দশকের দ্বৈত বাস্তবতা
গত এক দশকে Bangladesh Bank–এর নেতৃত্বে একাধিক গভর্নর দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সময়কালকে একটি দ্বৈত বাস্তবতা হিসেবে দেখা যায়।
ইতিবাচক দিক:
ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ
মুদ্রানীতির মাধ্যমে সামগ্রিক স্থিতিশীলতা রক্ষা
বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় ভূমিকা
সীমাবদ্ধতা:
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি
দুর্বল ব্যাংকের বিরুদ্ধে সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা সীমিত ছিল
কাঠামোগত সংস্কার ধীরগতিতে অগ্রসর হয়েছে
ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সামগ্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হলেও গভীর কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থেকেছে।
সঞ্চয়কারীর ঝুঁকি: ডিপিএস ও এফডিআর আস্থার সংকট
ডিপিএস ও এফডিআর এখন সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এই ব্যবস্থার ওপর আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
গ্রাহক পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে—
মেয়াদ শেষে অর্থ উত্তোলনে অনিশ্চয়তা
পুনঃনবীকরণে আস্থাহীনতা
দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় পরিকল্পনায় দ্বিধা ও সংশয়
ফলে ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি—সঞ্চয়ের ওপর আস্থা—ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
গ্রাহক অভিজ্ঞতা: আস্থার ক্ষয়ের বাস্তব চিত্র
বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গ্রাহকের অভিজ্ঞতা দ্বৈত প্রকৃতির— একদিকে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারিত হচ্ছে, অন্যদিকে সেবার নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ।
ফলে বাস্তবে দেখা যায়—
টাকা জমা থাকলেও উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা
অনলাইন ব্যাংকিংয়ে অস্থিরতা
কার্ড ব্যবহারে অনিয়মিত সমস্যা
নিয়মিত সার্ভিস চার্জ কাটা
এটি একটি “service gap paradox”—যেখানে সেবা বিদ্যমান থাকলেও তার কার্যকারিতা ও নিশ্চয়তা অনিশ্চিত।
চার্জ বনাম সেবা: ন্যায্যতার প্রশ্ন
ব্যাংকগুলো চুক্তিভিত্তিকভাবে চার্জ আদায় করে, যা আইনগতভাবে বৈধ। তবে বাস্তব প্রশ্ন হলো—
সেবা সীমিত বা বিঘ্নিত থাকলেও চার্জ কেন অব্যাহত থাকে?
গ্রাহক পূর্ণ সেবা না পেলে সেই খরচ কতটা ন্যায্য?
ফলে বিষয়টি এখন কেবল আইনগত পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ন্যায্যতা, জবাবদিহি ও গ্রাহক আস্থার প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
ঝুঁকিতে থাকা ব্যাংকগুলোর বাস্তব চিত্র:
ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি, পদ্মা ব্যাংক পিএলসি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, এক্সিম ব্যাংক পিএলসি, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক পিএলসি, জনতা ব্যাংক পিএলসি এবং অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি—
এই ব্যাংকগুলো বিভিন্ন মাত্রায় তারল্য চাপ, সম্পদমান অবনতি এবং সুশাসনের দুর্বলতার কারণে আলোচনায় রয়েছে। তবে এটি সমগ্র খাতের পতন নয়; বরং একটি অসম ও স্তরভিত্তিক আর্থিক চাপের প্রতিফলন।
নীতিগত ব্যর্থতা: দীর্ঘমেয়াদি সংকটের শিকড়
এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা কাজ করেছে—
দুর্বল ঋণনীতি ও শিথিল প্রয়োগ
প্রভাবশালী ঋণ কাঠামোর বিস্তার
সময়মতো নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপের অভাব
প্রয়োজনীয় সংস্কারের ধীরগতি
ফলে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি policy accumulation failure, যা ধীরে ধীরে পুরো ব্যাংকিং খাতকে চাপের মধ্যে ফেলেছে।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি: সতর্ক সংকেত
বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে—
আস্থার সংকট আরও গভীর হবে
তারল্য সংকট তীব্রতর হবে
দুর্বল ব্যাংকগুলো আরও চাপে পড়বে
পুরো খাত সিস্টেমিক ঝুঁকির দিকে অগ্রসর হতে পারে
অর্থাৎ ব্যাংকিং খাত এখন একটি “সতর্ক সংকেত পর্যায়ে” অবস্থান করছে।
আস্থার প্রশ্নই মূল সংকট:
একটি ব্যাংকের শাখায় দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ গ্রাহকের অনিশ্চিত অপেক্ষা, কিংবা মোবাইল স্ক্রিনে হঠাৎ কমে যাওয়া ব্যালেন্স—এই ছোট ছোট দৃশ্যগুলোই এখন বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। সেই বাস্তবতা কেবল আর্থিক হিসাবের নয়; এটি আস্থা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার প্রশ্ন।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে অর্থের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে বিশ্বাসের সংকট। আর সেই বিশ্বাস যদি ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে, তবে এই সংকট আর ব্যাংকিং খাতের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না—তা ছড়িয়ে পড়বে পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীরে।
লেখক: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : : জাতীয় পরিচয়পত্র একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান দলিল। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নাগর...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ভাত আমাদের খুব আপন। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় তার উপস্থিতি এত স্বাভাবিক যে, ভাত নিয়ে আলাদা করে ভা...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার রাত গভীর। চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ঘুম ভেঙে দরজা খুললেন মা। ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট। ঢাকার মাটিতে থেমে গেল কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের পথচলা। যে কবি একদিন অন্যায়ের ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : কোনো কোনো কণ্ঠ শুধু গান গায় না, একটি সময়কে ধারণ করে। আবদুর রহমান বয়াতীর কণ্ঠ ছিল তেমনই—মাটির গন্ধ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ফল প্রকাশের পর মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে কয়েকটি সংখ্যা। কারও জন্য সেই সংখ্যা আনন্দের, কারও জন্য হতা...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Bangla | Developed By Muktodhara Technology Limited