বাংলাদেশ   শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬  

শিরোনাম

দেহঘড়ি থেমেছে, থামেনি আবদুর রহমান বয়াতীর সুর

আবদুল্লাহ মজুমদার :    |    ০৩:৩৭ পিএম, ২০২৬-০৮-১৮

দেহঘড়ি থেমেছে, থামেনি আবদুর রহমান বয়াতীর সুর

কোনো কোনো কণ্ঠ শুধু গান গায় না, একটি সময়কে ধারণ করে। আবদুর রহমান বয়াতীর কণ্ঠ ছিল তেমনই—মাটির গন্ধমাখা, সহজ অথচ গভীর। তাঁর গানে মানুষ খুঁজে পেত নিজের জীবন, সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, জন্ম-মৃত্যু আর আত্মজিজ্ঞাসার কথা। ‘মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি’সহ অসংখ্য লোকগানের পরিবেশনায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার মানুষের আপন শিল্পী। ২০১৩ সালের ১৯ আগস্ট তাঁর কণ্ঠ থেমে যায়। কিন্তু তাঁর গান থামেনি। মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং মানুষের ভালোবাসা তাঁকে বাংলা লোকসংগীতের স্মৃতিতে আরও স্থায়ী করেছে।

১৯৩৯ সালের ১ জানুয়ারি পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের দয়াগঞ্জে জন্ম আবদুর রহমান বয়াতীর। তাঁর বাবা তোতা মিয়ার দয়াগঞ্জ বাজারে একটি হোটেল ছিল। সেখানে প্রায়ই বসত বাউল ও লোকশিল্পীদের গানের আসর। ছোট্ট আবদুর রহমান ছুটে যেতেন সেই আসরে। মন দিয়ে গান শুনতেন, মনে রাখতেন, পরে নিজে গাওয়ার চেষ্টা করতেন। এভাবেই শৈশবেই লোকসংগীতের প্রতি তাঁর গভীর টান তৈরি হয়। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে শেষ পর্যন্ত সুরকেই জীবনের পথ হিসেবে বেছে নেন।

সংগীতের গুরু হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন প্রখ্যাত বাউলশিল্পী আলাউদ্দিন বয়াতীকে। তাঁর কাছে তালিম নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বাউল ও লোকশিল্পীর গান শুনে নিজের সংগীতভুবন গড়ে তোলেন। ১৯৫০-এর দশকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ শিল্পীজীবন। দোতরা, হারমোনিয়াম, খঞ্জনি ও ভায়োলিন বাজাতেও পারতেন তিনি। মেলা, আসর ও গ্রামবাংলার মানুষের কাছে ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে ওঠে তাঁর দরদভরা কণ্ঠ।

১৯৮২ সালে নিজের নামে একটি বাউল দল গড়ে তোলেন আবদুর রহমান বয়াতী। পল্লীগীতি, জারি, মুর্শিদি, ভাওয়াইয়া, দেহতত্ত্ব ও বিচ্ছেদীসহ নানা ধারার লোকগান পরিবেশন করেছেন তিনি। দীর্ঘ সংগীতজীবনে প্রায় পাঁচশ একক অ্যালবাম প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়। বিপুল সৃষ্টিশীলতা তাঁকে বাংলাদেশের লোকসংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পীতে পরিণত করে।

তাঁর গানের কেন্দ্রে ছিল মানুষ ও জীবন। জন্ম-মৃত্যু, দেহতত্ত্ব, আধ্যাত্মিকতা, প্রেম, বিচ্ছেদ, সংসার ও জীবনের অনিত্যতা—সবই উঠে এসেছে তাঁর গানে। কঠিন জীবনদর্শনকে সহজ লোকভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারতেন তিনি। তাই তাঁর গান শুধু বিনোদন দেয়নি; শ্রোতাকে নিজের জীবন ও অস্তিত্ব নিয়েও ভাবিয়েছে।

‘মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি’ গানটি তাঁর কণ্ঠে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। গানটির রচয়িতা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য থাকলেও আবদুর রহমান বয়াতীর পরিবেশনায় এটি মানুষের কাছে বিশেষ পরিচিত হয়ে ওঠে। তাঁর স্বতন্ত্র কণ্ঠ, উচ্চারণ ও আবেগময় পরিবেশনা গানটিকে দীর্ঘদিন মানুষের স্মৃতিতে ধরে রেখেছে।

তবে একটি গান দিয়ে তাঁকে বিচার করা যায় না। তিনি ছিলেন গায়ক, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক। লোকগানের পাশাপাশি চলচ্চিত্র, নাটক ও প্রামাণ্যচিত্রেও তাঁর কণ্ঠ শোনা গেছে। বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিশেষ গ্রেডের শিল্পী হিসেবেও কাজ করেছেন। দেশের সীমানা পেরিয়ে ভারত, নেপাল, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে গান পরিবেশন করেছেন। হোয়াইট হাউসের একটি অনুষ্ঠানে গান পরিবেশনের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

তাঁর জীবন অবশ্য শুধু সাফল্যের ছিল না; ছিল সংগ্রামও। সীমিত সুযোগ, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও শারীরিক অসুস্থতা জীবনের শেষদিকে তাঁকে কষ্ট দিয়েছে। জনপ্রিয়তা থাকলেও শেষ সময়ে আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। এই বৈপরীত্য তাঁর জীবনকাহিনিকে আরও মানবিক করে তোলে।

২০১৩ সালের ১৯ আগস্ট ঢাকার জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৪ বছর বয়সে মারা যান আবদুর রহমান বয়াতী। তাঁর মৃত্যুতে লোকসংগীত হারায় এক স্বতন্ত্র কণ্ঠ। কিন্তু তাঁর শিল্পীজীবনের মূল্যায়ন থেমে থাকেনি। ২০১৫ সালে শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের জন্য তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক দেয় বাংলাদেশ সরকার। এটি ছিল তাঁর দীর্ঘ লোকসংগীত সাধনার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।

তবে একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় পুরস্কার মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকা। আবদুর রহমান বয়াতী সেই পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯ আগস্ট তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী এলে তাই শুধু একজন প্রয়াত শিল্পীর কথা মনে পড়ে না; মনে পড়ে বাংলার লোকজীবনের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর দেহঘড়ি থেমেছে বহু বছর আগে, কিন্তু তাঁর গানের ঘড়ি এখনো চলছে। কোনো লোকগানের আসরে তাঁর সুর ফিরে এলে মনে হয়—আবদুর রহমান বয়াতী চলে যাননি; তিনি রয়ে গেছেন বাংলার মাটি, মানুষের কণ্ঠ আর স্মৃতির গভীরে।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম বিনোদন সাংবাদিক সংস্থা।

রিটেলেড নিউজ

কনটেইনারের বাড়তি খরচ, শেষ পর্যন্ত বোঝা কার?

কনটেইনারের বাড়তি খরচ, শেষ পর্যন্ত বোঝা কার?

আবদুল্লাহ মজুমদার : : চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে দিনভর কনটেইনারের ওঠানামা। বিশাল ক্রেন, ছুটে চলা ট্রাক আর ব্যস্ত বন্দরের...বিস্তারিত


অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্রে বিকাশ, দায় কার?

অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্রে বিকাশ, দায় কার?

আবদুল্লাহ মজুমদার : : জাতীয় পরিচয়পত্র একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান দলিল। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নাগর...বিস্তারিত


ভাত বৃত্তান্ত : ভাতের ঘ্রাণে শেকড়ের সন্ধান 

ভাত বৃত্তান্ত : ভাতের ঘ্রাণে শেকড়ের সন্ধান 

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ভাত আমাদের খুব আপন। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় তার উপস্থিতি এত স্বাভাবিক যে, ভাত নিয়ে আলাদা করে ভা...বিস্তারিত


গুমের স্মৃতি যেন আর ফিরে না আসে

গুমের স্মৃতি যেন আর ফিরে না আসে

আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার রাত গভীর। চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ঘুম ভেঙে দরজা খুললেন মা। ...বিস্তারিত


অর্ধশতাব্দী পরও নজরুল: বিদ্রোহ, সাম্য ও মানবতার কবি

অর্ধশতাব্দী পরও নজরুল: বিদ্রোহ, সাম্য ও মানবতার কবি

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট। ঢাকার মাটিতে থেমে গেল কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের পথচলা। যে কবি একদিন অন্যায়ের ...বিস্তারিত


বোর্ড চ্যালেঞ্জ: নম্বর কি সত্যিই ভবিষ্যৎ মাপে?

বোর্ড চ্যালেঞ্জ: নম্বর কি সত্যিই ভবিষ্যৎ মাপে?

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ফল প্রকাশের পর মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে কয়েকটি সংখ্যা। কারও জন্য সেই সংখ্যা আনন্দের, কারও জন্য হতা...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, গ্রেফতার ২

নোয়াখালী প্রতিনিধি : : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৭) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্তার অà¦...বিস্তারিত


সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

সৌদি আরবে  গাড়ির নির্দিষ্ট গতি  অমান্য করলে  ২ হাজার রিয়াল জরিমানা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : সৌদি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, স্পীড লিমিট এর চাইতে অধিক গতিতে যানবাহন চালানো ব্যক্তিদের উপà¦...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর